আশ্বাসে আশ্বস্ত নয় গার্মেন্টস শ্রমিকরা
প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:২০
মন্ত্রী, বিজিএমইএ, শ্রমিকনেতা কারো আশ্বাসেই আশ্বস্ত হতে পারছেন না গার্মেন্টস শ্রমিকরা। সোমবার রাতে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে গতকাল মঙ্গলবার শ্রমিকদের কাজে যোগ দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল। শ্রমিক নেতারাও ওই বৈঠক ফলপ্রসূ বলেই জানিয়েছিলেন।
কথা ছিল গতকাল মঙ্গলবার সকালে সব গার্মেন্টস শ্রমিক কাজে যোগ দেবেন। মালিকরাও গার্মেন্টস খোলা রাখবেন। আর ফ্যাক্টরির নিরাপত্তার বিষয়টি দেখবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। গতকাল সকালে অধিকাংশ গার্মেন্টসই খুলে দেয়া হয়। কাজেও যোগ দেন শ্রমিকরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি একটি করে গার্মেন্টস থেকে শ্রমিকরা নেমে আসতে থাকেন। শুরু করেন বিক্ষোভ। কয়েক জায়গায় ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। ফলে চতুর্থদিনেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায়। শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে আসায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। যানজটে নাকাল হন রাস্তায় বের হওয়া মানুষ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান সরকার, মালিক ও শ্রমিকপক্ষের আহ্বানের পরও কাজে যোগ না দিয়ে রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে আন্দোলনরত শ্রমিকরা। গতকাল সকাল সাড়ে ৮টার দিকে খিলক্ষেত-কুড়িল এলাকার ইউরো জোন, মোহাম্মদীয়া, ক্লাসিক, জেম্স ফ্যাশ্ন, সিনহা ফেব্রিকসসহ বিভিন্ন কারখানার কয়েক হাজার কর্মী সড়কে নেমে এসে বিক্ষোভ শুরু করেন। তারা কুড়িল ফ্লাইওভারের নিচে একটি অংশে অবস্থান নিলে এক পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশ তাদের ধাওয়া দিলে শ্রমিকরা প্রগতি সরণির অন্য অংশে সরে যায়। বিক্ষোভের এক পর্যায়ে কিছু শ্রমিক একটি কারখানার দিকে ঢিল ছুড়ে কাঁচ ভাংচুরের চেষ্টা চালায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। পরে ইউরো ফ্যাশন নামের একটি কারখানার কর্মকর্তারা নভেম্বর থেকে বর্ধিত বেতন ভাতা কার্যকর করার আশ্বাস দিলে শ্রমিকরা রাস্তা থেকে সরে যায়। তবে এখানে তেমন ভাংচুরের ঘটনা ঘটেনি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার লুত্ফুল কবীর বলেন, শ্রমিকদের বুঝিয়ে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। ন্যূনতম মজুরি আট হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে গত চার দিন ধরে ঢাকা, সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ-ভাংচুর চালিয়ে আসছে পোশাক শ্রমিকরা। এই প্রেক্ষাপটে সোমবার মালিক ও শ্রমিক নেতাদের নিয়ে সচিবালয়ে দুই দফা বৈঠক করে রাজপথে জ্বালাও-পোড়াও বাদ দিয়ে শ্রমিকদের মঙ্গলবার থেকে কাজে যোগ দেয়ার আহ্বান জানান গার্মেন্টস শ্রমিক সমন্বয় পরিষদের আহ্বায়ক নৌমন্ত্রী শাজাহান খান। রাতে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ঈদের আগে বকেয়া বেতন-বোনাসসহ যথাযথ পাওনা পরিশোধে মালিকরা অঙ্গীকার করেছেন। আশা করছি, শ্রমিকরা আগামীকাল থেকে শান্তিপূর্ণভাবে কাজে যোগদান করবেন। শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, সভায় নির্ধারিত সময়ের আগে মজুরি বোর্ড বাস্তবায়নের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। নতুন মজুরি নির্ধারিত হলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
নারায়ণগঞ্জে শ্রমিকদের বিক্ষোভ
