বধ্যভূমির গদ্য
প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৯:৪৭
১৭ এপ্রিল ভোর রাতে রংপুর থেকে পীরগঞ্জের মাদারগঞ্জ হয়ে পাকসেনাদের গাইবান্ধা প্রবেশের পথে মাদারগঞ্জের নলেয়া নদীর ব্রীজে মুক্তিযোদ্ধারা সুবেদার আলতাফের নেতৃত্বে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এ প্রতিরোধ যুদ্ধে ২১ জন পাঞ্জাবী নিহত ও নুরুল আমিন নামে একজন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। পরে ওই দিন সন্ধ্যায় ওই পথ ধরেই আবারো পাক হানাদার বাহিনী ভারী ও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রসহ সাদুল্লাপুর হয়ে গাইবান্ধায় প্রবেশ করে। তারা শহরের স্টেডিয়ামে (বর্তমান শাহ আব্দুল হামিদ স্টেডিয়াম) ঘাঁটি করে। এ অবস্থায় মুিক্তযোদ্ধারা গাইবান্ধা শহর ত্যাগ করে যমুনা-বক্ষ্মপুত্রের চরে নিরাপদ স্থানে চলে যান। গাইবান্ধা হানাদারদের আয়ত্বে আসে।
সেইদিন ১৭ এপ্রিল থেকে সারাদেশের মতো গাইবান্ধাতেও শুরু হয় পাক সেনাদের নির্বিচারে গণহত্যা, বিকৃত নারী নির্যাতন, লুটপাট এবং গ্রাম আর গঞ্জে অগ্নিসংযোগের মতো নারকীয় যজ্ঞ। বন্ধ হয় ৭ ডিসেম্বর। এ সময়ে তারা হাজার হাজার মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে মাটি চাপা দিয়ে রাখে। জেলায় এরকম ২৮ বধ্যভূমি ও গণকবর চিহ্নিত করা হয়েছে। এরমধ্যে স্টেডিয়াম সংলগ্ন বধ্যভূমি (কফিল সাহার গোডাউন), কামারজানী বধ্যভূমি, ফুলছড়ি বধ্যভূমি, কাইয়ারহাট বধ্যভূমি, সুন্দরগঞ্জ বধ্যভূমি (থানা সদরের শহীদ মিনার), লালচামার বধ্যভূমি, সুজালপুর প্রাইমারী স্কুল মাঠ বধ্যভূমি (কামালেরপাড়া ইউনিয়ন), কাশিয়াবাড়ী বধ্যভূমি ও কাটাখালি বধ্যভূমি উল্লেখযোগ্য।
স্টেডিয়াম সংলগ্ন বধ্যভূমি (কফিল সাহার গোডাউন):- পাক হানাদাররা গাইবান্ধা স্টেডিয়াম (বর্তমানে শাহ আব্দুল হামিদ স্টেডিয়াম) এ ঘাঁটি করার পর প্রতি রাতেই অসংখ্য মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করে স্টেডিয়াম সংলগ্ন দক্ষিণ পাশের কফিল সাহার গোডাউনে মাটি চাপা দিয়ে রাখতো। বিভিন্ন বয়সী মেয়েদেরও ধর্ষণের পর হত্যা করে ওখানে পুঁতে রাখা হয়। প্রথম দিনেই বেশ কয়েকজন যুবককে ধরে এনে স্টেডিয়ামের পাশে রের লাইনের ধারে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে। পানি খেতে চাইলে মুমূর্ষু এ হতভাগ্যদের মুখে প্রস্রাব করে দেয় পাক সেনারা। এভাবে এক হাজারেরও বেশি লোকজনকে ক্যাম্পে ধরে নিয়ে এসে হত্যা করে। অনেক ক্ষেত্রে যাদেরকে হত্যা করা হত তাদেরকে দিয়েই সেই গর্ত মৃত্যু আগে খুঁড়ে নেয়া হত।
ফুলছড়ি বধ্যভূমি:- জেলার ২৮ টি বধ্যভূমি ও গণকবরের মধ্যে সবচেয়ে বড় বধ্যভূমি যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকাসহ সমগ্র পূর্ব-পশ্চিম থেকে ট্রেন পথে উত্তরবঙ্গ পৌঁছার একমাত্র প্রবেশ দ্বার তিস্তমুখ ঘাট এই ফুলছড়ি উপজেলায় অবস্থিত ছিল। তাই ভৌগোলিক এবং সামরিক রণকৌশনগত দিক থেকে ওই এলাকাটির গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। হানাদাররা গাইবান্ধা দখলে নিয়েই পরের দিন ১৮ এপ্রিল ফুলছড়ি থানা বিনা প্রতিরোধে দখল করে নেয়। পাক বাহিনী ফুলছড়ি সিও অফিস এবং তিস্তামুখ ঘাটে শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে। রাজাকার-আলবদরদের সহযোগিতায় তারা এখানেও শুরু করে নির্বিচারে গণহত্যা, বিকৃত নারী নির্যাতন, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগ। শহীদদের লাশ পুঁতে রাখাদের একজন বাটু শেখ পুশু বলেন, কেউ গুলিতে মারা না গেলে, তাকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারতো। এ সংখ্যা চার/সাড়ে চার হাজারের কম হবে না। মিলিটারীরা শুধু আশপাশের গ্রাম থেকে মানুষ ধরে আনত না। ট্রেনে যাতায়াতের সময় অনেককে নামিয়ে নিয়ে আসত। তাদেরকেও এখানে নিয়ে এসে হত্যা করা হত।
