পহেলা অক্টোবর বিশ্ব প্রবীণ দিবস

তাঁদের জন্যও থাকুক একটু সময়

প্রত্যেক প্রবীণ কারো না কারো মা, কারো না কারো বাবা। মা-বাবা এই শব্দদ্বয়ের চেয়ে মধুর, মায়াবী, প্রশান্তির, ভালোবাসার আর কোনো শব্দ নশ্বর এ জগতে আছে কিনা জানা নেই । বাবা-মা এই শব্দদ্বয়ের ভেতর যেন আস্ত একটা পৃথিবী লাটিমের মতো ঘুরপাক খায়। যে বাবা-মা সন্তানের জন্য ছাড় দেন নিজ জীবনের সব সুখ-দুঃখ ত্যাগ করেন আনন্দ-উল্লাস, কেবল সন্তানের মুখপানে চেয়ে ভুলে যান আর পৃথিবীর সব, যে সন্তানদের জন্য কখনো খেয়ে কখনো না খেয়ে, জীবনের মোহনীয় অনেক কিছুই পেয়ে না পেয়ে হাসিমুখে হাজার যন্ত্রণা মেনে বুকের উষ্ণতায় আগলে রেখে সন্তানকে করেন স্বাবলম্বী। বাবা-মায়ের প্রৌঢ়তায়, তাঁদের জীবনের শেষ প্রহরগুলোতে সন্তান হিসেবে আমরা কতটুকু সহযোগী হাত বাড়াই সেই বাবা-মায়ের প্রতি? একদিন শিশুসন্তানকে কোলে-পিঠে নিয়ে রাতদিন এক করে নিজেই যখন আবার সময়ান্তে শিশু হয়ে যান তখন সবল সন্তানরা কি কোলে তুলে নেন সেই মা-বাবাকে? অসহায় অবলা নিঃসঙ্গ সেই বাবা-মা’র দিকে থাকে কি সচেতন খেয়াল? অথবা সন্তান যখন জীবন-জীবিকার তাগিদে ব্যস্ত তখন কী করে কাটে প্রবীণ মানুষ-এ বাবা-মায়েদের একাকিত্বের প্রহর? ১. আফিয়া হায়দারের ৫৯ বছর বয়সের শরীরটা চলতে চাইলে চালান নতুবা একটু বিশ্রামের আশায় এলিয়ে পড়েন বিছানায়। বল পেলে সেরে নেন নিজের নাস্তা অন্যথায় মনটা আর চলে না। এটাই নিয়ম আফিয়া হায়দারের। অথচ ভিন্ন হবার কথা ছবিটা। কেউ একজন ডেকে দিবেন, অজুর পানি এগিয়ে দিবেন, যাই হউক-এগিয়ে দিবেন নাস্তাটা। আফিয়া বেগম খাবেন, টিভি দেখবেন, এঘর থেকে ওঘরে যাবেন নির্ভার নিঃশ্বাস ফেলবেন; বয়সে তার তাই পাবার কথা। কিন্তু পৃথিবী নিদারুণ! প্রশ্ন করি, তবে কেন এখানে মেয়ের সংসারে, আপনার ছেলে নেই? ‘আছে আবার নাই।’ কেমন? ‘তারা এহন বড় মানুষ বড় চাকরি করে বড় দালানে থাকে; আমারে মানায় না তাগো লগে!’ ছেলেরা দেখে না আপনাকে? ‘দেখে! আমি যাই নাড়ির টানে, মাঝে-মধ্যে তখন দেখা হয়।’ শক্ত মুখ টকটকে লাল চোখ, বলি রেখার ভাঁজে ভাঁজে হয় ঘাম না হয় দুঃখের বালি চিকচিক করে। কথা আটকে যায়, বার বার শ্বাস ফেলেন। আঁঁচলটা টেনে আড়ালে জল মোছেন চোখের। বলি, এই বাসায় আলাদা করে কাজের লোক নেই? ‘আছে আছে।’ কই সে? ‘এই যে আমি।’ আবার বলেন, ‘মেয়ে নিতে চায় আমিই নিতে দেই না। বাইরের লোক কেমন না কেমন কী দরকার! চলে তো যাচ্ছে!’ লক্ষ্যহীন চেয়ে থাকেন পাশের জানালা দিয়ে দূরের কোনো একটা কিছুর দিকে। খেয়াল ভাঙ্গাই না ...