আজও দখলমুক্ত হয়নি সুচিত্রা সেনের পৈত্রিক ভিটা
রুমী খোন্দকার, পাবনা প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০১ অক্টোবর ২০১৩, ১৯:২২
পাবনা শহরের গোপালপুর হেমসাগর লেনে অবস্থিত বাংলা সিনেমার জীবন্ত কিংবদন্তী সুচিত্রা সেনের বাড়ীটিতে দুই যুগেরও বেশী সময় ধরে দখলে রেখে জামায়াত একটি স্কুলের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। জেলার সামাজিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের দাবি, জেলা প্রশাসন কতৃক লীজ বাতিলের পরেও মামলা সংক্রান্ত জটিলতায় আজো দখলমুক্ত হয়নি সুচিত্রার পৈতৃক ভিটা। সেখানে কার্যক্রম চালাচ্ছে জামায়াতের নেতৃবৃন্দ দ্বারা পরিচালিত ইমাম গাযযালী ইনস্টিটিউট। পাবনার মেয়ে হিসাবে পাবনাবাসীর অন্যতম দাবি সুচিত্রার বাড়ীটি দখলমুক্ত করে সুচিত্রা সংগ্রহশালা করার।
জানা যায়, সুচিত্র সেনের বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত ছিলেন পাবনা পৌরসভার সেনেটা ইন্সপেক্টর। চাকরির সুবাদে তিনি স্ত্রী, এক ছেলে ও তিন মেয়ে নিয়ে হেমসাগর লেনে একটি একতলা বাড়ীতে বসবাস করতেন। এই করুণাময় দাশগুপ্তের মেয়ে সুচিত্রা সেন ওরফে রমা ১৯৪৬-৪৭ সালে পাবনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্লাস নাইনে পড়ার সময় কোলকাতায় চলে যান। ১৯৫১ সালের মাঝামাঝি সময়ে সুচিত্রা সেনের বাবা সপরিবারে কলকাতায় চলে যান। সে সময় জেলা প্রশাসন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসনের জন্য সুচিত্রা সেনের পৈত্রিক ভিটা গোপালপুর মৌজার এসএ ৯৯ খতিয়ানভুক্ত ৫৮৭ এসএ দাগের ০.২১২৫ একর বাড়ীটি রিক্যুইজিশন করেন। এরপর থেকে বাড়ীটিতে সরকারি বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বসবাস করতে থাকেন এবং সর্বশেষ ছিলেন একজন প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট। ১৯৮৭ সালে এরশাদ সরকারের সময়ে স্থানীয় কতিপয় জামায়াত নেতা বাড়ীটি অর্পিত সম্পত্তিতে পরিণত করে একসনা লিজ নিয়ে ‘ইমাম গায্যালী ইন্সটিটিউট’ নামের একটি কিন্ডার গার্টেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে।
গত সরকারের আমল থেকেই সূচিত্রা সেনের পৈত্রিক ভিটা জামায়াতের কবল থেকে উদ্ধার করে সেখানে সূচিত্রা আর্কাইভ বা সংগ্রহশালা করার জন্য স্থানীয় এবং জাতীয় পর্যায়ের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ জোরালো দাবি জানান। আন্দোলন সংগ্রামের এক পর্যায়ে ‘সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ’ নামের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সভাপতি এম সাইদুল হক চুন্নুসহ প্রগতিশীল সাংস্কৃতিমনা ব্যক্তিরা গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করে জেলা প্রশাসনের কাছে বাড়ীটি দখলমুক্ত করার জন্য লিখিত আবেদন জানান।
পাবনাবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের ২২ জুন পাবনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ইমাম গায্যালী ইন্সটিটিউট কর্তৃপক্ষ’র একসনা লীজ বাতিল করেন এবং ৮ জুলাই ২০০৯ এর মধ্যে অর্পিত সম্পত্তির দখল ছেড়ে দেয়ার জন্য নোটিস প্রদান করেন। নোটিস পাওয়ার পর ইমাম গায্যালী ইন্সটিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা হাইকোর্টে লীজ বাতিলের বিরুদ্ধে আবেদন জানিয়ে রীট করেন।
সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের অন্যতম নেতা জাকির হোসেন জানান, ২০১১ সালে হাইকোর্ট সেই রীট খারিজ করে দিলে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্টের এপিলেট ডিভিশনে আপিল করেন। মামলাটি এখনো বিচারাধীন রয়েছে।
দখলের বিষয়ে আলাপকালে ট্রাস্টি বোর্ডের সেক্রেটারী ও জেলা জামায়াতের প্রচার সেক্রেটারী আবিদ হাসান জানান, “আমরাতো কোনোভাবেই বাড়ীটি দখল করিনি। গত প্রায় ২৫ বছর যাবত্ সরকারের নিয়ম মেনে ট্যাক্স দিয়ে সেখানে স্কুলের কার্যক্রম চালাচ্ছি”। তিনি আরো বলেন, ২০০০ সালের ১৭ আগস্ট সুচিত্র সেনের পরিবারের সদস্যরা পাবনাতে এসে স্কুলটি পরিদর্শন করে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
তার কথার সাথে দ্বিমত পোষণ করে পাবনা জেলা পরিষদের প্রশাসক এবং সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি এম. সাইদুল হক চুন্নু জানান, আমরা কোনো স্কুল উচ্ছেদ হোক তা চাই না। এই স্কুলের অল্প দূরেই জামায়াতের “ইমাম গায্যালী স্কুল এন্ড কলেজ” নামের আরো একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। খুব সহজেই জামায়াত এই স্কুলের কার্যক্রম ঐ স্কুলের সাথে সম্পৃক্ত করতে পারে। তা না করে শুধু ভবনটি দখলে রাখার জন্য সেখানে এই স্কুলটি চালানো হচ্ছে।
বাড়ীটির লীজ এবং বর্তমান সর্বশেষ অবস্থার কথা জানিয়ে পাবনার জেলা প্রশাসক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ১৯৮৭ সাল থেকে বাড়ীটি একসনা লীজে ছিলো। ২০০৯ সালে সেই লীজ বাতিল করা হয়। আমরা লীজ বাতিলের পরে বাড়ীটি জেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তরের জন্য সময়ও বেধে দিয়েছিলাম। বর্তমানে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন থাকায় তা নিস্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কিছু করার এখতিয়ার জেলা প্রশাসনের নেই।