গ্যালারি ২১-এ শাহাবুদ্দিনের একক শিল্প প্রদর্শনী

গতির বাগান

শাহাবুদ্দিনের ছবি মানেই গতি এবং সেই গতির উত্স হচ্ছে একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধ। শিল্পী নিজেও একজন মুক্তিযোদ্ধা। গেরিলা হয়েছিলেন সেদিন রংতুলি ছেড়ে। এই কার্যকর অভিজ্ঞতাই তাঁর ছবিতে বারবার ফিরে এসেছে। এবারকার প্রদর্শনীর শিরোনাম রেখেছেন ‘যোদ্ধা’। এই যোদ্ধার রূপক কেবল রণাঙ্গনের ক্ষেত্রেই সত্য—এমনটি নয়, বিবিধ পর্যায়ে রয়েছে তার ব্যাপ্তি ও বিস্তার। বিষয়বস্তুর দিক থেকে এবারকার ছবিতে বরাবরের মতো মুক্তিযুদ্ধের সিকোয়েন্স এসেছে। গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা, পতাকার স্মৃতি এবং শক্তি ও সাহসের উত্স, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধ, কূপমণ্ডুকতা এবং আধুনিক সাহিত্যের নেতৃত্বদানকারী হিসেবে রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মাগান্ধী রয়েছেন। গতিকে যথার্থভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য সবথেকে যে দিকটায় প্রথম লক্ষ রাখতে হয়, সেটা হচ্ছে স্পেসের ব্যবহার। বিষয়বস্তুর বিন্যাসে এবং তার টেন্ডেন্সিই নির্ণয় করে দেয় গতির রেখা। ধরা যাক সারফেসের ভেতর ফিগারের অবস্থান যদি অপেক্ষাকৃত সামনের বা একদম বাম পাশ ঘেঁষে হয়, উভয় ক্ষেত্রেই সূচিত হবে গতি। যা অনেকটাই পেছনে ফেলে আসা বা সামনে আরও অনেক পথ বাকি বোঝাবে। গতির বিবিধ ধরন উঠে আসে মূলত পারস্পরিক শর্তের ওপর ভিত্তি করে। কতটুকু সময়ে কতটুকু পথ মূলত পার হয়ে যেতে হবে। শাহাবুদ্দিনের কাজের গতি মূলত তিনটি উত্স থেকে। প্রথমত সময় এবং অবস্থানের নিরিখে, দ্বিতীয়ত কোনো এক বাধা বা খাদজনিত কারণ এবং সরাসরি চেতনাজনিত গতি। ‘বিজয় নেশা’, ‘বিজয়ী বীর’, ‘বিজয় উল্লাস’, ‘হুশিয়ার’, ‘জয়যাত্রা’, ‘দুঃসাহস’, এইসব ছবিতে পতাকা এবং ফিগার কম্পোজিশন চমত্কার। ফিগারগুলোর পটভূমিতে পতাকার ফর্ম যেন ফিগারগুলোকে রিলিফ করে জাগিয়ে দিয়েছে। ছবিগুলোর কোথাও কোথাও শিল্পী নিজেই হাজির হয়েছেন বিপুল ক্ষিপ্রতায়। পরিপ্রেক্ষিতের কারণে কোথাও হাত কিংবা কোথাও পা বা শারীরিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’-এর কম্পোজিশন অনন্য। অবজেক্টের গতিমুখের সাথে ডায়াগোনাল রেখা কোনোক্রমেই সারফেসের শূন্যতাকে অনুধাবন করতে দেয় না। স্পেসে বিষয়বস্তুর ব্যবহারের ক্ষেত্রে শাহাবুদ্দিনের গতি সৃষ্টি ঠিক একরৈখিক নয়। আগে পিছে স্পেস ছেড়ে দিয়েই