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গতকাল নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা শিল্পাঞ্চল এলাকার বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করেছে। এসময় তারা কয়েকটি গার্মেন্ট ও যানবান ভাংচুর এবং ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রুট ২ ঘণ্টা অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখায়। উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ফতুল্লা শিল্পাঞ্চলের অনেক গার্মেন্ট কারখানা ছুটি ঘোষণা করে। জানা গেছে, মঙ্গলবার সকাল ৯টায় ফতুল্লা শিল্পাঞ্চলের কাঠেরপুর, পিটালীপুল, রামারবাগ, কুতুবআইল এলাকাতে অবস্থিত বিভিন্ন গার্মেন্ট কারখানার শ্রমিকেরা রাস্তায় নেমে আসে। এ সময় একটি সিএনজি চালিত অটোরিকশা ও একটি ভ্যানগাড়ি ভাংচুর করা হয়।
গার্মেন্টস শ্রমিকনেতৃবৃন্দ, শিল্পপুলিশ, ফতুল্লা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের সাথে আলোচনা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে আলোচনার আশ্বাস পেয়ে শ্রমিকরা তাদের অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয়। টঙ্গীতে থানা ঘেরাও
টঙ্গী সংবাদদাতা জানান, গতকাল সকাল সাড়ে দশটায় টঙ্গীর বিসিক এলাকার রেডিসন এ্যাপারেল্স তৈরি পোশাক কারখানার এক ও দুই নম্বর ইউনিটের কর্মরত শ্রমিকদের উপর মালিক পক্ষের বহিরাগত সন্ত্রাসীদের হামলার প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা টঙ্গী থানা ঘেরাও করে। আহত শ্রমিকরা জানান, সকাল ৮টায় যথারীতি তারা কর্মস্থলে যোগদান করে। কর্মরত অবস্থায় আশপাশের পোশাক কারখানাগুলো বন্ধ থাকায় সকাল ১০টার দিকে কর্তৃপক্ষের কাছে ছুটির দাবি জানায়। কিন্তু কারখানা কর্তৃপক্ষ তা না মঞ্জুর করে জোর করে কাজে যোগ দিতে বলে। এসময় তারা কাজ না করলে মালিক পক্ষ বহিরাগত সন্ত্রাসীদের ডেকে এনে পুলিশের উপস্থিতিতে তাদের উপর নির্যাতন ও মারধর করে। এতে ওই কারখানার ২০ জন শ্রমিক আহত হয়। পরে বেলা সাড়ে ১১টায় প্রায় দুই শতাধিক শ্রমিক মিলে প্রথমে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে।
কালিয়াকৈরে কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ
কালিয়াকৈর (গাজীপুর) সংবাদদাতা জানান, গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুত্ এলাকায় মঙ্গলবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে স্টারলিং, আইমন টেক্সটাইল, ইন্টারস্টপ, ডিভাইন ও এপেক্স গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন কারখানার শত শত শ্রমিক কাজে যোগদান না করে কর্মবিরতি ও মহাসড়কে বিক্ষোভ শুরু করেন। এক পর্যায়ে শ্রমিকরা পল্লী বিদ্যুত্ এলাকার ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরোধ সৃষ্টি করলে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে পুলিশ সকাল সাড়ে নয়টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে মহাসড়ক থেকে শ্রমিকদের সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। এসময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এ সময় পোশাক শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ করলে শুরু হয় সংঘর্ষ। পরে পুলিশ টিয়ার সেল নিক্ষেপ করলে শ্রমিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এসব ঘটনায় শ্রমিক ও পথচারীসহ কমপক্ষে ১৫ জন আহত হয়। কালিয়াকৈর থানার ওসি ওমর ফারুক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, মহাসড়ক থেকে শ্রমিদের ছত্রভঙ্গ করতে ৬০ রাউন্ড টিয়ার সেল নিক্ষেপ করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে জানান তিনি।
আশুলিয়া শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ
সাভার থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানান, আশুলিয়ার জিরাবো এলাকায় গতকাল সকালে শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের চতুর্থ দিনের মতো বিক্ষোভ করেছে গার্মেন্টস শ্রমিকরা। তবে শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে সংঘাত এড়াতে ৮টি কারখানা ছুটি ঘোষণা করেছে মালিকপক্ষ। এ সময় শ্রমিকরা দাবি আদায়ে বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়কের জিরাবো বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার সেল, রাবার বুলেট নিক্ষেপসহ লাঠিচার্জ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। এ ঘটনায় কমপক্ষে ১০ জন শ্রমিক আহত হয় বলে জানা যায়।
