নতুন পায়ে নতুন জীবন
প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:৩০
তাদের কেউ এসেছেন ভৈরব থেকে, কারো বাড়ি রাজশাহী, কারো আবার সিরাজগঞ্জে, ঢাকায়ও বাস করেন কেউ, তারা জীবনের কোন এক বাঁকে দুর্ঘনায় পা হারিছেন। তাদের সাথে মিলেছেন রানা প্লাজায় পা হরানো শ্রমিকরা। সবার জীবনের এক একটি ক্যানভাস মিলিত হয়েছে বিশাল ক্যানভাসে। অনেক কষ্টে কাটানো দিন শেষ করে নতুন জীবন শুরু করবেন। তাদের অন্যের পায়ে চলার দিনের অবসান হবে আজ। শুরু হবে নতুন করে নতুন পায়ে চলা।
গতকাল এই সম্ভাবনার দ্বার খোলা হয় নগরীর আগারগাঁও-এ অবস্থিত জাতীয় অর্থপেডিক হাসপাতাল ও পূর্নবাসন প্রতিষ্ঠান-নিটোর-এ। রানা প্লাজাসহ বিভিন্ন সময় আহত ১০৭ জনকে এই প্রতিষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে আধুনিক কৃত্রিম পা প্রদান করা হয়। থাই সরকারের সহযোগিতায় নিটোর এই দায়িত্ব পালন করেছে। আর থাই সরকারকে কারিগরি সহযোগিতা করেছে সেই দেশের রাজপরিবার নিয়ন্ত্রিত ‘প্রোসথেসিস’ ফাউন্ডেশন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন থাই রাষ্ট্রদূত মাদুরা পলা। তিনি বলেন, এই কৃত্রিম পা তাদের প্রতিদিনের কষ্টময় জীবন থেকে পরিত্রাণ দেবে। থাই সরকারের পক্ষ হয়ে তিনি এই আহতদেরই নয়, বাংলাদেশের আরো আহত মানুষকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সহযোগিতা দানের প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, এটা ছিল প্রথম পর্যায়ের কার্যক্রম।
এসময় নিটোরের পরিচালক অধ্যাপক আব্দুল আওয়াল রিজভী বিভিন্ন দুর্ঘটনায় যাদের হাত-পা কেটে ফেলতে হয়েছে, তাদের ওই হাসপাতালে গিয়ে নাম নিবন্ধন করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আজ অঙ্গ প্রতিস্থাপনের প্রথম পর্ব শেষ হলেও থাইল্যান্ডের প্রোসথেসিস ফাউন্ডেশনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে ভারতের বিখ্যাত জয়পুরের ফুটের সহযোগিতায় এ কার্যক্রম চলবে। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আব্দুল গনি মোল্লা ও জিল্লুর রহমান।
প্রধানমন্ত্রী থাইল্যান্ড সফরকালে সেদেশের প্রধানমন্ত্রীকে রানা প্লাজায় আহতদের কৃত্রিম পা দানের আহ্বান করেন। তারই ফলে ডা. ভেজারা রুজিভেত পংসট টর্ন-এর নেতৃত্বে সে দেশের চিকিত্সক ও টেকনেশিয়ান-এর ৬৪ জনের একটি টিম গত ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকায় আসে। ২২ সেপ্টেম্বর থেকে তারা প্রত্যেকের জন্য পা তৈরি করেছেন।
পা হারিয়ে যারা নিজের পায়ে দাঁড়ানো কিংবা আবার হাঁটতে পারবেন এমন আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন, তারাই আবার পা ফিরে পেলেন, নতুন পায়ে হেঁটে দেখালেন, তাদের হাঁটার শব্দে মুখরিত হলো নিটোরের মিলনায়তন।
সবার আগে হাঁটতে শুরু করলো ৫ বছরের ছোট্ট ইতিমনি। ইতি স্কুলে যাওয়ার সময় সড়ক দুর্ঘটনায় পা হারায়। বড়বোন দিলুরাকে কোলে করে পা নিতে এসেছেন ছোট বোন শামিমা। দিলুরা সিরাজগঞ্জ দৌলতপুর নারামুড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। ভুল চিকিত্সায় তাকে একটি পা হারাতে হয়। ৭০ বছরের জয়নুল বিশ্ব ইজতেমায় এসে দুইটি পা হারিয়ে ছেলের পায়ে ভর করে আসেন পা নিতে। স্বপ্ন দেখছেন আগের মতো জীবনে ফিরে যাওয়ার।
রেহানার বাড়ি পাবনা। সংসারে গুরু দায়িত্ব পালনের জন্য কাজ করতেন রানা প্লাজার ৭ম তলায়, দুর্ঘটনায় হারান দুই পা। নতুন দুই পায়ে ভর করে হেঁটে চলেন তিনি। শুধু চোখে একটু ভয় মুখে বলেন কেমন ভয় ভয় করে।
থাই টেকনেশিয়ান চুকিয়া সিয়ান সিন বলেন, শুরুতে এমন ভয় ভয় করলেও অল্প দিনের মধ্যে তারা কৃত্রিম পা ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়বেন। তাদের দলেও দশজন কৃত্রিম পাধারী রয়েছেন। এদের দুই/একজনকে দেখিয়ে বলেন, এরা তোমার দেশ পর্যন্ত এসেছেন। শুধু প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস। থেরাপিস্ট ফিমিত কামুনা আন অতি নিখুঁতভাবে ইতির পা লাগিয়ে হাঁটতে সহযোগিতার দৃশ্য দেখলে সবাই তা বিশ্বাস করবেন।