উচ্চশিক্ষা : উদারীকরণ নাকি বাণিজ্যিকীকরণ
প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৪৭
সমপ্রতি নতুন আরো সাতটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দিয়েছে সরকার। বর্তমানে দেশে ৩৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ৭৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর মতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের সেবার মনোভাব, ভালোভাবে প্রতিষ্ঠান চালানোর ক্ষমতা এবং যেসব জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় নেই সেসব জেলার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, আমাদের দেশে এত অল্প সময়ের মধ্য এতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করার যৌক্তিকতা কতটুকু? এক্ষেত্রে কি শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যক্তি বা এলাকাই যথেষ্ট নিয়ামক হতে পারে? এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে দেশে এখন ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। এই নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাদানের উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য প্রধান উপকরণসমূহ যেমন বিজ্ঞ শিক্ষক, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, সুসজ্জিত গবেষণাগার ইত্যাদির জোগান দেওয়া কতটুকু সম্ভব সেটা বিবেচনা করা অপরিহার্য। বিভিন্ন সময়ে পত্রিকা ও মিডিয়ার বদৌলতে দেখা যায় হাতেগোনা কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বাকিগুলোর শুধু ব্যবসায়িক মনোভাব প্রকাশ পাচ্ছে, যেখানে শিক্ষাকে পণ্য বানিয়ে অর্থ উপার্জনের সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ট্রাস্টি বোর্ড নিয়ে বিরোধ আছে এমন বিশ্ববিদ্যালয়ে নেপথ্যে থেকে কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের নেতারা সেগুলোর বর্তমান প্রশাসনকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করছেন। আর এই শিক্ষা-ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের সাবেক ও বর্তমান নেতারা। যাঁরা শিক্ষার মানের চেয়ে অর্থটাকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। আইন অনুযায়ী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা থাকলেও মূলত এগুলো লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। আর এজন্যই নতুন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন পেতে অনেকেই উঠেপড়ে লাগেন।
অন্যদিকে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থাও যে খুব ভালো সেটাও বলা যাবে না। সেখানেও অসংখ্য সীমাবদ্ধতা যেমন বিজ্ঞ শিক্ষক, অবকাঠামো, সুসজ্জিত গবেষণাগার, গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ ইত্যাদির জোগান সীমিত। আবার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসন থাকলেও এগুলোর সকল কিছুর জন্যই নির্ভর করতে হয় শিক্ষামন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সদিচ্ছার ওপর। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভাইস-চ্যান্সেলর ও সিন্ডিকেট/সিনেট-এর সদস্য নিয়োগের ব্যাপারটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক বিবেচনায় হয়ে থাকে। ভাইস-চ্যান্সেলর নিয়োগ পান পুরোপুরি দলীয় বিবেচনায় এখানে কে ভালো গবেষক বা নিষ্ঠাবান শিক্ষক সেটি প্রাধান্য না দিয়ে প্রাধান্য দেওয়া হয় অতীত/ভবিষ্যত্ জীবনে কে কতটুকু দলীয় আজ্ঞাবহ ছিলেন/হবেন। বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েরই সিন্ডিকেট/সিনেট-এর সদস্য হিসেবে থাকেন এক/একাধিক সংসদ সদস্য/রাজনৈতিক নেতা যাঁরা সিন্ডিকেট/সিনেট-এর সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরই শুরু করেন নিয়োগ বাণিজ্য (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া)। তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মনে করেন পুনর্বাসন কেন্দ্র যেখানে দলীয় আজ্ঞাবহ ও অযোগ্য/অদক্ষ/কম যোগ্যতাসম্পন্ন লোকদেরকে চাকরি দেওয়ার মাধ্যমে পুনর্বাসন করে থাকেন। তাঁদের প্রভাব এতটাই থাকে যে তাঁদের পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ না দিলে/সুবিধা না দিলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাইস-চ্যান্সেলরশিপ পর্যন্ত চলে যেতে পারে। এই ভয়ে ভাইস-চ্যান্সেলর মহোদয়েরাও নিরুপায়। কিন্তু এখানে হস্তক্ষেপ/প্রভাবিত না করে ভাইস-চ্যান্সেলর মহোদয়দের সহায়তা করলে অধিকতর যোগ্য/মেধাবী প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়া যেতো। এমনও দেখা যায় যে তাদের ইচ্ছেমত আইন-কানুন পরিবর্তন করে, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের অনুমোদন না নিয়েই শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে যাচ্ছেন—যার ফলে বছর শেষে দেখা যায় শিক্ষকদের গবেষণার টাকা গবেষণা খাতে না দিয়ে তাঁদের বেতন দিতে হয় (সমপ্রতি ঘটে যাওয়া বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা এমনি একটি উদাহরণ)।
আবার নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে (সরকারি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়) মানসম্মত শিক্ষাদানের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষকও কিন্তু একেবারে পাওয়া যাবে না। প্রতিটি ব্যাচে/বিভাগে মাত্র কয়েকজন ছাত্র থাকে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হওয়ার যোগ্য। যার ফলে মানসম্মত, যোগ্য কিছু সংখ্যক শিক্ষক পেতে হলে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান হয় বিশ্বমানের, যাদের কর্মক্ষেত্র থাকে বিশ্বব্যাপী। তাই জেলা বা স্থান বিবেচনায় না এনে আমাদের দরকার বিশ্বমানের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে Global University Ranking-এ আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, মালয়েশিয়া ও চীনের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় তালিকার উপরের দিকে ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থান করে নিতে পারলেও বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই সেখানে স্থান পায়নি। অতএব, আমাদেরকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য সচেষ্ট হতে হবে। এখনই এর উপযুক্ত সময় আর এ কাজে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে হবে সরকারকেই।
ময়মনসিংহ