তিনি কেবল গতি সৃষ্টি করেন এমন নয়। স্পেস না ছেড়েও ফিগারের মোশন ও তুলির আঁচড়ে নির্দ্বিধায় সারফেসের ভেতর থেকেই উত্পন্ন হয় এক প্রকার গতি। এই ছবিগুলোর মধ্যে অপ্রতিরোধ্য , ‘ওরা আসছে’, বা ‘দুরদম্য গতি’, অন্যতম। শাহাবুদ্দিনের গতি অবিরাম এতে কোনো সন্দেহ নেই। এ গতি থামবারও নয়। কারণ চেতনার দিক থেকে একাত্তর এখনো কণ্টকাকীর্ণ। পদে পদে তার বাধা। কিন্তু যতই সে বাধা পেয়েছে ততবেশি সাহস উদ্দীপনা এবং শক্তি নিয়ে এগিয়ে চলেছে প্রগতির পানে। এটা সত্যি যে শাহাবুদ্দিনের বেসিক মূলত গতি ও একাত্তরকে কেন্দ্র করে। গতি ও একাত্তর তাঁর কাছে অভিন্ন। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, একাত্তরের যে গতি সেটাতো কেবল যুদ্ধের মাঠে যোদ্ধার পেশিতে বা সত্যিকার অর্থে বঙ্গবন্ধুতেই কেবল কেন্দ্রিভূত ছিল না। যুদ্ধ মানেই ছোট থেকে বৃহত্ নানান ঘটনা, বিবিধ স্ট্রাগল। বিষয়বস্তুর দিক থেকে শাহাবুদ্দিন যেন ধীরে ধীরে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছেন। কম্পোজিশনেও ক্লিশে ভাব চলে এসেছে। নিজের সৃষ্ট বিন্যাসগুলোর বাইরে এখন আর তাঁকে তুলি ধরতে দেখা যায় না। প্রশ্ন হচ্ছে, যদি ত্রিশ বছর ধরে তাঁর ছবি দেখতে গিয়ে দর্শক একই বিষয়বস্তু একই কম্পোজিশন দেখতে পায় তাহলে এই কষ্ট কেন করবে দর্শক! ‘যুগল’ ছবির ওপরের অংশ ঠিক ততটা ব্যালেন্স না হওয়ার কারণে যথার্থ ভারী হয়েছে বলে মনে হয়। ডান পাশের ফিগারের মাথার অংশ অতিরিক্ত ঝুঁকে থাকার ফলেই এই ভারসাম্যহীনতার উত্পত্তি। শাহাবুদ্দিন নিজে এবং এখানকার শিল্প সমালোচকরা তাঁর ছবির গতির উত্স সম্পর্কে পটভূমি হিসেবে একাত্তরকে রাখেন। এটাকে পুরোমাত্রায় যথার্থ বলা যাবে না। কারণ শাহাবুদ্দিনের পূর্বেই ফ্রান্সিস বেকনসহ আরও কতিপয় শিল্পীর কাজে এই গতির উত্স আমরা দেখতে পাই। তাঁদের কাজের গতির তারতম্যের কারণে বিষয়বস্তুও ঠিক ততটাই ঝাপসা হয়ে যায়। শাহাবুদ্দিনের কাজে রংয়ের ব্যবহার সম্পর্কে বলা যায় যে, তিনি ফিগারগুলোর প্লাস্টিসিটিতে যে রং ব্যবহার করেন এটা ঠিক এখানকার মুক্তিযোদ্ধাদের শরীরের পুড়ে যাওয়া বাদামি রং নয়, এটা ইউরোপীয় ককেশিয় ফিগারের থেকে তুলে নেয়া ক্রিমসন ও অফ হোয়াইট হালকা গোলাপি। মুক্তিযোদ্ধা বা এখানকার মানুষদের ওপর এই রং না চাপালেও শাহাবুদ্দিনের ছবি কী শব্দ করে উঠত না! ধানমন্ডির গ্যালারি ২১-এ ২০ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী চলবে ১১ অক্টোবর ২০১৩ পর্যন্ত।\