বিশ্ব শিশুদিবস :শৈশব-কৈশোরের স্বপ্ন

শিশুরাই জাতির সেরা সম্পদ এবং ভবিষ্যত্ উত্তরাধিকারী। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৬/৭ কোটি শিশু-কিশোর। এরা কৃষি পরিবারের সন্তান এবং গ্রামবাংলার বাসিন্দা। শৈশব-কৈশোর শিশুর শ্রেষ্ঠ সময়। এ সময় শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ হবার কথা। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশের শিশুরা নানা কারণে খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান, নিরাপত্তা ও কাঙ্ক্ষিত অধিকার থেকে বঞ্চিত। জাতিসংঘ প্রণীত শিশু অধিকার সনদে শিশুর বেঁচে থাকার এসব মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের কথা বার বার উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাত্ রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজ শিশুর এসব অধিকার নিশ্চিত করতে বাধ্য। আমাদের শিশুরা জন্মেই দেখে পিতার সংসারে অভাব-অনটন। যে বয়সে তার স্কুলে যাবার কথা, পড়াশোনার অবসরে মাঠে ঘুড়ি ওড়ানোর কথা, খেলার সময় খেলার কথা, সে সময়ে তাকে পিতার সংসারে নিয়োজিত হতে হয়। তার কৈশোরের স্বপ্নগুলো উবে যায়। বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে ভুলে যায় তার অধিকারের কথা, তার পাওনার কথা। এরা মাঠে কাজ করে, পিতার সহযোগী হিসাবে সংসারের হাল ধরে। গ্রামবাংলার প্রতিটি পরিবারের শিশুরাই শিক্ষার আলো থেকে প্রায় বঞ্চিত। বিনা বেতনে শিক্ষা উপকরণ প্রাপ্তির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বর্ণপরিচয়ের পর তাদের লেখাপড়া হয় না। অসহায় পরিবারের শিশুর খাদ্য, বাসস্থান ও স্বাস্থ্য সেবা আরো প্রকট। পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাবে এরা রোগ-ব্যাধিতে ভোগে, অকালে ঝরে পড়ে অনেক শিশু। যারা বেঁচে থাকে তাদের শারীরিক বিকাশ ঘটে না। মেধা ও প্রতিভা বিকাশের প্রশ্নই ওঠে না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের শিশুর উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে ঘোষণা করেন জাতীয় শিশু আইন। এ আইনে প্রতিটি শিশুর বাঁচার অধিকার সংরক্ষণ এবং তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিশুর উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। এরপর ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে জাতীয় শিশু আইনের আলোকে প্রণয়ন করা হয়েছে জাতীয় শিশু নীতি। ইতিমধ্যে জাতিসংঘ প্রণয়ন করেছে শিশু অধিকার সনদ। আইন, নীতি বা অধিকার সনদের একমাত্র বিষয় শিশু এবং শিশুর উন্নয়নের ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন। কিন্তু আজো শত্রুর আক্রমণে প্রথম প্রাণ হারাতে হয় শিশুর। শত্রু দেশ বিজয়ে বিভোর হয়ে ভুলে যায় সনদের কথা। আবার দুর্ভিক্ষ ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে শিশুরাই অসহায়ের মতো প্রথমে প্রাণত্যাগ করে। এ ক্ষেত্রে গোটা বিশ্বের একই চিত্র। ভূমিকম্প ও সুনামিতেও শিশুর মৃত্যুবরণ চোখে পড়ার মতো। আমাদের দেশের শিশুর সবিধাভোগী ও সুবিধাবঞ্চিত— এ দু’ভাবে বিভক্ত। সুবিধাভোগীরা নগরজীবনের অধিকারী এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দা। শহুরে শিশুরা পার্কে যায়, চিড়িয়াখানা দেখে, ভালো স্কুলে পড়াশোনা করে এবং আধুনিক প্রযুক্তির সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। আর সুবিধা বঞ্চিত শিশুরা গ্রামাঞ্চলের কৃষক পরিবারে থেকে এসব সুযোগ থেকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত। শুধু তাই নয়, তারা