মির্জাপুরে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ
মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, গতকাল টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার গোড়াই শিল্পাঞ্চলের পোশাক শ্রমিকরা রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ সৃষ্টি করে যানবাহন ভাংচুর করার চেষ্টা করলে পুলিশ বাঁধা দেয়। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ার সেল নিক্ষেপ করেছে। শ্রমিককরাও ইট পাটকেল ও লাঠিসোঠা নিয়ে পুলিশের উপর পাল্টা আক্রমণ করে। এ সময় ঘটনার ছবি তুলতে গেলে মির্জাপুর উপজেলার দৈনিক ইত্তেফাকের সংবাদদাতা মীর আনোয়ার হোসেন টুটুল পুলিশের রাবার বুলেট এবং বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের ইটের আঘাতে আহত হন। তাকে মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকে গোড়াই শিল্পাঞ্চলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
গাজীপুরে অর্ধশতাধিক
কারখানায় ছুটি
গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, গাজীপুরে চতুর্থ দিনের মতো গতকাল বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেছে শ্রমিকরা। তবে পুলিশের ব্যাপক তত্পরতার কারণে শ্রমিকরা যানবাহন ও পোশাক কারখানার তেমন ক্ষয়-ক্ষতি করতে পারেনি। নিরাপত্তা জনিত কারণে অর্ধশতাধিক পোশাক কারখানা ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকাল আটটার দিকে গাজীপুর জেলা সদরের নলজানী ও নাওজোর এলাকায় একদল শ্রমিক কয়েকটি পোশাক করাখানার গেইটে গিয়ে শ্রমিকদের বের করে আনতে এবং রাস্তায় অবরোধের চেষ্টা করে। এসময় পুলিশ তাদের বাধা দিলে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে তারা ঢাকা-গাজীপুর সড়ক অবরোধ করলে পুলিশ এসে ধাওয়া দিয়ে শ্রমিকদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়।
একই সময়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কড্ডা এলাকার ভুঁইয়া রিপিড নামের কারখানায় শ্রমিকরা হামলা চালায়। পরে কর্তৃপক্ষ ওই কারখানা ছুটি ঘোষণা করে। উত্তেজনাকর এ পরিস্থিতে আশপাশের অন্তত ১৫টি পোশাক কারখানা ছুটি দেয়া হয়। এ দিকে শিল্প এলাকা কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, ভোগড়া, বড়বাড়ি, তেলীপাড়াসহ কয়েকটি এলাকায় বেশ কয়েকটি গার্মেন্টস কারখানার সামনে উত্তেজনা দেখা দিলে গার্মেন্টস কর্তৃপক্ষ কারখানার সামনে ছুটির নোটিশ টানিয়ে দেয়।
অপরদিকে গাজীপুর সদরের ভোগড়া বাইপাস মোড় এলাকায় কলোসাস এ্যাপারেলস লি. ইউনিট-২ এ আনসারের অস্ত্রাগারে লুটপাট ও ভাংচুরের ঘটনায় ৮/১০ হাজার শ্রমিকের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে আনসার ভিডিপি কর্তৃপক্ষ। আনসারের সহকারি প্লাটুন কমান্ডার জামিল উদ্দিন বাদি হয়ে জয়দেবপুর থানায় এ মামলাটি দায়ের করেন। অস্ত্র ও গুলি লুটের ঘটনায় আনসারের পক্ষ থেকে ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গাজীপুরের সার্কেলের এ্যাডজুট্যান্ট রফিকুল ইসলামকে এ কমিটির প্রধান করা হয়েছে। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন সদর উপজেলার আনসার ভিডিপি কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ ও সদর উপজেলা আনসার প্রশিক্ষক শহিদুল হক। এ ছাড়া ভাংচুরের ঘটনায় কলোসাস এ্যাপারেলস লি. ইউনিট-২ এর পক্ষ থেকেও আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। সোমবার আনসার সদস্যদের লুট হওয়া ১৩৫ রাউন্ড গুলির মধ্যে মঙ্গলবার দুপুরে র্যাব ও আনসার সদস্যরা বাইপাস এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ৩৪ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করেছে। বাকিগুলি উদ্ধারে র্যাব ও আনসার ব্যাপক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জেলা আনসার এ্যাডজুটেন্ট মীর আলমগীর হোসেন জানান।