বাংলাদেশের গার্মেন্টসে মজুরি সবচেয়ে কম

বিশ্বের অন্যান্য যেসব দেশ বাংলাদেশের সাথে প্রতিযোগিতা করে পোশাক রফতানি করে সেসব দেশে শ্রমিকদের মজুরি বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি। চীনে একজন শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ২২৩ মার্কিন ডলার। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এবং উদীয়মান অর্থনীতির দেশ কম্বোডিয়ায় এ মজুরি ৭০ মার্কিন ডলার। ইন্দোনেশিয়ায় একজন শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ১১৪ ডলার এবং ভিয়েতনামে ১০৯ ডলার। আর বাংলাদেশে একজন শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ৪০ ডলারের মতো। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানিকারকরা বহুবিধ সুবিধা ভোগ করার পরও এ খাতের প্রাণ শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর ক্ষেত্রে তাদের অনীহা প্রবল। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোতে তৈরি পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত সুবিধা পায় দীর্ঘদিন ধরে। এছাড়া কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং জাপানে রফতানির ক্ষেত্রেও এ সুবিধা অব্যাহত আছে। ভারত, চীন এবং কোরিয়ায় পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা আংশিক শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়ে থাকেন। এর বাইরেও নতুন বাজারে পোশাক রফতানি করলে (যেসব দেশে আগে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি হয়নি) উদ্যোক্তরা দুই শতাংশ হারে প্রণোদনা পান। এর বাইরেও স্থানীয় কাপড় সূতা ব্যবহার করলে সরকার পাঁচ শতাংশ বিকল্প নগদ সহায়তা দেয় সরকার। কিন্তু এতকিছুর পরও ২০১০ সালের পর ২০১৩ সালে এসে উদ্যোক্তারা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি মাত্র ৬’শ টাকা বাড়াতে চান। আর এ নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে পোশাক শিল্পে তীব্র শ্রমিক অসন্তোষ বিরাজ করছে। বিশ্বের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তৈরি পোশাক রফতানিতে প্রতিবছর যে হারে প্রবৃদ্ধি হয়েছে সে তুলনায় শ্রমিকদের বেতন বাড়ানো হয়নি। শুধু ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডাই নয়, বিভিন্ন নতুন বাজারে পোশাক রফতানি বেড়েছে। ২০১১-১২ অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাসে অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, চিলি, চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মেক্সিকো, রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং তুরস্কে বাংলাদেশ মোট ৮০ কোটি মার্কিন ডলারের পোশাক রফতানি করেছিলো। এর পরের অর্থবছরে অর্থাত্ ২০১২-১৩ অর্থবছরের একই সময়ে এ রফতানি গিয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় একশ কোটি মার্কিন ডলারে। এদিকে, বড় আকারে যেসব উদ্যোক্তা তৈরি পোশাক রফতানি করেন তাদের অনেকেই নানা খাতে তাদের ব্যবসা বাড়িয়েছেন। শুধু পোশাক কারখানা দিয়ে শুরু করলেও পরে তাদের বিনিয়োগ গেছে টেলিকম, হাউজিং, কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প, ব্যাংক, বীমা, নানা আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন খাতে। কিন্তু সফলভাবে তাদের পোশাক কারখানা এখনো চললেও শ্রমিকদের জীবন চালানোর মতো মজুরি নির্ধারণে তাদের অনেকেরই অনীহা রয়েছে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের প্রসারে ৭০ এর দশক থেকে যে দুটি বিষয় কাজ করেছে তা হলো উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর কোটা সহায়তা এবং ইউরোপীয়ান দেশগুলোর অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা। ১৯৮০ সাল থেকে তৈরি পোশাক বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য রফতানির তালিকায় নাম লেখাতে থাকে। ২০০২ সালে এসে বাংলাদেশ মোট ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করে। ২০০৫ সালে কোটা উঠে যাবার পরও বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা তাদের সক্ষমতা দিয়ে ক্রেতাদের ধরে রাখতে সক্ষম হয়। এর ফলে যে বাংলাদেশ ২০০৭ সালে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি করতো তা আজ ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। রফতানি এত বাড়লেও পোশাক শ্রমিকদের মজুরি তেমন বাড়েনি। ২০১০ সালের আগে বাংলাদেশের একজন পোশাক শ্রমিক ন্যূনতম মজুরি পেতেন এক হাজার ৬৬২ টাকা। ২০১০ সালে এসে তা দাঁড়ায় তিন হাজার টাকায়। সর্বশেষ যে মজুরি বোর্ড গঠিত হয়েছে তাতে বিজিএমইএর পক্ষ থেকে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৬’শ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে বিজিএমইএ নেতাদের কেউ কথা বলতে রাজি হননি।