শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে ফতুল্লা রণক্ষেত্র, আহত শতাধিক

ন্যূনতম ৮ হাজার টাকা মজুরি নির্ধারণের দাবিতে ষষ্ঠ দিনের মতো পোশাক কারখানার শ্রমিকদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা শিল্পাঞ্চল রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এতে শিল্প পুলিশের ১৫ সদস্যসহ শতাধিক আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ কয়েকজনকে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সংঘর্ষের কারণে সকাল পৌনে ১০টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে যান চলাচল বন্ধ থাকে। ওই সময়ে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা ৮-১০টি কারখানা ও ২০টি যানবাহন ভাংচুর করে। এছাড়া আশুলিয়ার জিরানী বাজার এলাকায় বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করার চেষ্টা করে শ্রমিকরা। এসময় পুলিশের লাঠিচার্জে ১০ শ্রমিক আহত হন। এদিকে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে গতকাল গাজীপুরের কালিয়াকৈর, কোনাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) মোতায়েন করেছে স্থানীয় প্রশাসন। জেলার গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে অনেকটাই স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এসেছে। অধিকাংশ কারখানায় শ্রমিকরা কাজে যোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ফতুল্লার নয়ামাটি এলাকার আইএসএফ (সাবেক মাহমুদা), রূপসীসহ বিভিন্ন গার্মেন্টের কয়েক হাজার শ্রমিক নামাপাড়া ও শিবু মার্কেট এলাকায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। পুলিশ এ সময় কয়েক রাউন্ড টিয়ার সেল ও রাবার বুলেট ছুঁড়লেও তাদের ছত্রভঙ্গ করতে ব্যর্থ হয়। দুপুর ১২ টার দিকে পুলিশ আন্দোলনরত শ্রমিকদের উপর লাঠিচার্জ করলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বেধড়ক লাঠিচার্জ, টিয়ার সেল ও রাবার বুলেট ছুঁড়ে। শ্রমিকেরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ার সময় লিংক রোডে আটকা পড়া উত্সব পরিবহনের ৫টি গাড়িসহ অন্তত ১৫-২০টি যানবাহন ভাংচুর করে। পরে দুপুর দেড়টা থেকে সড়কটিতে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষের পর ঘটনাস্থলে মোতালেব মনোয়ারা গার্মেন্টের প্যাকিং ম্যান পিন্টু মোল্লা, অপারেটর বাবু, সবুজ, রাসেলসহ আরো কয়েকজন শ্রমিক গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে ছিলেন। তাদের উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। সংঘর্ষ ও পুলিশের লাঠিচার্জে অন্তত ৭০-৮০ জন শ্রমিক আহত হয়েছেন, যারা বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন স্থানে চিকিত্সা নিয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ শিল্প পুলিশ-৪ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাসুদ আহমেদ জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তারা শতাধিক রাউন্ড টিয়ার সেল ও রাবার বুলেট ছুঁড়েছেন। সংঘর্ষে আহত পুলিশ সদস্য মেহেদী হাসান, মনির, হাবিবুর রহমান, রোজ আহমেদ, জুয়েল রানা, আলমগীর, মোজাম্মেল, সেলিম, হাসান, সোহেল, হাবিল, রেজাউল, জামান ও মাসুদকে নারায়ণগঞ্জ শহরের খানপুরের ২০০ শয্যার হাসপাতালে চিকিত্সা দেয়া হয়েছে। বর্তমানে ফতুল্লা শিল্পাঞ্চলে পুলিশ মোতায়েন আছে। কয়েকটি গার্মেন্ট বন্ধ রয়েছে বলে তিনি জানান। সাভার রিপোর্টার জানান, দুপুরে আশুলিয়ার জিরানী বাজারে একদল শ্রমিক জড়ো হয়ে মজুরি বাড়ানো ও বন্ধ কারখানা খুলে দেয়ার দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করে। এক পর্যায়ে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা নবীনগর-কালিয়াকৈর সড়কে অবরোধ করলে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় উত্তেজিত শ্রমিকরা ভাংচুরের চেষ্টা করলে এলাকায় আতংক ছড়িয়ে পড়ে। পরে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দিতে আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা ব্যাপক লাঠিচার্জ ও টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে। এতে শ্রমিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন শিল্প পুলিশের পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান। গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, জেলা সদরের চান্দনা চৌরাস্তা, ভোগড়া বাইপাস, নাওজোর, বোর্ডবাজার, সাইনবোর্ড, তিনসড়ক, তেলিপাড়া, সালনা, কড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকার পোশাক কারখানাগুলোতে গতকাল অনেকটা স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এসেছে। সকাল থেকেই হাজার হাজার শ্রমিক শান্তিপূর্ণ পরিবেশে স্ব স্ব কর্মস্থলে যোগ দেন। নাশকতারোধে র্যাব পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি সদস্যদের ব্যাপক তত্পরতা দেখা গেছে। ফলে শ্রমিকরা রাস্তায় নামতে পারেনি। মৌচাক পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. আজহারুল ইসলামের বরাত দিয়ে কালিয়াকৈর সংবাদদাতা জানান, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় কালিয়াকৈর, কোনাবাড়ীসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে ৩ প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তারা ভোর থেকেই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে টহল দিচ্ছেন। কালিয়াকৈরে অধিকাংশ কারখানায় শ্রমিকরা গতকাল কাজে যোগ দেন। তবে অসন্তোষের আশঙ্কায় চন্দ্রা এলাকার নূর গ্রুপের চারটি কারখানা, মৌচাক এলাকার লোগোস এপারেলস ও পল্লী বিদ্যুত্ এলাকার স্টারলিংক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।