সারাদেশে পলিটেকনিক ছাত্রদের তাণ্ডব

রাজধানীসহ সারাদেশে সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সহিংস হয়ে উঠেছে। গতকাল রবিবার তাদের কর্মসূচি চলার সময় কুমিল্লায় পুলিশ ফাঁড়ি, ইউএনও’র গাড়ি, তহসিল অফিসে আগুন দেয়া হয়। সেখানে ২০ পুলিশসহ শতাধিক আহত হন। পটুয়াখালীসহ দেশের অন্যান্য স্থানে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের সময় আরো দুইশ’ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পুলিশের হাতে আটকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১০ জন। প্রসঙ্গত, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের সুপারভাইজার হিসাবে সংজ্ঞায়িত না করে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে সংজ্ঞায়িত করাসহ তিনটি দাবিতে গত কয়েকদিন ধরেই দেশব্যাপী আন্দোলন চালিয়ে আসছে পলিটেকনিকের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। তাদের অন্য দাবি দু’টি হলো- ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের পদন্নোতির কোটা ৩৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা এবং বেতন বৈষম্য দূর করা। রাজধানীতে গতকাল নির্বিচারে যানবাহন ভাংচুর করে পলিটেকনিক ছাত্ররা। বিক্ষোভ-ভাংচুরের মধ্যে পড়ে আতঙ্কিত হয়ে ছুটোছুটি করতে দেখা যায় পথচারীদের। পরে পুলিশ টিয়ারশেল ছুঁড়ে, লাঠিপেটা করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দিলে রাজধানীর দু’টি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে, রাজ-ধানীর মগবাজার থেকে মহাখালীমুখী শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সড়ক সকাল ১০টা থেকে দুই ঘণ্টা এবং ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়কের পূর্ব অংশে অবরোধের কারণে মিরপুর রোডে বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ থাকে। এ সময় সড়ক দু’টিতে গণহারে যানবাহনও ভাংচুর করে শিক্ষার্থীরা। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইলিয়াস আলী জানান, পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসাবে পলিটেকনিকের শিক্ষার্থীরা গতকাল রবিবার সকালে তাদের ইনস্টিটিউটের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। এক পর্যায়ে তারা সাতরাস্তার মোড়ে সড়কের ওপর অবস্থান নিলে সকাল ১০টার দিকে মগবাজার-মহাখালীর যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে বাঁশের লাঠি হাতে সাতরাস্তায় বিক্ষোভ করতে দেখা যায় ছাত্রদের। এক পর্যায়ে সেখানে শিক্ষার্থীরা যানবাহন ভাংচুর শুরু করলে পুলিশ তাদের টিয়ারসেল ও লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। বেলা ১২টার দিকে মগবাজার-মহাখালী সড়কে যান চলাচল শুরু হয় বলে জানান ইলিয়াস আলী। শিক্ষার্থীরা যাতে আর মূল সড়কে জড়ো হতে না পারে সেজন্য পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন গলির মুখে বিপুল পরিমাণ র্যাব ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এদিকে মোহাম্মদপুর এলাকার বিভিন্ন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা ধানমন্ডি ২৭ নম্বর মোড়ে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করলে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মিরপুর রোডেও যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। এক পর্যায়ে ছাত্ররা যানবাহন ভাংচুর শুরু করে। পরে পুলিশ ধাওয়া দিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পরিস্থিতি শান্ত হয়ে এলে বেলা দেড়টার দিকে মিরপুর রোডে আবার যান চলাচল শুরু হয়। রাজধানীর দুটি প্রধান সড়ক দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় আশপাশের এলাকাগুলোতে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। রাস্তায় বের হওয়া মানুষদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। আমাদের কুমিল্লা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, কুমিল্লায় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইট-পাটকেল নিক্ষেপ, গুলি ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, সদর-এ-সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার, ওসি ও ২০ পুলিশসহ শতাধিক আহত হয়েছেন। এসময় কোটবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ি, স্থানীয় তহসিল অফিস ও সদর দক্ষিণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) পাজেরো গাড়িসহ বেশ কয়েকটি যানবাহন ভাংচুর করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। পুলিশের দুইটি শটগান ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। পরে বিকালে তা উদ্ধার করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশের সঙ্গে র্যাব ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়। সংঘর্ষের সময় পুলিশ কয়েকশ’ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। কোটবাড়ি এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। গতকাল দুপুর ১২টা থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত কুমিল্লা কোটবাড়িস্থ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ক্যাম্পাস ও তত্সংলগ্ন কুমিল্লা-কোটবাড়ি সড়কে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সংঘর্ষের সময় পলিটেকনিক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে চার থেকে পাঁচ হাজার বহিরাগত যোগ দেয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সদর দক্ষিণ উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাবলু জানান, ‘শিক্ষার্থীদের সঙ্গে লালমাই পাহাড়সহ বিভিন্ন স্থান থেকে জামায়াত-শিবির নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানের শিবির কর্মীরা এ তাণ্ডবে যোগ দেয়।’ রাতে জানা গেছে, এই ঘটনার সূত্রে পুলিশ ৩৯ জনকে আটক করেছে। পটুয়াখালী প্রতিনিধি জানান, পটুয়াখালীতে পলিটেকনিক ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের সকাল নয়টা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। ছাত্ররা সড়ক অবরোধ করে গাড়ি ভাংচুর শুরু করলে পুলিশ বাধা দেয়। এসময় পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ ও বেশ কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। অর্ধশত যানবাহনে ভাংচুর ও আগুন দেয়া হয়। পরিস্থিতি মোকাবেলায় পুলিশ তিন শতাধিক রাউন্ড রাবার বুলেট ও টিয়ার সেল নিক্ষেপ করে। এ ঘটনায় আহতের সংখ্যা শতাধিক। এর মধ্যে সাংবাদিক, পুলিশ ও শিক্ষার্থী রয়েছেন। গতকাল রবিবারের নির্ধারিত পরীক্ষা বর্জন করে শিক্ষার্থীরা। পুলিশ ২৫ জন ছাত্রকে আটক করেছে । ক্যাম্পাস ও আশেপাশের এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সিরাজগঞ্জ পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের ছাত্র ও পুলিশের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে পাঁচ পুলিশসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শতাধিক রাউন্ড টিয়ার সেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। ঘটনাস্থল থেকে ৪৪ জনকে আটক করা হয়। কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি ও করিমগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, দুই দফা দাবিতে কিশোরগঞ্জ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা বর্জন করে সড়ক অবরোধ করে। ওই সময় পুলিশের সাথে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, লাঠিচার্জ, রাবার বুলেট ও টিয়ার সেল নিক্ষেপে পুলিশ-ছাত্রসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন। সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, দুই দফা দাবিতে গাছের গুঁড়ি, বিদ্যুতের খুঁটি ও ইট ফেলে সাতক্ষীরায় সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছে সাতক্ষীরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা। সাতক্ষীরা-যশোর সড়কের পলিটেকনিক মোড়ে রবিবার সকালে এ ঘটনা ঘটে । এতে পুলিশের একজন এসআইসহ ১০ জন ছাত্র আহত হন। রাজশাহী অফিস জানায়, রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে ১০ জন আহত হয়েছেন। গতকাল রবিবার সকালে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার হল ছেড়ে সংলগ্ন রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কে বিক্ষোভ শুরু করলে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে একই দাবিতে রবিবার সকালে রাজশাহী মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় বিক্ষোভ মিছিল বের করে। এসময় একদল মহিলা পুলিশ তাদের উপর লাঠিচার্জ করলে অন্তত পাঁচজন শিক্ষার্থী আহত হন। রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট অধ্যক্ষ আবদুল জলিল বলেন, কারিগরী শিক্ষা বোর্ড ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু পরীক্ষা স্থগিত করেছে। বর্তমানে ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি শান্ত। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিশে গিয়ে ছাত্রশিবির যেনো নাশকতা সৃষ্টি করতে না পারে সে জন্য সকলকে সতর্ক করা হয়েছে। যশোর অফিস জানায়, যশোরে পলিটেকনিক শিক্ষার্থী ও পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় পাঁচটি গাড়ি ভাংচুর ও একজন ফটো সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষ চলাকালে বহিরাগতরা যশোর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষকে লাঞ্ছিত ও তার কক্ষ ভাংচুর করে। রংপুর প্রতিনিধি জানান, রংপুরে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রবিবার পুলিশ ও ব্যবসায়ীদের ত্রিমুখী সংঘর্ষের ঘটনায় ৩০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে শিক্ষার্থী মোকায়েতসহ তিনজনকে আশংকাজনক অবস্থায় রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ সময় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা দোকানপাট ও যানবাহনে ব্যাপক ভাংচুর চালায়। পুলিশ ঘটনাস্থলসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১৭ জন শিক্ষার্থীকে আটক করে। বরিশাল অফিস জানায়, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা গতকাল রবিবার ৩টি যাত্রীবাহি বাসে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর করেছে। এতে বাসের স্টাফসহ ১৫ জন যাত্রী আহত হন। গুরুতর আহত পাঁচ জনকে শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চট্টগ্রাম অফিস জানায়, দুই দফা দাবিতে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করে কয়েক হাজার পলিটেকনিক শিক্ষার্থী রবিবার সকাল থেকে নগরীর দুই নম্বর গেইট এলাকায় প্রায় তিন ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে রাখে। এ সময় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা কয়েকটি যানবাহন ভাংচুর, পুলিশের উপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। এতে আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকায় চরম আতংক ছড়িয়ে পড়ে। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। পরে বেলা সাড়ে ১২টায় সড়ক থেকে শিক্ষার্থীদের সরিয়ে দিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করে পুলিশ। এছাড়া গোপালগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, ফরিদপুর, ঠাকুরগাঁও, মুন্সীগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, শেরপুর, কচুয়া, নারায়ণগঞ্জ থেকে আমাদের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের এই কর্মসূচি পালনের খবর দিয়েছেন।