মালদ্বীপে আবার ‘পাগলা রাজা’?

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় বিশ হাজার ফুট উঁচুতে মন্ত্রিসভার প্রতীকী বৈঠক করেছিল নেপাল। আর তা দেখে ভারত মহাসাগরের জলের নিচে মন্ত্রীদের নিয়ে সভায় বসেছিলেন মালদ্বীপের তত্কালীন (২০১২) প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশীদ। তারও উদ্দেশ্য ছিল একই। নাশীদের এমন ক্ষেপাটে আচরণের কথা আরো অনেক বলা যায়। নিন্দুকদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘পাগলা রাজা’ হিসেবে। কিন্তু এসব কথায় তিনি কান দিতেন না। ‘পাগলামো’ সত্ত্বেও মালদ্বীপের আমজনতার কাছে ঠিকই জনপ্রিয় ছিলেন। তার বড় প্রমাণ— এ মাসের ৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম পর্যায়ে নাশীদই জয়ী হন। এতে তিনি পান ৪৫ শতাংশ ভোট। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে সামান্য দূরে থেকে যান তিনি। প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্যে প্রথম পর্যায়ে প্রয়োজন ছিল ৫০ শতাংশের বেশি ভোট। তাইতো চলতি মাসের ২৮ তারিখ অনুষ্ঠিতব্য পরবর্তী দফার ভোট নাশীদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথম দফার নির্বাচনে মোহাম্মদ নাশীদের প্রাপ্ত ভোট ৯৫,২২৪। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক ‘স্বৈরশাসক’ মামুন আব্দুল গাইয়ুমের সত্ভাই ইয়েমিন আবদুল্লাহ কাইয়ুম পান ৫৩,০৯৯ ভোট, যা প্রদত্ত মোট ভোটের ২৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ। ৫০,৪৬২টি বা ২৪ দশমিক ০৭ শতাংশ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থান দখল করেন রিসোর্ট টাইকুন, গাইয়ুম সরকারের অর্থমন্ত্রী এবং মালদ্বীপের সবচে’ ধনী লোক কাসিম ইব্রাহিম। বর্তমান প্রেসিডেন্ট মোহামেদ ওয়াহীদ হাসান মানিকের ঠাঁই হয়েছে সবার শেষে। তিনি পান মাত্র ৫ শতাংশ ভোট। ২০১২ সালে মোহাম্মদ নাশীদ ক্ষমতা ছাড়ার সময় ওয়াহীদ ছিলেন তার ভাইস প্রেসিডেন্ট। প্রধান বিচারক আবদুল্লাহ মোহামেদকে পক্ষপাতিত্বের দায়ে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়ে জনরোষের মুখে ক্ষমতা ছেড়েছিলেন নাশীদ। কিন্তু তিনি দাবি করেন, মামুন আব্দুল গাইয়ুমের অনুগতরা অভ্যুত্থানের মাধমে তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। নির্বাচনের প্রথম দফায় প্রায় ৯০ শতাংশ লোক তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। প্রায় ১২০০ দ্বীপ নিয়ে গঠিত মালদ্বীপের লোকসংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখ। আর মাত্র ১০ হাজার ভোট পেলেই প্রেসিডেন্ট হয়ে যেতেন নাশীদ। তখন দ্বিতীয় দফার নির্বাচনের প্রয়োজন পড়ত না। মালদ্বীপের ইতিহাসে প্রথম অবাধ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০০৮ সালে। তাতে আন্নি (নাশীদের ডাকনাম) জয় পাওয়ায় মামুন আব্দুল গাইয়ুমের দীর্ঘ ৩০ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটেছিল। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ক্ষমতা ছাড়ার পর গ্রেফতারের ভয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন ভারতীয় দূতাবাসে। তবে তিনি ক্ষণিকের জন্যও নিরাশ হননি; প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন ফের নির্বাচনে লড়ার। বর্তমান অবস্থায় তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়তেই পারেন। কেননা অলৌকিক কিছু না ঘটলে তার আবার প্রেসিডেন্ট হওয়াটাকে কেউ আটকাতে পারবে না; দ্বিতীয় দফায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই তিনি আবার প্রেসিডেন্ট বনে যাবেন। অবশ্য একটা উপায় রয়েছে— নাশীদকে ঠেকিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে প্রতিদ্বন্দ্বীদের দু’জন বসে গিয়ে একজনকে সমর্থন দিয়ে দিলে। তবে আদর্শগত কারণে সে সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। পুরোনাম এইচ.ই মোহামেদ নাশীদ। কর্মজীবনের শুরুটা ছিল সাংবাদিকতা দিয়ে। তবে এ লাইনে বেশিদিন টেকেননি; নেমে পড়েছিলেন রাজনীতিতে। ১৯৯৯ সালে রাজধানী মালে থেকে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার কিছুদিন পরই তাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল প্রেসিডেন্ট মামুন আব্দুল গাইয়ুমের সঙ্গে বিবাদে জড়ানোর অপরাধে। উপরন্তু দেয়া হয়েছিল ১৬ মাসের জেল। ইংল্যান্ডে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করা নাশীদের মালডিভিয়ান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির যাত্রা শুরু ২০০৩ সালে। তিনি তার চাঁচাছোলা কথার জন্য বিখ্যাত। যে কারণে জীবনের অনেকটা সময় তার কেটেছে জেলখানায় কিংবা স্বেচ্ছানির্বাসনে। বছর দু’য়েক আগে এক ব্রিটিশ সাংবাদিক নাশীদকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে থাকায় অদূর ভবিষ্যতে সম্পূর্ণ তলিয়ে যাবে মালদ্বীপ, আর সেজন্য আপনারা কী ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন? এতে তার উত্তরটা ছিল এরকম—হন্যে হয়ে বিদেশে জমি খুঁজছি আমরা। দামে বনিবনা হলে খুব শীঘ্রই আমরা সেখানে উঠে পড়ব। আমাদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া। সঙ্গত কারণেই উল্লেখ করা, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মালদ্বীপের গড় উচ্চতা ২.১ মিটার। উদার মুসলিম ও পরিবেশকর্মী মোহামেদ নাশীদ আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে তাকে মোকাবিলা করতে হবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠা ইসলামী মৌলবাদ ও জলবায়ু পরিবর্তনে তার দেশের ওপর পড়া বিরূপ প্রভাবকে। সেই সঙ্গে ফিরিয়ে আনতে হবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা। সহজেই দমে যাওয়ার পাত্র যে তিনি নন, সে প্রমাণ ইতিমধ্যেই তিনি দিয়েছেন। তার চরিত্রের মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দৃঢ় মনোবল। ২০১১ সালে বিশ্বখ্যাত নিউজউইক ম্যাগাজিন পৃথিবীর শীর্ষ দশ নেতার যে তালিকা প্রকাশ করেছিল, তাতে জায়গা হয়েছিল মোহাম্মদ নাশীদের। এর কিছুদিন পরেই গার্ডিয়ান পত্রিকাকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছিলেন, ‘আমার নতুন সেরা বন্ধু নাশীদ।’