লাশের গন্ধ

হাইওয়েতে একঘেয়ে গাড়ি চালানোর মাঝে ফোনের শব্দ রেজাকে সচকিত করে তুলল। রেজা যন্ত্রপাতির টেকনিশিয়ান। সিটি স্ক্যানার, এমআরআই এমন ধরনের বড় বড় যন্ত্র বানায় ওর কোম্পানি। সেগুলো বিভিন্ন হাসপাতালে সংস্থাপন করতে রেজাকে প্রায়ই যেতে হয় এদিক ওদিক। ভার্জিনিয়া আর তার আশপাশের রাজ্যের ছ-শ বর্গমাইল জুড়ে রেজার কাজের জগত্। রেজাকে বছরের বেশিরভাগ সময় থাকতে হয় বাড়ির বাইরে। ফোনের পর্দায় রেজা তাকিয়ে দেখল অচেনা নম্বর। কানের পাশে ব্লু-টুথের বোতাম টিপে বলল, ‘হ্যালো।’ ‘কেমন আছস দোস্ত?’ ও পাশ থেকে ভেসে এল অচেনা কণ্ঠস্বর। ‘ভালো। আপনি কে বলছেন?’ ‘রেজু, আমারে চিনতে পারলি না!’ পৃথিবীতে একজনই আছে যে ওকে রেজু বলে ডাকতে পারে। রেজা চমকে উঠল। স্টিয়ারিং হুইলের ওপর রাখা হাত কেঁপে উঠতে গাড়ি পিছলে গেল লেন থেকে। পাশের গাড়ির তীব্র হর্নে রেজা সংবিত্ ফিরে পেলো। ‘জামি! তুই কোত্থেকে?’ রেজা চিত্কার দিয়ে ওঠে। ‘আমি নিউ ইয়র্কে আসছি। অফিসের ট্রেনিং-এ।’ ‘তাই নাকি? কতদিন থাকবি?’ ‘আট সপ্তাহের ট্রেনিং। তোর সাথে দেখা হইব কেমনে?’ ‘দেখা তো নিশ্চয়ই হবে। শোন, আমার দৌড়ের চাকরি। আগামী কয়েক সপ্তাহ বাড়ির বাইরে থাকব। তারপর কিছুদিন ছুটি মিলবে। তখন তোর সাথে দেখা করব। আমার এখান থেকে নিউ ইয়র্ক যেতে ছ-ঘণ্টা লাগে। আমি যাব তোর সাথে দেখা করতে। তোকে এই নম্বরে ফোন করলে হবে তো?’ ‘হ্যাঁ, এই ফোনটা আমার সাথে থাকব। তুই ফোন দিস।’ ‘ঠিক আছে। আমি এখন ড্রাইভ করছি। পরে তোর সাথে কথা বলব।’ ‘ওকে। ভালো থাকিস। খোদা হাফেজ।’ ফোনটা বন্ধ করতে না করতে স্মৃতির ঝোড়ো হাওয়া রেজাকে উড়িয়ে নিয়ে গেল অতীতে, ছেলেবেলায়। যে সময় জামি ছিল ওর সবচেয়ে কাছের বন্ধু। কত স্মৃতি জামির সাথে! রেজার শৈশব ছিল বড় একাকী। মা রেজাকে জন্ম দিতে গিয়ে চলে গেছেন। বাবা ব্যস্ত নিজের কাজে। রেজার দিকে তাকানোর সময় নেই। রেজা বড় হয়েছে বাবার ফুফুর কাছে। দাদি আদর করতেন রেজাকে। কিন্তু মায়ের শাসন আর বাবার আদরের অভাব রেজাকে একাকী, অন্তর্মুখী করে তুলেছিল। মন খারাপের কথা, কোনো সমস্যার কথা রেজা কখনো মুখ ফুটে বলতে পারত না। সেদিনটার কথা মনে পড়লে রেজার চোখ এখনো জলে ভিজে ওঠে। আজিমপুরের শেষ মাথায় ওয়েস্ট অ্যান্ড হাই স্কুলে ক্লাস ফাইভে পড়ে ওরা। দুপুরে কাঁচা আম ছিলতে গিয়ে বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলের পাশে গভীর হয়ে ঢুকে গিয়েছিল ছুরি। ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়ে ভাসিয়ে দিয়েছিল রেজার হাত। দাদি পাশের ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। রেজা ডাকেনি দাদিকে। দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথা সহ্য করে হাত দিয়ে চেপে রক্ত পড়া বন্ধ করেছিল। কাউকে বলেনি রেজা। পরদিন সকালে রেজা দেখল, কাটাটা লাল দগদগে হয়ে হা করে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। খুব ব্যথা করছে। কিন্তু সেই ব্যথার কথা কাকে বলবে রেজা? বাবা ব্যস্ত অফিসে যাবার প্রস্তুতিতে। দাদি মগ্ন রুটি বানাতে। রেজা স্কুলে গেল। কেউ জানল না ওর অসহনীয় ব্যথার কথা। ক্লাসে রেজার পাশে সবসময় বসে জামি। ক্লাস টু থেকে একসাথে পড়ছে দুজন। ডেস্কের ওপর রাখা রেজার হাতের দিকে তাকিয়ে জামি শিউরে উঠল, ‘কেমনে কাটলি? দগদগ করতেছে একদম। খুব ব্যথা না?’ ‘হ্যাঁ।’ রেজা ছোট স্বরে বলে। ওর চোখ ছলকে ওঠে জলে। জামি জানে রেজার বাড়ির কথা। বোঝে, রেজা কাউকে বলেনি বাড়িতে। স্কুল ছুটি হয়ে গেল সকাল এগারটায়। জামি রেজাকে বলল, ‘আমার সাথে চল। ডিস্পেন্সারিতে দেখাইতে হইব। এইরকম কাটা একবার ভাইয়ার হইছিল। সিলাই দিতে হইছিল। কিছু না করলে পাইকা আরো খারাপ হইয়া যাইব।’ জামি থাকে পলাশির সরকারি আবাসনে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটা সেখানে। স্কুল থেকে আধঘণ্টা হেঁটে ওরা এল স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। কম্পাউন্ডার দেখে বললেন, ‘এইটা সিলাই দিতে হইব। ডাক্তার সাব তো এখন নাই। আমি সিলাই দিতে পারুম না। তুমরা মেডিকেলের ইমার্জেন্সিতে যাও।’ পলাশি থেকে মেডিকেল খুব বেশি দূরে নয়। জামি মাকে বলে রেজাকে নিয়ে এল জরুরি বিভাগে। ছ-টা সেলাই পড়েছিল রেজার হাতে। সেলাই দেবার সময় জামিকে শক্ত করে ধরে রেজা ব্যথা সহ্য করেছিল। ডাক্তার বললেন, ‘ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছি। এটা ভিজিও না। আশপাশের ফার্মেসি থেকে তিন দিন পর ড্রেসিং করিয়ে নিও। আর শুকিয়ে গেলে আবার এসো সেলাই কাটানোর জন্য। এই প্রেসক্রিপশন দিচ্ছি। অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হবে।’ ‘স্যার, আমাদের কাছে তো টাকা নাই ওষুধ কিনার। আপনার কাছে ওষুধ নাই?’ জামি মিনতি করে বলে। ওদের করুণ মুখের দিকে তাকিয়ে ড্রয়ার থেকে ডাক্তার এক সপ্তাহের পুরো কোর্সের ওষুধ বের করে দিলেন। কৃতজ্ঞতায় রেজার মাথা নত হয়ে এল। মেডিকেল থেকে জামি হেঁটে হেঁটে লালবাগে রেজার বাড়িতে পৌঁছে দিল। ভেতরে ঢুকল না। দরজায় দাঁড়িয়ে রেজা দেখল, জামি শিস দিতে দিতে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। ঘরে ঢুকতে দাদি চিত্কার করে উঠলেন, ‘কই ছিলি তুই? আমার তো জান ঠান্ডা হইয়া গেছে।’ ‘ডাক্তারের কাছে। হাত কাইটা গেছে।’ রেজা সংক্ষেপে বলে। ‘কী যে দুষ্টামি করস সারাদিন। নে আয় ভাত খাইতে আয়।’ সেখানেই ঘটনার সমাপ্তি। যে কয়দিন হাতে ব্যান্ডেজ ছিল, রেজা বাবার কাছ থেকে লুকিয়ে থেকেছে। অবশ্য লুকিয়ে থাকার জন্য রেজাকে খুব বেশি চেষ্টা করতে হয়নি। বাবা সচরাচর রেজার দিকে তাকিয়ে দেখেন না। রেজার কোনোকিছু প্রয়োজন হলে দাদি বাবাকে জানান। বাবা জানতেও পারেননি। দাদিও কিছু বলেননি। স্কুল শেষে জামির সাথে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে রেজা ড্রেসিং করিয়েছে। ঘা শুকিয়ে যাবার পর সেলাই কাটার সময়ও জামি ছিল রেজার পাশে। এটা একটি ঘটনা। স্কুল-কলেজে এমনি কতভাবে যে জামি রেজাকে সাহায্য করেছে! কত লম্বা সময় ওরা পার করেছে নৌকায় শুয়ে বুড়িগঙ্গায় ভেসে থেকে। সেই জামি রেজাকে ফোন করেছে! প্রায় পনের বছর পর। রেজার তো সব কাজ ফেলে ছুটে যাবার কথা জামির সাথে দেখা করতে! কিন্তু রেজার মন চাইছে না। গত ছ-মাসে সবকিছু একদম এলোমেলো হয়ে গেছে। রেজা মন খুলে বলতে পারছে না, ‘জামি, তুই দাঁড়া। আমি এখনই আসছি।’ বরং কাজের ব্যস্ততা দেখিয়ে জামিকে কাটিয়ে দিয়েছে ও। কলেজ শেষ করে জামি চলে গেল খুলনা বিআইটি-তে পড়তে। আর রেজা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানে। তখন থেকেই আস্তে আস্তে ওদের যোগাযোগ কমে আসতে থাকল। জামির বাবা বদলি হয়ে গেলেন খুলনায়। এর ফলে ছুটিছাটায় জামির ঢাকায় আসা বন্ধ হয়ে গেল। রেজা মাস্টার্স করতে এল ভার্জিনিয়া টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউটে। সেই যে দেশ ছাড়ল আর যাওয়া হয়নি। কোনো টান নেই রেজার। বাবা-দাদি—সবাই চলে গেছেন ওকে ছেড়ে। তাছাড়া ঠিকমতো চাকরি পেয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে রেজাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। ওর সময়-সাধ্য কোনোটাই ছিল না দেশে বেড়াতে যাবার। বন্ধুদের খোঁজ-খবর করবার। বছরখানেক হলো নিজেকে গুছিয়ে এনেছে রেজা। ভালো, স্থায়ী চাকরি হয়েছে। ফেসবুকে খুঁজে বের করছে পুরোনো বন্ধুদের। স্কুলের গ্রুপ থেকে জামিকে আবিষ্কার করেছে। জামি ফেসবুকে সক্রিয় নয়। ছেলের সাথে একটি মাত্র ছবি আছে। ঠিকানা ফোন নম্বর দিয়ে রেজা জামিকে নস্টালজিক বিশাল একটা মেসেজ পাঠিয়েছিল। তিন সপ্তাহ পর তার উত্তর পেয়েছে দু-লাইনে, ‘আমরা ভালো আছি। দেশে আসলে যোগাযোগ করিস।’ ফেব্রুয়ারির পর থেকেই সব কেমন যেন বদলে যেতে থাকল। যে ফেসবুক ছিল বন্ধুদের কবিতা পড়ার আর ছবি দেখার পাতা তা রাজনীতির হাওয়ায় গরম হয়ে উঠল। শাহবাগের গণজাগরণের পক্ষে-বিপক্ষের মতামত প্রতিদিন ফেসবুককে আলোড়িত করে রাখতে থাকল। রেজা ছাত্র অবস্থায় রাজনীতি করেনি। দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকার পর দেশের রাজনীতির সাথে ওর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কিন্তু ওর বুকের ভেতর মুক্তিযুদ্ধের দীপশিখা অনির্বাণ জ্বলজ্বল করে। মুক্তির গান শুনলে এখনো ওর শরীর কেঁপে ওঠে। মার্চের শুরুতে এক সকালে ফেসবুক খুলে রেজা চমকে উঠল। আর মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। জামি স্ট্যাটাস আপডেট করেছে ফেসবুকে, ‘নাস্তিকদের ফাঁসি চাই।’ আর নিচে ‘বাঁশের কেল্লা’র পাতা থেকে বানোয়াট গল্পের লিংক দিয়েছে। সেই জামি, ওর সবচেয়ে কাছের বন্ধু জামি আজ মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে! কখন হলো ওর এ পরিবর্তন? কেন হলো? কারা ওকে ভুলিয়ে দিল ইতিহাস? রেজা যখন ক্লাস টেনে পড়ে, দাদির শরীর খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। দু-মাস ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করে দাদি বিদায় জানিয়েছিলেন পৃথিবীকে। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে দাদি রেজাকে পাশে বসিয়ে বলেছিলেন, ‘বাপরে, আমার যাওয়ার সময় হইছে। আর বেশিদিন নাই আমি। নিজের যত্ন নিস। নিজেরে দেইখা রাখিস। তোর বাপতো আর তোর দিকে কোনোদিন তাকাইয়া দেখব না।’ ‘চুপ করো দাদি। তুমি এখনো অনেকদিন বাঁচবা। আচ্ছা দাদি, বাবা কেন আমার দিকে তাকায় না? বাবা কি আমারে ভালোবাসে না?’ দাদি অনেকক্ষণ চুপ করেছিলেন। তারপর বললেন, ‘আমার যাওয়ার সময় হইছে। তুইও বড় হইছিস। সত্যি কথাটা তোর জানা দরকার।’ মাকে গ্রামের বাড়িতে রেখে বাবা যুদ্ধে গিয়েছিলেন। একদিন একরাত ওদের গ্রাম পাকবাহিনী দখল করে রেখেছিল। গুজব আছে, সেই এক রাতে গ্রামের মাতব্বর তার রাজাকার বাহিনী নিয়ে প্রতিটি মেয়ের সম্ভ্রম কেড়ে নিয়েছিল। পুরো গ্রাম পুড়িয়ে দেবার পরিকল্পনা ছিল ওদের, কিন্তু তার আগে মুক্তিবাহিনীর গেরিলা আক্রমণে পালিয়ে গিয়েছিল রাজাকার আর পাকবাহিনী। রেজার জন্ম বাহাত্তরের মার্চ মাসে। ও কার ছেলে? কোনো রাজাকারের নাকি ওর বাবার? সেই প্রশ্নের উত্তর জানতেন না ওর মা। বিষণ্নতায় ডুবে যেতে যেতে রেজার জন্ম পর্যন্ত কোনো মতে বেঁচে ছিলেন। তার পর আর ভেসে উঠতে পারেননি। আর রেজার বাবা নিঃশব্দে পিতার কর্তব্য করে গেছেন কিন্তু রেজাকে কোনোদিন ভালোবেসে জড়িয়ে ধরতে পারেননি। বাবা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। তার জন্য গর্ব হয় রেজার। কিন্তু বাবা তাঁর সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে রেজাকে ভালোবাসতে পারেননি। রেজা ভাবে, যদি রাজাকারের পক্ষ নিতে হয় তবে ও নিতে পারে। ওর শরীরে হয়তো রাজাকারের রক্ত আছে। কিন্তু জামি? ও কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ হয়ে গেল? আজ যদি রেজার সাথে দেখা হয়, কী কথা বলবে ওরা? দেশের রাজনীতি যেরকম উত্তাল, রাজনীতির কথা উঠবেই। ওর পাশে বসে জামি যদি জামায়াতের পক্ষ নিয়ে কথা বলে, রেজা তা কীভাবে সহ্য করবে? ওর তো মনে হবে, জামি-ই ওর মায়ের মৃত্যুর কারণ। রেজার প্রতি বাবার অবহেলা জামির জন্যই। এর চেয়ে ভালো জামির সাথে না-ই দেখা হোক। হাতে সেলাই দেবার সময় রেজা জামির পিঠে মুখ ডুবিয়ে শক্ত করে ধরে রেখেছিল। ওর সমস্ত চেতনা আচ্ছন্ন করে রেখেছিল ঘাম আর ধুলো মাখা জামির শরীরের গন্ধ। সেই গন্ধ এখনো রেজার স্মৃতিতে সজীব হয়ে আছে। সেই গন্ধমাখা জামির স্মৃতিটুকুই রেজার অনুভবে থাক। এখনকার জামির শরীর থেকে হয়তো লাশের গন্ধ ভেসে আসতে পারে।