হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সিদ্ধান্ত

হাইকোর্ট এক রায়ে জাতীয় সংসদে প্রণীত আদালত অবমাননা আইন-২০১৩ অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেছে। আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন আইন বিশেষজ্ঞগণ। তারা বলেছেন, সাংবাদিকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সরকারি কর্মচারীদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের কথা বিবেচনায় রেখে সরকার এ আইন করেছিল। হাইকোর্ট এটিকে বাতিল ঘোষণা করেছে। আইন বিশেষজ্ঞগণ বলেন, আদালত অবমাননার ধারণাটি মধ্যযুগীয়। অতএব আদালত অবমাননার আইন যতোই কঠিন হবে, সেটি ততোই অগণতান্ত্রিক হবে। প্রসঙ্গত, হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে সরকার ইতিমধ্যে আপিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিচারপতি কাজী রেজাউল হক ও বিচারপতি এবিএম আলতাফ হোসেনকে নিয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ বৃহস্পতিবার ঘোষিত এক রায়ে বলেছেন, আদালত অবমাননা আইন-২০১৩ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতাকে খর্ব করেছে। এতে সরকারি কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের এমন সুরক্ষা দেয়া হয়েছে, যা সংবিধানের ২৭ (আইনের দৃষ্টিতে সমতা), ১০৮ (কোর্ট অব রেকর্ডরূপে সুপ্রিম কোর্ট) এবং ১১২ (সুপ্রিম কোর্টের সহায়তা) অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই আইনটিকে আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত, অবৈধ ও বাতিল বলে ঘোষণা করা হল। এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী ও সাবেক এটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ইত্তেফাককে বলেন, ‘আদালত অবমাননার এই আইনে আমলাদের সুরক্ষা (প্রটেকশন) দেয়া হয়েছে। কিন্তু সংবিধানে বলা হয়েছে আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান। তাহলে আমলারা কেন আলাদাভাবে সুরক্ষা পাবে? এ কারণে হাইকোর্ট আদালত অবমাননা আইনটিকে বাতিল ঘোষণা করেছে।’ তিনি বলেন, ‘সরকার বলেছে, তারা এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে। অতএব আপিল বিভাগে এ বিষয়ে চূড়ান্ত ফায়সালা হবে।’ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ল’ এর পরিচালক ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক ইত্তেফাককে বলেন, ‘আইনটি হাইকোর্ট কর্তৃক বাতিল ঘোষিত হওয়ার পর দেশে আজ পর্যন্ত আদালত অবমাননার কোন আইন নেই। এখন কেউ যদি আদালত অবমাননা করে তাহলে কি হবে?’ তিনি বলেন, অতীতে সংসদে প্রণীত কোন আইন সম্পূর্ণভাবে বাতিল করে রায় দেয়ার কোন নজির মনে পড়ছে না। ওই অর্থে সংসদে পাস করা একটি সম্পূর্ণ আইন বাতিল করার এটাই সম্ভবত একমাত্র নজির। এর আগে আইনের কোন কোন ধারা বাতিল হয়েছে কিন্তু সম্পূর্ণ আইনটিকে বাতিল করা হয়নি। ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘পুরো আইনটিকে বাতিল করার মতো অসাংবিধানিক বিধান এই আদালত অবমাননা আইনে আছে বলে আমার মনে হচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘আদালত অবমাননার ধারণাটা মধ্যযুগীয়। আদালত অবমাননার সুযোগ কমিয়ে যে আইন করা হয়েছে সেই সুযোগ কমানোটা অধিকতর গণতান্ত্রিক। আদালত অবমাননার আইন যত কঠিন হবে, সেটি ততোই অগণতান্ত্রিক। আশা করি সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে।’ এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, এ রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল দায়ের করা হবে। ১৯২৬ সালে আদালত অবমাননা আইন প্রণয়ন করে তত্কালীন ব্রিটিশ সরকার। ওই আইনটি সংশোধন করে ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার অধ্যাদেশ জারি করে। ওই অধ্যাদেশটিও চ্যালেঞ্জ করে সেই সময় হাইকোর্টে রিট মামলা দায়ের করা হয়। ওই রিটের ওপর রুল জারি করে হাইকোর্ট। ওই রুলের চূড়ান্ত শুনানি গ্রহণ করে সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ওই অধ্যাদেশকে অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত ঘোষণা করেন। এরপর বর্তমান সরকার ১৯২৬ সালে প্রণীত আদালত অবমাননা আইনটিকে রহিত করে গত ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় সংসদে নতুন আদালত অবমাননা আইন-২০১৩ পাস করে। এই আইনে কোন কোন বিষয় আদালত অবমাননা নয় তা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। আগের আইনে এটি স্পষ্ট করা ছিল না। সংসদে পাস হওয়া আদালত অবমাননা আইন-২০১৩ এর গেজেট জারি হয় গত ২৩ ফেব্রুয়ারি। তখন এই আইনের আটটি ধারা সংবিধান পরিপন্থি দাবি করে তা সংশোধনের জন্য সরকারকে লিগ্যাল নোটিস দেন সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবী অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান সিদ্দিকী ও অ্যাডভোকেট আয়শা খাতুন। কিন্তু লিগ্যাল নোটিসের জবাব না পেয়ে গত ৩ এপ্রিল হাইকোর্টে রিট করেন তারা। রিট আবেদনে বলা হয়, এই আটটি ধারা সংবিধান পরিপন্থি। যার মাধ্যমে সংবিধানের ১০৮ অনুচ্ছেদকে অকার্যকর করা হয়েছে। হাইকোর্টের সাংবিধানিক ক্ষমতাকে খর্ব করা হয়েছে। ওই রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩ এপ্রিল হাইকোর্ট এই আইনের ধারা-৪, ৫, ৬, ৭, ৯, ১০ ১১ ও ১৩ (২) কেন অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না-এই মর্মে রুল জারি করে।