লেখার জাদুকর...
প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৯:০১
ব্যস্ত মানুষগুলোর শত-সহস্র ব্যস্ততার মাঝে একবার যদি উঁকি দেওয়া যায় তাহলে দেখা মেলে বিচিত্র সব বাস্তবতার। জানা যায়, হাসি-আনন্দের মধ্যে রঙিন কাপড়ের পাট করা ভাঁজের মধ্যে কেমন সূক্ষ্মভাবে লুকিয়ে থাকে বেদনা আর জীর্ণতার ছোপ ছোপ দাগ। সবাইকেই প্রতিনিয়ত মুখোমুখি হতে হয় নানা রকম জীবনযুদ্ধের। আর এ সবকিছু মিলিয়েই গড়ে উঠে তার গান ও গল্পের জমিন। এমনই একজন লেখার জাদুকর অনুরূপ আইচ। তাকে নিয়ে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার
ক্লাস টু-তে পড়ার সময় অনুরূপ বাবা-মায়ের সাথে গিয়েছিলেন কলকাতায় বেড়াতে। শান্তিনিকেতনে গেলে বাবা তাকে রবীন্দ্রনাথের ‘গল্পগুচ্ছ’ বইটি কিনে দেন। কিন্তু সেই বই থেকে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই ভর করলেন তার উপর। ক্লাস টু-এ পড়ুয়া ছাত্রের জন্য রবীন্দ্রনাথকে ধারণ করা কিছুটা কঠিন হলেও তার কচি মনে রবীন্দ্রনাথ পাকাপোক্তভাবেই আসন গড়েছিলেন। প্রথমে আবোল-তাবোল কিছু লিখলেও লেখার চর্চার গোড়াপত্তন কিন্তু সেই থেকে। পরীক্ষার খাতায় লিখতে বসে কোনো নির্দিষ্ট কবির কবিতার লাইন ভুলে গেলে, নিজের স্বরচিত কবিতাই লিখে দিয়ে আসতেন। স্কুলের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় কবিতা লিখতেন, এ ছাড়া দেয়াল পত্রিকা, বিভিন্ন ম্যাগাজিন তার লেখা প্রকাশিত হতো। এই লেখনীর ছন্দে বড় বেলায় এসে তিনি পৌঁছে যান দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ওপার বাংলাতে। কলকাতার ‘অদ্বিতীয়া’ সাময়িকীতে নিয়মিত প্রকাশিত হয় তার গল্পগুলো। স্বনামধন্য গীতিকার, নাট্যকার ও সাংবাদিক অনুরূপ আইচের শুরুর গল্পটা এমনই।
’৯৮ থেকেই গান লিখলেও ২০০১ সালে ব্যান্ডশিল্পী বিপ্লবের ‘আদর্শলিপি’ অ্যালবামের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে গীতিকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তারই ধারাবাহিকতায় এ পর্যন্ত অনুরূপ আইচ রচিত শতাধিক গান প্রকাশিত হয়েছে। দেশের নামকরা শিল্পীরা তার লেখা গান গেয়ে হয়েছেন আলোচিত। নতুনরা পেয়েছেন পরিচিতি। অনুরূপ আইচ রচিত জনপ্রিয় গানগুলো হচ্ছে—ব্যান্ড তারকা হাসানের গাওয়া ‘অযুত লক্ষ নিযুত কোটি’, আইয়ূব বাচ্চুর ‘দিল’, জেমসের ‘লুটোপুটি’, বেবী নাজনীনের ‘সকাল বেলার কোকিল’, মমতাজের ‘পাংখা’, আরফিন রুমির ‘বলো না কোথায় তুমি’, হাবিবের ‘চলতে চলতে দেখা হলো’, শহীদের ‘এক জীবন’ ও ‘এক