আদালত অবমাননা আইন অবৈধ

জাতীয় সংসদে প্রণীত আদালত অবমাননা আইন-২০১৩ অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট। আদালত তার রায়ে বলেছে, এই আইন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতাকে খর্ব করেছে। এতে সরকারি কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের এমন সুরক্ষা দেয়া হয়েছে, যা সংবিধানের ২৭ (আইনের দৃষ্টিতে সমতা), ১০৮ (কোর্ট অব রেকর্ডরূপে সুপ্রিম কোর্ট) এবং ১১২ (সুপ্রিম কোর্টের সহায়তা) অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই আইনটিকে আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত, অবৈধ ও বাতিল বলে ঘোষণা করা হল। বিচারপতি কাজী রেজাউল হক ও বিচারপতি এবিএম আলতাফ হোসেনকে নিয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল বৃহস্পতিবার এই রায় দেয়। হাইকোর্টের এই রায়ের ফলে এখন দেশে আর কোন আদালত অবমাননা আইন বলবত্ নেই বলে আইনজীবীরা জানিয়েছেন। তবে এটর্নি জেনারেল এডভোকেট মাহবুবে আলম বলেছেন, হাইকোর্টের এ রায়ের ফলে ১৯২৬ সালের আদালত অবমাননার আইনটি পুনর্বহাল হবে কিনা তা পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি না দেখে বলা যাচ্ছে না। এদিকে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন বলেন, আমি মনে করি এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হওয়া উচিত। ১৯২৬ সালে আদালত অবমাননা আইন প্রণয়ন করে তত্কালীন ব্রিটিশ সরকার। ওই আইনটি সংশোধন করে ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার অধ্যাদেশ জারি করে। ওই অধ্যাদেশটিও চ্যালেঞ্জ করে সেই সময় হাইকোর্টে রিট মামলা দায়ের করা হয়। ওই রিটের ওপর রুল জারি করে হাইকোর্ট। ওই রুলের চূড়ান্ত শুনানি গ্রহণ করে সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ওই অধ্যাদেশকে অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করেন। এরপর বর্তমান মহাজোট সরকার ১৯২৬ সালে প্রণীত আদালত অবমাননা আইনটিকে রহিত করে গত ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় সংসদে নতুন আদালত অবমাননা আইন-২০১৩ পাস করে। এই আইনের আটটি ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়েরকৃত রিট পিটিশনের চূড়ান্ত শুনানি গ্রহণ করে হাইকোর্টের দেয়া গতকালের রায়ে বলা হয়, সুপ্রিম কোর্ট কখনোই সত্য মন্তব্য বা সমালোচনামূলক প্রকাশনায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে চায় না। তবে বিচারাধীন বিষয় নিয়ে মন্তব্য আমরা কোনোভাবেই গ্রহণ করতে পারি না। এছাড়া সত্য প্রকাশকে অবশ্যই সাংবিধানিক সীমানা মেনে চলতে হবে। বিধিনিষেধ ছাড়া পূর্ণ স্বাধীনতা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। এছাড়া কোন বিষয়ে সুনির্দিষ্ট জ্ঞান ছাড়া সমালোচনা করলে তার ফল কি হতে পারে, সে সম্পর্কে আদালত ওয়াকিবহাল। রায়ে বলা হয়, গণমাধ্যম একটি শক্তিশালী মাধ্যম। এর স্বাধীনতা থাকা উচিত। আমরা চাই না সংবাদ মাধ্যমের হাত বাঁধা থাকুক। তবে আমরা এটাও চাই না, কেউ সীমানার বাইরে যাক। সঠিক ও সত্য প্রকাশের একটি নির্দিষ্ট পরিমণ্ডল থাকতে হবে। রায়ে বলা হয়, যেকোনো আইনেই দেশের সকল নাগরিককে সমান অধিকার দেয়া হয়ে থাকে। তবে এটা আশ্চর্যজনক যে, সকল শ্রেণির নাগরিকের অধিকারকে উপেক্ষা করে দুটি বিশেষ শ্রেণিকে (সরকারি কর্মকর্তা ও সাংবাদিক) এই আইনে সুরক্ষা দেয়া হয়েছে। যা বৈষম্যমূলক এবং সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদের (আইনের দৃষ্টিতে সমতা) সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংসদে পাস হওয়া আদালত অবমাননা আইন-২০১৩ এর গেজেট জারি হয় গত ২৩ ফেব্রুয়ারি। তখন এই আইনের আটটি ধারা সংবিধান পরিপন্থী দাবি করে তা সংশোধনের জন্য সরকারকে লিগ্যাল নোটিস দেন সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবী অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান সিদ্দিকী ও অ্যাডভোকেট আয়শা খাতুন। কিন্তু লিগ্যাল নোটিসের জবাব না পেয়ে গত ৩ এপ্রিল হাইকোর্টে রিট করেন তারা। রিট আবেদনে বলা হয়, এই আটটি ধারা সংবিধান পরিপন্থী। যার মাধ্যমে সংবিধানের ১০৮ অনুচ্ছেদকে অকার্যকর করা হয়েছে। হাইকোর্টের সাংবিধানিক ক্ষমতাকে খর্ব করা হয়েছে। ওই রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩ এপ্রিল হাইকোর্ট এই আইনের ধারা-৪ (নির্দোষ প্রকাশনা বা বিতরণ অবমাননা নয়), ধারা-৫ (পক্ষপাতহীন ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ আদালত অবমাননা নয়), ধারা-৬ (অধঃস্তন আদালতের সভাপতিত্বকারী বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আদালত অবমাননা নয়), ধারা-৭ (কতিপয় ক্ষেত্র ব্যতীত খাস কামরায় বা রুদ্ধদ্বার কক্ষে অনুষ্ঠিত প্রক্রিয়া সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ আদালত অবমাননা নয়), ধারা-৯ (আদালত অবমাননার পরিধি বিস্তৃত না হওয়া), ধারা-১০ (কতিপয় কর্ম আদালত অবমাননা নয়), ধারা-১১ (আদালত অবমাননার অভিযোগ দায়ের ও নিষ্পত্তির বিধান) ও ধারা-১৩ (২) (আদালত অবমাননার শাস্তি ইত্যাদি) কেন অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না-এই মর্মে রুল জারি করে। মন্ত্রী পরিষদ সচিব, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব, আইন সচিব, সংসদ সচিবালয়ের সচিবকে এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়। মন্ত্রী পরিষদ সচিবের পক্ষ থেকে রুলের জবাব দেয়া হয়। পরে কয়েক কার্য দিবসব্যাপী এই রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এই প্রেক্ষাপটে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন গত ২৪ সেপ্টেম্বর একটি দৈনিক পত্রিকা এবং বাংলাদেশ প্রশাসনিক সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনকে মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে পক্ষভুক্ত করতে আবেদন করেন। তবে আদালত এই আবেদন না-মঞ্জুর করে কামাল হোসেনকে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেন। এরপরই বুধবার কামাল হোসেনের বক্তব্য প্রদান শেষ হলে আদালত মামলাটি রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য করে দেয়। সেই মোতাবেক গতকাল আদালত অবমাননা আইনটিকে অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করে রায় দেয় হাইকোর্ট। আদালতে রিটকারী পক্ষে অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ ও রাষ্ট্রপক্ষে অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মুরাদ রেজা ও ডেপুটি এটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট বিশ্বজিত্ রায় শুনানি করেন। রায়ের পর এটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, আদালত অবমাননা আইন প্রণয়ন করেছে সরকার। আইনটি রক্ষার জন্য এটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা করে আদালতে বক্তব্য পেশ করা হয়েছে। আদালত আইনটিকে বাতিল ঘোষণা করেছে। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেব। অপরদিকে রিটকারীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, আদালত আটটি ধারা বাতিল ও অবৈধ বলেছে। একইসঙ্গে পুরো আইনটি বাতিল ঘোষণা করেছে। তিনি বলেন, এই রায়ের পর ১৯২৬ সালের আদালত অবমাননা আইন নিম্ন আদালতের জন্য কার্যকর থাকবে।