কেনিয়ার শপিংমল ট্র্যাজেডি
প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:২৪
একটা সময় ছিল যখন সন্ত্রাসীদের হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল প্রতিপক্ষের সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ। কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে সন্ত্রাসীদের হামলার ধরনও পাল্টেছে। এখন আর হামলার ক্ষেত্রে কোন নীতি, নৈতিকতা, বিবেচনাবোধের ধার ধারছে না সন্ত্রাসীরা। তাদের হামলায়, বোমা বিস্ফোরণে, গুলিতে মারা যাচ্ছে নারী-শিশুসহ অগণিত বেসামরিক মানুষ। সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞাও তাই এখন নতুন করে লিখতে হচ্ছে। আর সেই সংজ্ঞা লিখতে গেলে সন্ত্রাসী হামলার সামপ্রতিকতম উদাহরণ হিসেবে অবশ্যম্ভাবীভাবে এসে পড়বে কেনিয়ার নাম। আজ থেকে মাত্র ৮ দিন আগের কথা। ২১ সেপ্টেম্বর দুপুরবেলা কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবির বহুতলবিশিষ্ট শপিং মল ওয়েস্ট গেটে প্রতিদিনের মতই হয়েছিল ক্রেতাদের প্রচন্ড ভিড়। দোকানে দোকানে গিয়ে তারা কিনছিলেন পছন্দের জিনিসটি। ফুড কোর্টেও ছিল ভোজন-রসিকদের ভিড়। একটা ফ্লোরে আবার চলছিল বাচ্চাদের রান্নার প্রতিযোগিতা। এমন এক আনন্দঘন মুহূর্তে সূত্রপাত হলো কেনিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কজনক এক অধ্যায়ের- আল শাবাবের জঙ্গিরা টানা তিনদিন ধরে সেখানে চালালো নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। শপিং মলের চকচকে মার্বেল পাথরের মেঝে পিচ্ছিল হলো মানুষের তাজা রক্তে। জঙ্গিদের গুলিতে ও গ্রেনেড বিস্ফোরণে তিনদিনে নিহত হয় ৫ সৈন্য, নারী ও শিশুসহ অন্তত ৬৭ জন মানুষ, আহত হয় ১৭০ জনেরও বেশি। ভয়াবহ এই সহিংসতায় স্তম্ভিত হয় সারাবিশ্ব। চারিদিকে বয়ে যায় নিন্দার ঝড়। কয়েকদিন ধরে পত্র-পত্রিকাগুলোর প্রধান শিরোনামের জায়গা দখল করে থাকে ‘ওয়েস্ট গেট শপিং মল হত্যাযজ্ঞ’।
কারা এই আল-শাবাব?
সোমালিয়ার জঙ্গি সংগঠন আল-শাবাবকে বলা যেতে পারে আল-কায়দার সোমালি অনুচর। ইসলামি উগ্রপন্থি এই সংগঠনটি একসময়ে সোমালিয়ার জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক কোর্ট ইউনিয়নের (আইসিইউ) অংশ ছিল। ২০০৬ সালে সোমালিয়ার অন্তর্বর্তীকালীন সরকার(টিএফজি) ও তার ইথিওপিয়ার সামরিক মিত্রদের কাছে পরাস্ত হয় ইসলামিক কোর্ট ইউনিয়ন। এরপরই ইউনিয়ন থেকে সরে আসে আল-শাবাব এবং টিএফজি ও আফ্রিকান ইউনিয়ন মিশন টু সোমালিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে দেয়। ‘ইসলামের শত্রুদের’ বিরুদ্ধে তারা জিহাদ ঘোষণা করে। সোমালিয়ায় বিদেশি সংস্থার অনেক সদস্য, এনজিও কর্মীদের অপহরণ ও হত্যার সঙ্গে আল-শাবাবের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া যায়।
শপিং মলে হামলা কেন?
সোমালিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে কয়েক বছর যাবত্ ‘লিনডা চি’ নামে আল-শাবাব নিধন অভিযান চালাচ্ছে সোমালিয়া ও কেনিয়ার যৌথ সামরিক বাহিনী। সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসু থেকে বিতাড়িত করেছে আল-শাবাব সদস্যদের। লিনডা চি অভিযান বন্ধের দাবিতে আল-শাবাব অনেকদিন থেকেই কেনিয়ায় হামলার হুমকি দিয়ে আসছে এবং এর মধ্যে বেশ কিছু হামলার ঘটনায় অনেকে হতাহতও হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় ওয়েস্ট গেট শপিংমলে হামলা হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। দ্য সানডে টেলিগ্রাফ পত্রিকার দাবি, তারা জাতিসংঘের এমন কিছু দলিলপত্র দেখেছে যাতে কেনিয়ায় বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলা হতে পারে বলে কেনীয় সরকারকে গতমাসেই সতর্ক করে দেয়া হয়েছিল। শপিংমলে হামলার ঘটনার পর নাইরোবির সিনেটর মাইক সনতো বলেছেন যে, মাস তিনেক আগেই তিনি কেনিয়ায় সম্ভাব্য হামলার ব্যাপারে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সতর্ক করেছিলেন।
তদন্ত ও গ্রেফতার
শপিং মলে হামলার ঘটনায় জড়িতদের খুঁজে বার করতে কেনিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীকে সহায়তা করছে ব্রিটিশ পুলিশ কর্মকর্তারা। তদন্ত কার্যক্রমও শুরু হয়ে গেছে। শপিং মলের মতো দেশটির অন্যান্য পাবলিক প্লেসগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। কয়েকদিন আগ পর্যন্ত সন্দেহভাজন ১০ ব্যক্তিকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, বর্তমানে ফরেনসিক পরীক্ষার কাজ চলছে যার মাধ্যমে হামলার ঘটনায় সম্পৃক্তরা কোন্ দেশের তা জানা যাবে। এক ব্রিটিশ নারী ও দুই-তিনজন মার্কিন নাগরিক হামলায় জড়িত ছিল বলে ধারণা করছেন তারা।
কিছু প্রশ্ন
নাইরোবির শপিং মলে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হওয়ার পর কিছু প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। কেনিয়ানদের একটা বড় জিজ্ঞাসা হলো, এতসব ভারি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এতগুলো লোক কি করে নির্বিঘ্নে হেঁটে শপিং মলে ঢুকে পড়লো? যেখানে শপিং মলের প্রবেশদ্বারে আগত প্রত্যেককে তল্লাশি করে দেখার কথা। এমনকি কোন গাড়িও চেক না করে সেখানে ঢুকতে দেয়া হয় না। তাহলে কি করে সমস্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে জঙ্গিরা সেখানে যেতে পারলো এবং কিভাবেই বা এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ শেষে বেরিয়ে যেতে পারলো?
কেনিয়ায় এর আগেও আল-শাবাব বেশ কয়েকবার হামলা চালিয়েছে যাতে অনেকের প্রাণহানিও ঘটেছে। এ কারণে নাইরোবির নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট জোরদার থাকার কথা। সেক্ষেত্রে কি করে এই হামলা সম্ভব হলো। কেনিয়ার সাংবাদিক জোসেফ ওয়ারুঙ্গুর কাছে এসব প্রশ্নের কিছু উত্তর আছে যেগুলো হয়তো প্রশাসনের অনেকেরই ভালো লাগবে না। সাংবাদিক জোসেফ নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার জন্য মূলত কর্মকর্তাদের দুর্নীতির প্রবণতাকেই দায়ী করেছেন। জোসেফসহ অনেকেরই ধারণা, মোটা অংকের অর্থ খরচ করলে সেদেশে যে কেউ অস্ত্রসহ ঢুকে যেতে পারবে। এমনকি সেখানে যেতে পাসপোর্ট, ভিসা কোন কিছুরই দরকার হবে না। চাইলে কেনিয়ার সিটিজেনশিপও ম্যানেজ করা যেতে পারে। জোসেফের ধারণা যদি সত্যি হয়, তাহলে ওয়েস্ট গেট শপিং মল ট্র্যাজেডির যে পুনরাবৃত্তি হবে না সেকথা জোর দিয়ে বলা যাবে না।