কাশিয়াবাড়ী বধ্যভূমি:- ১৯৭১-এর জুন মাস, দিনটি শুক্রবার। ভোর রাতেই করতোয়া নদীর ওপাড় দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট থেকে উপজেলার সদরের বিহারী কলোনীর কয়েকজন বিহারী এবং রাজাকারসহ পাক সেনারা নদী পার হয়ে করতোয়া নদীর গা ঘেঁষে অবস্থিত গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার কিশোরগাড়ী ইউনিয়নের কাশিয়াবাড়ী গ্রামে প্রবেশ করে। তারা আশপাশের সগুনা, কেশবপুর, রামচন্দ পুর, হাইতর, হাসানঘোড়সহ কয়েকটি গ্রামে ঘিরে ফেলে। তখনও অধিকাংশ গ্রামবাসী ঘুম থেকে জেগে উঠেনি। অতর্কিত হানাদারদের আক্রমণে প্রাণভয়ে গ্রামগুলোর নর-নারী শিশুরা দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করে। কিন্তু তারপরও নরপিচাশ পাকবাহিনী কাশিয়াবাড়ীতেই ওই দিন একটিও গুলি খরচ না করে শুধুমাত্র পশুর মত জবাই করে নরবলি দিয়ে হত্যা করেছিল দেড় শতাধিক হতভাগ্য নিরীহ বাঙালিকে। অবাঙ্গালী রমজান কসাই ও রাজাকার হানিফ মওলানা এক বিরাট দা দিয়ে নৃশংসভাবে তারা জবাই করে একের পর এক নিরীহ মানুষকে। এক একজনের মৃত্যু নিশ্চিত করার পর লাথি মেরে লাশ ফেলে দেয় পাশের ডোবায়।
সুজালপুর প্রাইমারী স্কুল মাঠ বধ্যভূমি, (কামালেরপাড়া ইউনিয়ন):- ৬ ডিসেম্বর সকালে গোবিন্দগঞ্জ থানার মহিমাগঞ্জ ক্যাম্প থেকে পাকসেনারা রাজাকারদের নিয়ে গাইবান্ধার সাঘাটার সুজালপুর গ্রামে প্রবেশ করে। ওই গ্রামসহ পার্শ্ববর্তী ৫টি গ্রামে যার যা পেয়েছে সব লুটপাট করার পর ঘরবাড়ী আগুন দিয়ে পুড়ে দেয়। পরে ১১ জন যুবক ও মধ্য বয়সীকে ধরে মাদ্রাসা মাঠে (বর্তমান সুজারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়) নিয়ে আসে। পাকসেনাদের নিকট থাকা ওই গ্রামগুলির ম্যাট্রিক (এসএসসি) ও আই এ (এইএসসি) পাস করা ছাত্রদের এবং মুক্তিবাহিনীর ঠিকানা তাদের কাছে জানতে চায়। কিন্তু তারা তথ্য না দেয়ায় মাদ্রাসা মাঠের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে দড়ি দিয়ে বেঁধে সার করে দাঁড় করায়ে তাদেরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। কিন্তু তাদের মধ্যে ভাগ্যক্রমে সেদিন বেঁচে যায় আব্দুল মতিন খন্দকার, মৌলভী মো. মোজাম্মের হক ও মো. আমিনুল ইসলাম।
লালচামার বধ্যভূমি:— গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তিস্তা নদী তীরের গ্রাম লালচামার। নদী ওপারে কুড়িগ্রাম। পশ্চিমে চণ্ডিপুর হাইস্কুল। ৭১-এ এই স্কুলেই ছিল জেলার একমাত্র রাজাকারদের ক্যাম্প। মাঝে মাঝে পাক সেনারা সেখানে যাতায়াত করতো। ওই ক্যাম্পের রাজাকাররা ৭১-এর ভাদ্র মাসের কোন এক সময়ে সুন্দরগঞ্জ সদর থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ও আওয়ামী লীগের সমর্থক ১৩ জনকে ধরে নিয়ে এসে লালচামারের তিস্তার পারে হত্যা করে।
সুন্দরগঞ্জ বধ্যভূমি (থানা সদরের শহীদ মিনার):- ৭১-এর এপ্রিল মাসে সুন্দরগঞ্জের সিও অফিসে ( বর্তমানে উপজেলা পরিষদ) পাক সেনা ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বিভিন্ন গ্রাম থেকে সহস্রাধিক যুবক, যুবতী, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ও আওয়ামী লীগ কর্মী-সমর্থকদের স্থানীয় রাজাকার-আলবদরদের সহযোগিতায় ধরে এনে ক্যাম্পের টর্চার সেলে নির্যাতনের পর বিলের ধারে হত্যা করে ফেলে দেয়া হয়।
কামারজানী বধ্যভূমি:- পাক হানাদাররা গাইবান্ধা স্টেডিয়ামের ঘাঁটি থেকে কামারজানি হাইস্কুলে ক্যাম্প করে মে মাসে। নদী পার হয়ে এ পথে মুক্তি সেনারা কুড়িগ্রাম হয়ে ভারতে যেত ট্রেনিং নিতে। তাই পানি উন্নয়ন বোর্ডের বহ্মপুত্র নদের বাঁধ ধরে কামারজানি থেকে দাড়িয়াপুর-রসুলপুর-কাইয়ারহাট-ফুলছড়ি এ পথে পাক সেনাদের ছিল কঠোর প্রহড়া। ওই সময় পূর্ব গিদারী গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জল হোসেন বাড়ীতে আসেন। দালালদের কাছে খবর পেয়ে পাক সেনারা তাকে বাড়ী থেকে নিয়ে এসে অমানবিক নির্যাতন পর কামারজানি গ্রামের আরো ৯ জনের সাথে একই দিনে তাকে হত্যা করে এখানে মাটি চাপা দেয়।