জীবন-২’, পড়শীর ‘তোমারই পরশ’ ও ‘খুঁজে খুঁজে’, সেরাকণ্ঠ তারকা পূজার ‘তুমি আমার’, ইমরানের ‘দূরে দূরে’ ইত্যাদি। অডিও গানের পাশাপাশি চলচ্চিত্রের গান রচনায়ও সিদ্ধহস্ত অনুরূপ আইচ। ২০০৪ এর দিকে জহির রায়হানের বড় ছেলে দিপু রায়হানের সঙ্গে কাজ শুরু করেন এবং ২০০৫ সালে প্রথমবারের মতো একক নাটক লিখেন তিনি। ২০১১ সালের রোজার ঈদে বাজারে আসে শিল্পী শহীদের একক অ্যালবাম ‘নীলাম্বরী’। আর এ অ্যালবামের অনুরূপের লেখা ‘তোমায় ছেড়ে বহুদূরে যাব কোথায়, এক জীবনে এত প্রেম পাব কোথায়’ শিরোনামের গানটি জয় করে হাজারো শ্রোতার মন। এ গানের সফলতার পর গত ঈদুল ফিতরে এসেছিল গানটির সিক্যুয়েল ‘এক জীবন-২’। আর ‘এক জীবন’-এর গানটির মতো ‘এক জীবন-২’-এর গানটির কথা লিখেন অনুরূপ আইচ। এবার ‘এক জীবন-১’-এর মিউজিক ভিডিওটির গল্প অনুযায়ী ‘এক জীবনে এত প্রেম পাব কোথায়’ শিরোনামে একটি নাটক রচনা করেছেন তিনি। তার রচিত দর্শকপ্রিয় নাটকের মধ্যে রয়েছে—‘সহে না যাতনা’, ‘তুফান এক্সপ্রেস’, ‘পাংখা’, ‘দ্য সুজ স্টোরি’, ‘ইউ টার্ন’, ‘ক্রাইম রিপোর্টার’, ‘অণু কিংবা পরমাণু’, ‘কেউ এসেছিল’ ইত্যাদি। এক ঘণ্টার নাটকের বাইরে প্রথমবারের মতো ধারাবাহিক নাটকও লিখছেন অনুরূপ আইচ। এখন তার রচিত দুটি মেগাসিরিয়ালের শুটিং চলছে। কামাল খান পরিচালিত একটির শিরোনাম ‘গীতিকার’, অন্যটি এহসান এলাহী বাপ্পীর ‘আপডেট’। বইয়ের পাঠকদের জন্যও অনুরূপ আইচ বেশ স্বাবলীল। কলকাতার অদ্বিতীয়া পাবলিকেশন হাউস থেকে বের হয়েছে তার লেখা একটি বই। কলকাতার ‘অদ্বিতীয়া’ সাময়িকীতে প্রকাশিত তার লেখা গল্পগুচ্ছ নিয়ে বইটি বের হয়। বইটির নাম ‘অ্যালকোহল’। একুশের বইমেলায় প্রকাশিত হয় এটি। তার জনপ্রিয় গানগুলো নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ‘অনুরূপ আইচের গান’। সেভেনটিওয়ান টেলিমিডিয়া থেকে প্রকাশিত এ বইটি সম্পাদনা করেছেন শিল্পী ও সাংবাদিক আমিরুল মোমেনীন মানিক। বইটিতে মোট ৫৬টি গান রয়েছে। লেখালেখির এই বৈচিত্র্যময় মানুষটির বেড়ে উঠা চট্টগ্রাম শহরে। স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় তার পারিবারিক আবহ। সর্বোপরি একজন লেখক হতে চেয়েছিলেন সব সময়, হয়েছেনও তা-ই। ঢেলে সাজিয়েছেন তার বর্ণাঢ্য জীবন। তার মতে, জীবনের সকল স্বপ্নই তার পূর্ণতার পথে এখন মরে গেল অতটা আফসোস থাকবে না। কিন্তু আমরা চাই তিনি বেঁচে থাকবেন আরও অনেকদিন, পরবর্তী প্রজন্মকে দিয়ে যাবেন তার অফুরন্ত সৃষ্টিশীল ভাণ্ডার। তুলে আনবেন দৈনন্দিন জীবনের হাজারো গল্প তার কলমের ডগায়।