চাটমোহরের ঐতিহ্য ও পুরাকীর্তি
হেলালুর রহমান জুয়েল, চাটমোহর সংবাদদাতা
প্রকাশ : ০১ অক্টোবর ২০১৩, ১৯:২৩
পাবনার চাটমোহরের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং পুরাকীর্তিসমূহ এখনও ভ্রমণ পিয়াসী মানুষ ও পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এ উপজেলার নানা পুরাকীর্তি ও ঐতিহ্য দেখতে প্রতিদিন দূর দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন মানুষ। চাটমোহরে মোঘল আমলের ঐতিহ্যবাহী চাটমোহর শাহী মসজিদ, সমাজ শাহী মসজিদ, হান্ডিয়াল জগন্নাথ দেবের মন্দির, শেঠের বাংলা, সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরীর পৈতৃক বাড়ির ধ্বংসাবশেষ, দেড়শ’ বছরের পুরাতন রাজা চন্দ নাথ ও বাবু শম্ভুনাথ হাইস্কুল, বোঁথরের চড়ক বাড়ি, পার্শ্বডাঙ্গা জমিদার বাড়ি সকলের নজর কাড়ে। কিছু সময় কাটানোর মত প্রতিটি স্থান। একই সাথে বৃহত্ চলনবিলের অংশ দেখে যে কেউ বিমোহিত হবে।
চাটমোহর শাহী মসজিদ \ ১৫৮১ সালে সম্রাট আকবরের শাসনামলে মাসুম খাঁ কাবুলী এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। পাবনা জেলা শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার উত্তরে চাটমোহর পৌর সভার কাজীপাড়া মহল্লায় মসজিদটি অবস্থিত। চুন, সুরকি ও বাংলা ইটের দ্বারা নির্মিত হালকা লাল রং’র মসজিদটি প্রথম দর্শনেই যে কাউকে আকর্ষণ করবে। আকর্ষণ করে এর ভেতরের নয়নাভিরাম দৃশ্যও। মসজিদের ভেতরের দিকে দৈর্ঘ্য ৩৪ হাত প্রস্থ ১২ হাত আর উচ্চতা ৩০ হাত। মসজিদের ৩টি মনোরম গম্বুজ রয়েছে। দেয়ালের গায়ে প্রাচীন ভাস্কর্যের নিদর্শন আজো দৃষ্টিগোচর হয়। ভেতরের মেহরাবটি অপূর্ব কারুকার্যে খচিত। মসজিদ সংলগ্ন উত্তর পাশে রয়েছে কয়েকটি কবর। ধারণা করা হয় এখানে বেশ ক’জন মুমিন ব্যক্তি শায়িত আছেন। মসজিদের সামনে রয়েছে একটি ইন্দারা। ইতিহাস থেকে জানা যায়, মাসুম খাঁ কাবুলী সম্রাট আকবরের অধীনে সেনা অধিনায়ক ছিলেন। তাঁর পূর্ব পুরুষ সুলতান হুসেন শাহের শাসনামলে কাবুল থেকে এদেশে এসে একটি জায়গীর লাভ করেন। এখানেই মাসুম খাঁ কাবুলীর জন্ম। তার শাসনামলেই মসজিদটি নির্মিত হয়। মসজিদটি বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধীনে রয়েছে। মসজিদটি দেখতে প্রতিদিন অনেকেই আসছেন।
প্রমথ চৌধুরীর বসতবাড়ি \ বাংলা সাহিত্যের কৃতী পুরুষ প্রমথ চৌধুরীর বসতবাড়ি ছিল চাটমোহর উপজেলার হরিপুর গ্রামে। সংরক্ষণের অভাবে এটি ধ্বংস হয়ে গেছে। নোংরা একটি পুকুর, তার শান বাঁধানো ঘাট আর শিব মন্দিরের ভগ্নাংশসহ জঙ্গলাকীর্ণ বাড়ির ভিটা এখন শুধুই স্মৃতি। ইতিহাস থেকে জানা যায়, এলাকার এককালের প্রতাপশালী জমিদার মাধবানন্দ চৌধুরীর বংশধর হচ্ছেন প্রমথ চৌধুরী। তার পিতার নাম দুর্গাদাস চৌধুরী। দুর্গাদাস চৌধুরীর নামে হরিপুর দুর্গাদাস স্কুল এন্ড কলেজ। তিনি ছিলেন বৃটিশ সরকারের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। ১৯২৫ সালে তিনি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে শ্বেত পাথরের প্রতিকৃতি রয়েছে তার। তার ৭ ছেলে ২ মেয়ে। এই পরিবারের সবাই এখন ভারতবাসী। প্রমথ চৌধুরী বীরবল নামে সাহিত্যচর্চা করেন। চাটমোহরের চৌধুরী ভিটায় এখন অন্যলোকের বসবাস। সবকিছুই হারিয়ে এখন শুধুই স্মৃতি।