শিশু অধিকার, শিশুনীতি বা শিশু আইনের কোন খবর রাখে না। তারা চেনে না টম-জেরীকে, তারা দেখে না মীনা কার্টুন। শিশু পাঠাগার তাদের কাছে স্বপ্ন এবং শিশু একাডেমীর সকল শিশু প্রতিযোগিতা তাদের অগোচরে থেকে যায়। শিশু সদনে এদর কারোই ঠাঁই মেলে না। শিশু পত্রিকা, শিশু চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আদৌ কোন খবর রাখে না আমাদের শিশুসমাজের একটি বড়ো অংশ। শিশুদের জন্য কত মেলা, কত পত্রিকা প্রকাশ করা হয় রাজধানীসহ জেলা শহরগুলোয়। এগুলোর কোন সুবিধা পায় না আমাদের গ্রামবাংলার শিশুরা। শিশুশ্রম নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও গ্রামে ও শহরে শিশু শ্রমিকের অভাব নেই। ফলে কারখানায় নিয়োজিত শ্রমিকের একটি বড়ো অংশ আমাদের শিশু-কিশোর সন্তানেরা। হোটেলে বয়গিরি, ঘাটে স্টেশনে কুলিগিরি, ইট ভাঙা, ভ্যান টানা, গাছের গুঁড়ি ওঠানো, রিকশা চালানো, পত্রিকা বিক্রি, ঘানি ঘোরানোসহ ছোটখাটো সকল কাজেই শিশুদের নিয়োজিত থাকতে দেখা যায়। শহরে এবং গ্রামের বিত্তশালী পরিবারে কাজের ছেলে-মেয়ে রাখা হয় অহরহ। এদের জীবনযাত্রার কাহিনী আমাদের কারো অজানা নয়। তাদের শৈশব-কৈশোর শুরু হয় আবদ্ধ পরিবেশ ও কঠিন পরিশ্রমকে ঘিরে। পৃথিবীর আলো-বাতাস এবং আয়তন তাদের কাছে অল্প মনে হয়। তারা ভুলে যায় শৈশব-কৈশোরের ঘুড়ি ওড়ানোর কথা। ভুলে যায় নদী ও পুকুরে সাঁতার কাটার কথা। রাস্তায় এরা ফুলের মালা বিক্রি করে ঠিকই কিন্তু গলায় পরে না, সুঘ্রাণে আমোদিত হয় না কখনো। শিশু-কিশোরদের বাস্তব জীবনের এমন চিত্র প্রতিদিন আমাদের চোখে পড়ে। আবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেমে এলে এই শিশুরাই প্রথম আক্রান্ত হয়। যুদ্ধ, মহামারি, প্লাবন, ঝড়, ও সামাজিক বিশৃঙ্খলায় শিশুরাই আগে প্রাণ দেয়। প্রথম মহাযুদ্ধ, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, ভিয়েতনামের যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে লাখ লাখ শিশুরা অকাতরে প্রাণ হারিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধেও শিশুদের রেহাই নেই। অনেক শিশু মারা গেছে, অনেক শিশু আহত হয়েছে। কারণ ওরা বড়োদের মতা শক্তিশালী নয়। ভালোমন্দ বিচারের মানসিক বিকাশ ঘটেনি ওদের। তাই পরিবেশের শিকার হতে হয় যখন তখন। বলা হয় শিশুরা অবোধ ও সরল প্রাণ। কিন্তু তাদেরও বিনা অপরাধে প্রাণ হারাতে হয়। সন্ত্রাসের কবলে পড়ে অনেকেই হারিয়ে গেছে আমাদের চোখের সামনে। শুধু কি তাই? এখনো শত শত শিশু-কিশোর পাচার হচ্ছে বিদেশে। উটের দৌড়ে রকি হয়েছে অনেক শিশু। শিশুদের ভাগ্য কি নির্মম। মায়ের আঁঁচলের ছায়ায় যার বড়ো হওয়ার কথা, সেই অবোধ সন্তান কিনা চিরতরের জন্য হারিয়ে যায় কোন অজানায়। তাই বলবো আমাদের শিশুরা অধিকারহারা চিরবঞ্চিত। এদের শৈশব ও কৈশোরের স্বপ্নগুলো কোনদিন সফল হয় না। সকল প্রকার নিরাপত্তাহীন জীবন-যাপনে এরা বড়ো হয়। দরিদ্র আর সহায়-সম্বলহীন পরিবেশ থেকে এরা মুক্তি পায়নি। আনন্দ ও হৈ-হুল্লোড় এদের স্বপ্নেই থেকে যায় মায়াভরা চোখ দু’টোর সেই স্বপ্ন কখনোই প্রস্ফুটিত হয় না। অথচ শৈশব ও কৈশোর হলো জীবনের প্রথম স্বপ্ন সফল হওয়ার উপযুক্ত সময়। কিন্তু আমরা ইচ্ছে করলেই আমাদের উত্তরাধিকারী শিশু-কিশোর সন্তানদের সকল দাবি পূরণ করতে পারি। নিত্যসঙ্গী দারিদ্র দূর করতে পারি সাহায্য-সহযোগিতার হাতে বাড়িয়ে। মায়া-মমতা, আদর-স্নেহ ও ভালোবাসার পাশাপাশি তারে ছোট্ট চাহিদা পূরণ করতে পারি একটু কম খেয়ে একটু খরচ বাঁচিয়ে। শৈশব ও কৈশোরের স্বপ্নগুলো যেন গোলাপের মতো প্রস্ফুটিত হতে পারে।