ফরমালিনমুক্ত বাজার নামেই

‘ফরমালিনমুক্ত বাজার’-এর নামে প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই রাজধানীর বাজারগুলোকে ফরমালিনমুক্ত করার উদ্যোগ নিলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এ পর্যন্ত ৯টি বাজারকে ফরমালিনমুক্ত ঘোষণা করা হলেও এর অধিকাংশ শুধু নামেই ফরমালিনমুক্ত হয়েছে। এছাড়া মত্স্য ও প্রাণি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে যেসব বাজার ফরমালিনমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে, তার সফলতাও প্রশ্নবিদ্ধ। ব্যতিক্রম শুধু মালিবাগসহ দু’একটি বাজার। তাও মাঝেমধ্যে এসব বাজারেও ধরা পড়ে ফরমালিনযুক্ত পণ্য। সমপ্রতি রাজধানীর ফরমালিনমুক্ত (!) এসব বাজারে সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে এ চিত্র পাওয়া যায়। প্রায় ৬ মাস বন্ধ থাকার পর গত মার্চে মত্স্য ও প্রাণি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আবার কাওরানবাজারে ফরমালিন পরীক্ষা কেন্দ্র বসানো হয়েছে। গতকাল শুক্রবার ফরমালিন পরীক্ষা কেন্দে গিয়ে দেখা যায়, সকাল ১০টা পর্যন্ত তাদের এন্ট্রি খাতায় কেবল একটি দোকানের মাছ পরীক্ষা করার কথা লেখা রয়েছে। আবার ১৩ ও ২৬ সেপ্টেম্বর তারিখে কোন দোকানেই পরীক্ষা করার কথা লেখা নেই। আবার কোন কোন দিন মাত্র কয়েকটি দোকানেই পরীক্ষা করে দায়িত্ব শেষ করা হয়েছে। অথচ ফরমালিন আছে কিনা তা সনাক্ত করার জন্য সব দোকানেই ফরমালিন পরীক্ষা করার কথা। আবার পরীক্ষা করা হয় সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। কিন্তু এই সময়ের বাইরে বাজারে ফরমালিনযুক্ত পণ্য ঢুকলে তা পরীক্ষা করা হয় না। এ ব্যাপারে ফরমালিন পরীক্ষা কেন্দে র মোস্তফা রাহি বলেন, আমরা কেবল সন্দেহ হলেই ফরমালিন পরীক্ষা করি। মাঝে মাঝে ফরমালিন ধরা পড়ে। তিনি বলেন, কোন পণ্যে ০.৫৪ মিলিলিটার-এর বেশি ফরমালিন থাকলে তা ধরা পড়বে। এর কম থাকলে ফরমালিন নেই বলে ধরে নেই। অথচ পিওর ফুড অর্ডিন্যান্স, ১৯৫৯ স্পষ্ট বলেছে, ফরমালিন একপ্রকার বিষ এবং তা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। তাই খাদ্যপণ্যে কোনো মাত্রার ফরমালিনই গ্রহণযোগ্য নয়। এদিকে প্রায় একই অবস্থা শান্তিনগর বাজারের ক্ষেত্রেও। এই বাজারে কোন্ দোকানে কি পণ্যে ফরমালিন পরীক্ষা করা হলো তা এন্ট্রি করা হয় না। অথচ সকালে যখন বাজারে পণ্য ঢুকবে, তখন ফরমালিন পরীক্ষার পর তা এন্ট্রি করার নিয়ম রয়েছে। এ ব্যাপারে শান্তিনগর মত্স্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবুল বাসার গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, আমরা বাজারের প্রবেশমুখে পরীক্ষা না করে দোকানে দোকানে গিয়ে ফরমালিন পরীক্ষা করি। আর এন্ট্রি খাতা ব্যবহার করার কথা আমরা জানি না। তবে ভিন্ন চিত্র মালিবাগ বাজারের। গতকাল ভোর সাড়ে ৬টায় গিয়ে দেখা যায়, বাজারের প্রবেশমুখে চলছে মাছ, ফল, সবজিসহ বিভিন্ন পণ্যের ফরমালিন পরীক্ষা। তারপর পরীক্ষায় মাছ, ফল, সবজি ফরমালিনমুক্ত প্রমাণিত হলে দোকানদারের নাম ও পণ্যের নাম খাতায় লিপিবদ্ধ করার পর তা বাজারে ঢোকানো হচ্ছে। তারপরও কখনো কখনো ফরমালিন ধরা পড়ে-একথা স্বীকার করে মালিবাগ বাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শামীম ভুঁইয়া গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, আমাদের বাজারেও ফরমালিন ধরা পড়ে কিন্তু তা খুব কম। মাসে দু’একবার। এছাড়া ফরমালিন ধরা পড়লে তা যে মাত্রারই হোক আমরা সে পণ্য বাজারে ঢুকতে দেই না। কারা মেশাচ্ছে ফরমালিন মালিবাগ বাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শামীম ভুঁইয়া বলেন, খুচরা বা পাইকারি পর্যায়ে সাধারণত ফরমালিন মেশানো হয় না। আমদানিকারক পর্যায়ে এটা হয়। এছাড়া সাতক্ষীরা ও দেশের দূর-দূরান্ত থেকে যেসব মাছ আসে সেসব মাছে বেশি ফরমালিন পাওয়া যায় বলে তিনি জানান। দেশে প্রতি বছর চাহিদার তুলনায় চারগুণ বেশি ফরমালিন আমদানি হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকসূত্র জানিয়েছে, শিল্প, শিক্ষা ও চিকিত্সা খাত মিলিয়ে প্রতিবছর ফরমালিনের চাহিদা রয়েছে ৫০ টন। কিন্তু আমদানি হচ্ছে ২০৫ টন। আমদানিকৃত ফরমালিন খোলা বাজারে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে। পুরনো ঢাকার চকবাজার, মৌলভী বাজার, মিটফোর্ড এলাকায় পানি মিশ্রিত ফরমালিন ৬০ থেকে ৭০ টাকা লিটার দরে বিক্রি হয়। এছাড়া ১ কেজি ফরমালিনের মূল্য মাত্র ২৫০ টাকা। ফলে ফরমালিনের ব্যবহার বেড়েই চলছে। কিসে নেই ফরমালিন! আগে বলা হতো কোন পণ্যে ফরমালিন আছে। আর এখন বলা হয়, কোন্ পণ্যে ফরমালিন নেই। এমনই ভয়াবহভাবে ফরমালিন মেশানো হচ্ছে খাদ্যসামগ্রীতে। সবধরনের ফলই কৃত্রিম উপায়ে পাকাতে ব্যাপকভাবে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, কপার সালফেট, কার্বনের ধোঁয়া, পটাশের লিকুইড সলিউশনসহ বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। আর ফলমূলসহ পচনশীল পণ্য তাজা রাখতে ব্যবহার হচ্ছে ফরমালিন। আম, কলা, খেজুর, পেঁপে, আনারস, মালটা, আপেল, আঙ্গুর, টমেটো, সেমাই, নুডলস, বরফ, মাছের মধ্যে রুই, কাতল, লইট্টা, বোয়াল, কাচকি বিশেষ করে আমদানিকৃত মাছে বেশি পরিমাণে ফরমালিন পাওয়া যায়। এমনকি দুধেও এখন ফরমালিন মেশানো হচ্ছে। সমপ্রতি পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) এক সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়েছে, দেশে কলায় ৯১ শতাংশ, মালটায় ১০০ শতাংশ, আপেলে ৫৯ শতাংশ, আঙুরে ৯৫ শতাংশ, খেজুরে ৭৭ শতাংশ, টমেটোতে ৭৫ শতাংশ, সেমাইয়ে ১০০ শতাংশ, নুডলসে ৯০ শতাংশ এবং আমে ৯৫ শতাংশ ফরমালিন ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা কি বলেন? এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন ইউনিটের ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্ল¬াহ গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ফরমালিন মিশ্রিত খাবার খেলে শরীরে মারাত্মক সব রোগব্যাধির জন্ম নেবে। এরমধ্যে ক্যান্সার ছাড়াও রয়েছে লিভার, কিডনি, ফুসফুস ও অস্থিমজ্জায় নানা অসুখ। এছাড়া রক্তশুন্যতা দেখা দেবে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে যদি গর্ভাবস্থায় মায়েরা ফরমালিন মিশ্রিত ফলমুল খান তাহলে। এরফলে মেধাহীন শিশুর জন্ম নিতে পারে। ফলে আমরা ধীরে ধীরে পঙ্গু জাতিতে পরিণত হবো। এছাড়া ফরমালিন মিশ্রিত খাবার যারা খাবেন শুধু তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না যারা হাত দিয়ে ফরমালিন ব্যবহার করবেন তারাও চর্মরোগে আক্রান্ত হবেন। কি করছে সরকারের পরীক্ষাগারগুলো অভাব নেই সরকারি পরীক্ষাগারের। বিএসটিআই, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, খাদ্য অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, মত্স্য অধিদপ্তর, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে খাদ্যপণ্য পরীক্ষার নিজস্ব পরীক্ষাগার আছে। কিন্তু নিজেদের উদ্যোগে সরকারের কোন পরীক্ষাগারে খাদ্যপণ্যে ফরমালিন আছে কিনা তা কখনো পরীক্ষা করা হয়নি। এছাড়া ব্যক্তিগতভাবে পরীক্ষা করাতে গেলেও পোহাতে হয় নানা দুর্ভোগ। এ ব্যাপারে বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক ইকরামুল হক গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, কোন খাদ্যপণ্যে ফরমালিন আছে কিনা তা বিএসটিআইয়ের নিজ উদ্যোগে কখনো পরীক্ষা করা হয়নি। তবে যারা সার্টিফিকেট নেন তাদের পণ্য আমরা পরীক্ষা করি। তাহলে কি ফরমালিন বন্ধ হবে না! আগের তুলনায় মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়লেও সে অনুপাতে কমছে না ফরমালিনের ব্যবহার। সংশ্লিষ্টরা এজন্য আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবকেই দায়ী করছেন। এ প্রসঙ্গে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল হোসেন মিয়া ইত্তেফাককে বলেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে মানুষের জীবন বা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক কোনো দ্রব্য খাদ্যপণ্যের সঙ্গে মেশানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ অপরাধে অভিযুক্ত অনূর্ধ্ব তিন বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এদিকে গত ২ জুলাই মন্ত্রিসভা নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ (খসড়া) অনুমোদন করেছে। এ আইন বাস্তবায়ন করবে খাদ্য মন্ত্রণালয়। তবে এ আইনের ব্যাপারে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী আবদুস সোবাহান বলেন, খাদ্যদ্রব্যে বিষ মিশিয়ে যারা নীরবে গণহত্যা চালিয়ে একটি জাতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে, তাদেরকে অনূর্ধ্ব পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রেখে যে নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।