জগন্নাথ দেব’র মন্দির \ উপজেলার হান্ডিয়ালে প্রায় সাড়ে ৪শ’বছরের প্রাচীন স্থাপত্য জগন্নাথ দেব’র মন্দির। কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এটি। ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসনামলে এ মন্দিরকে কেন্দ করে গড়ে উঠেছিল অধিক হিন্দু ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত এ জনপদ। ক্রমান্বয়ে এখানকার হিন্দুর সংখ্যা কমে গেছে। বৃটিশ আমলে হান্ডিয়াল থানা ছিল। সম্রাট আকবরের শাসনামলে হান্ডিয়ালে একজন সুবেদার ও একজন কাজী ছিল। সে আমলের অনেক স্থাপত্যের মধ্যে বিশালাকৃতির জগন্নাথ দেবের মন্দিরটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ১৫৯০ সালে জনৈক ভবানী প্রসাদ নিজ খরচে মন্দিরটি মেরামত করেন বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়। অতি ক্ষুদ্রাকৃতির জাফরি ইট দ্বারা এটি তৈরি। এর উচ্চতা ৪০ ফুট। দৈর্ঘ্য প্রস্থ উভয় দিক ১০ ফুট। এক সময় এই মন্দিরের ১৭৫ বিঘা জমি ছিল। মন্দিরের পাশে রয়েছে স্নানঘর ও রথচালা। একজন সেবায়েত রয়েছেন এখানে। প্রতি বছর সকল পূজা-অর্চনা হয় এই ঐতিহাসিক মন্দিরে।
সমাজ শাহী মসজিদ \ উপজেলার নিমাইচড়া ইউনিয়নের সমাজ গ্রামে অবস্থিত মোগল আমলের অন্যতম পুরাকীর্তি সমাজ শাহী মসজিদ। সম্রাট শেরশাহের সময় হযরত শাহসুফী পীর আশরাফ জিন্দানী (র.) ৯শ হিজরীতে মসজিদটি নির্মাণ করেন। কারুকার্য খচিত মসজিদটি দেখার জন্য দূর দূরান্ত থেকে অনেকেই আসছেন প্রতিদিন।
২শ’ বছরের পুরাতন বোঁথর মসজিদ \ উপজেলার বিলচলন ইউনিয়নের বোঁথর গ্রামে রয়েছে ২শ বছরের পুরানো একটি মসজিদ। ২ শতাংশ জমির উপর নির্মিত মসজিদটি খুবই ছোট। এক সাথে এখানে ৫/৬ জন মুসল্লী নামাজ আদায় করতে পারেন। এলাকাবাসীর ধারণা তত্সময়ে এ অঞ্চলে মুসলমান তেমন ছিল না, সে কারণেই অতি ছোট আকৃতির মসজিদটি নির্মিত হয়। চাটমোহর উপজেলার তত্কালীন নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মিজানুর রহমান ২০০৭ সালে মসজিদটি উদ্ধার ও পুনঃনির্মাণ করেন। নামকরণ করেন শেহরোজ জামে মসজিদ। মসজিদটি জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। জনৈক আবু বকর দীর্ঘদিন মসজিদটি দখলে রেখেছিল।
চাটমোহরের অতীত ঐতিহ্য ও পুরাকীর্তির মধ্যে দেড়শ বছরের হাইস্কুল, বোঁথর চড়ক বাড়ি, হান্ডিয়াল শেঠের বাংলো, পার্শ্বডাঙ্গা জমিদার বাড়ি, কাজীপাড়া মসজিদ, মথুরাপুর খৃস্টান মিশন সব সময়ই পর্যটকদের নজর কাড়ে। প্রতিদিন অনেকে ছুটে আসে এ সকল দর্শন করার জন্য।