এভাবেই কাটে বয়সি মায়াবৃক্ষের যত্নহীন একাকী সময়। আফিয়া হায়দারের তিন ছেলে। ব্যাংক ব্যবসা শিক্ষকতায়্ স্বনামে প্রতিষ্ঠিত। নিজের বাড়িতেই থাকেন। তাদের অভাব নেই, নেই অনটন। দামি গাড়িতে চড়েন। আভিজাত্যের অভিজাত আলয়ে চলাচল করেন অথচ যে গর্ভধারিণী রোদ বৃষ্টি ঝড় বাদল আগলে, ক্লান্তিহীন সংগ্রাম আর নিজের শখ-ইচ্ছা, ভালো লাগা-মন্দ লাগা বিসর্জন দিয়ে ৪ ছেলে-মেয়ের জীবন সুন্দর করে তুললেন, তাঁর জীবন প্রারম্বে অসামান্য দুঃখ-কষ্ট নিজের জীবনের সঙ্গী করে আদরে আমুদে বড় করলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বমান শিক্ষার আলোয় উজ্জ্বল করলেন জীবন বেলার পরন্ত সময়ে সে গর্ভধারিণী চোখ মোছেন সব চোখের আড়ালে। ২. আলি আল মালেকা বেগম। সরকারি চাকরি থেকে অবসরে এসেছেন বছর নয়-দশ হলো। বয়স নেই দ্বিতীয় কোনো পরিশ্রমের কাজে নিজেকে ব্যস্ত করার। অবসর কাটে তাই ঘরে বসে থেকেই। মালেকা বেগমের তিন সন্তান। এক মেয়ে, দুই ছেলে। মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন, থাকে শ্বশুরালয়ে-মাঝে মাঝে আসে। ছেলেরা ব্যস্ত চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে। ছেলের বউরাও জড়িত এটা-ওটার সাথে। বাসায় থাকে শুধু এক নাতী। সেও ব্যস্ত তার বয়সি কাজে। অবসর আর একা কেবল মালেকা বেগম। সময় সময় নামাজ পড়া, টিভি দেখা, পত্রিকার টুকিটাকি সংবাদ পড়া— কিন্তু তা কতক্ষণ? তিনি বলেন, ‘দিন বড় ভয়ানক মনে হয়! সময় কাটতে চায় না, এক একা লাগে, নিজেকে নির্জীব কোনো এক আজব বাস্তব মনে হয়। এক একটা দিনকে মনে হয় দীর্ঘ বছর মাসের সমান। সারাটা দিন খুব ফাঁকা মনে হয় চার রুমের ফ্ল্যাটটি, এ ঘর থেকে ও ঘর, ও ঘর থেকে এ ঘর। মাঝে মাঝে ছুট দিতে ইচ্ছে করে অনেক দূরের কোথাও যেখানে অনেক মানুষ, অনেক ভিড়, অনেক হৈচৈ। চার দেয়ালের ভিতর শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে কখনো কখনো, এই বুঝি বার্ধক্য, এই বুঝি জীবন?’ সন্ধ্যা হলে যখন ছেলে, ছেলের বউ, নাতি সবাই বাসায় ফিরে; কোনো উত্সবে মেয়ে, মেয়ের জামাই নাতনি সবাই যখন একসাথে হয় তখন মালেকা বেগমের ভিতরটা আপনাতেই আনন্দে মেতে ওঠে, খুব না হউক দু-একটা কথা বলার মানুষ জোটে, কথা না হউক সবাইকে চোখে দেখে ভালো লাগে। নিজেকে একা মনে হয় না। ভেঙ্গে পড়ার আগে নিজেকে ভাঙ্গা মনে হয় না। মনে হয় আমার কেউ আছে।’ অথচ সকাল হলেই আবার সেই নিঃসঙ্গ, সেই একাকিত্বের জ্বলজ্বল ছবি...। দিন হয় সপ্তাহ, সপ্তাহ হয় মাস, মাস হয় বছর। এভাবেই কাল থেকে কালান্তর।