পাবনার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে ঈশ্বরদীর চাষীদের অবদান রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত

কৃষিক্ষেত্রে ঈশ্বরদীর চাষীদের অভাবনীয় সাফল্য পাবনা জেলার অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে বিশেষভাবে ভূমিকা রাখছে। চাষীদের এই অবদানের জন্য এ যাবত্ ঈশ্বরদীর ৫ জন জাতীয় কৃষক হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। জানা যায়, বাংলাদেশে এ যাবত্ যে ১৪ জনকে জাতীয় কৃষক হিসেবে স্বৃীকৃতি প্রদান করা হয়েছে তার মধ্যে ঈশ্বরদীরই রয়েছেন ৫ জন। পেঁপে চাষ করে স্বীকৃতি পেয়েছেন শাজাহান আলী বাদশা-যাকে ‘পেঁপে বাদশা’র উপাধি দেয়া হয়েছে। লিচু চাষের জন্য জাতীয় স্বীকৃতি অর্জন করেছেন আব্দুল জলিল কিতাব মন্ডল যাকে ‘লিচু কিতাব’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। গাজর উত্পাদন করে জাতীয় কৃষকের স্বীকৃতি পেয়েছেন জাহিদুল ইসলাম- যিনি ‘গাজর জাহিদ’ উপাধি পেয়েছেন। বাউকূল চাষের জন্য সিদ্দিকুর রহমান ময়েজ জাতীয় কৃষকের মর্যাদা পেয়েছেন-যাকে ‘কুল ময়েজ’ উপাধি দেয়া হয়েছে। কপি চাষ করায় আব্দুল বারীকে জাতীয়ভাবে পদক প্রদান এবং ‘কপি বারী’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। এছাড়া সফল নারী উদ্যোক্তা গ্রাম্য বধূ নুরুন্নাহারকে বঙ্গবন্ধু পদক প্রদান করা হয়েছে। তিনি এখন ব্র্যাকের বাংলাদেশের এনসিডিপি গ্রাম উন্নয়ন কমিটির সভানেত্রী। দেশের বিভিন্ন এলাকা হতে নারীরা এসে নুরুন্নাহারের নিকট এখন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন। কিতাব মন্ডলের আগে লিচু চাষের জন্য কাঠালবাড়িয়া গ্রামের বক্কার মাষ্টার লিচু চাষের জন্য রাষ্ট্রপতি পদক অর্জন করেন। মাছ চাষ করে মুলাডুলি ইউনিয়নের হাবিবুর রহমান হাবিব বঙ্গবন্ধু পদক পেয়েছেন। যিনি এখন এলাকায় মাছ হাবিব নামে পরিচিত। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদক ছাড়াও কৃষিক্ষেত্রে আরও অনেকেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্মাননা ও পুরস্কার অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। যার তালিকা অনেক দীর্ঘ। ঈশ্বরদীর চাষের জমি একদিকে যেমন উঁচু অপরদিকে অধিকতর উর্বরা শক্তিসম্পন্ন। যে কারণে সব ধরনের চাষাবাদেই ভাল ফলন পাওয়া যায়। বিশেষ করে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে বিপুল পরিমাণ ফলন হওয়ায় ঈশ্বরদী ‘ফল ও সবজির ভাণ্ডার’ বলে দেশের মধ্যে পরিচিতি লাভ করেছে। এখানে ধান-পাট-রবিশস্য ছাড়াও গাজর, কপি, শিম, ঢেঁড়স, পেঁয়াজ, মূলা, বেগুন, পেঁপে, টমেটো প্রভৃতি ফসল ও সবজি বিপুল পরিমাণে উত্পাদিত হয়। পাশাপাশি লিচু, বাউকূল ও পেয়ারা চাষেও কৃষকরা ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। এক সময়ে রাজশাহীর লিচু প্রসিদ্ধ হলেও এখন ঈশ্বরদী বোম্বাই লিচুর সেই স্থান দখল করেছে। দেশের অন্যান্য স্থানে ঈশ্বরদীর লিচু রাজশাহীর লিচু বলে বিক্রি হয়। মৌসুমে ২৬০০-২৭০০ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হচ্ছে। প্রতি বছর ৩৫০-৪০০ কোটি টাকার লিচু বিক্রি হয়। লিচুর পরেই মুলাডুলি ইউনিয়নে শিম ও ঢেঁড়স আবাদ পাবনা জেলার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এলাকার ২৭টি গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার জনগোষ্ঠীর কম-বেশি প্রায় সবাই শিম আবাদ, শিমের ব্যবসা, শিমের জমিতে কাজের জন্য জড়িত। বর্তমানে এখানে প্রায় ১৪০০ হেক্টর জমিতে শিম চাষ হচ্ছে। মাত্র ৩ মাসের সবজি শিম আবাদে অধিক মুনাফা অর্জন এলাকার মানুষের ভাগ্য ফিরিয়েছে। শিমকে কেন্দ করেই মুলাডুলিতে গড়ে উঠেছে সবজির আড়ত। মৌসুমে প্রতিদিন ৫০-৬০ ট্রাক শিম এখান হতে দেশের বিভিন্ন স্থানে চালান হয়ে যায়। শিম কেনাবেচায় প্রতিদিন ২-৩ কোটি টাকা লেনদেন হয়। শিম শেষ হলে ওই জমিতেই শুরু হয় আবার ব্যাপক ভিত্তিতে ঢেঁড়সের আবাদ। ঢেঁড়স বিক্রি করেও কৃষকরা শিমের মতোই টাকা অর্জন করে। এখানে ব্যাপক ভিত্তিতে বেগুনসহ অন্যান্য সবজির আবাদও হয়। বাংলাদেশে উত্পাদিত গাজরের দুই-তৃতীয়াংশ উত্পাদন হয় ঈশ্বরদীতে। গাজর বিক্রি করে প্রতি বছরই কৃষকরা ২০০-২৫০ কোটি টাকা আয় করছেন। দেশের অন্যান্য স্থানেও বাউকূল বিপুল পরিমাণ উত্পাদিত হলেও ঈশ্বরদীর উত্পাদিত বাউকূল আকৃতিতে বড় এবং খেতেও সুস্বাদু। বিপুল পরিমাণ ফলন হওয়ায় প্রতি বছর প্রায় ১০০ কোটি টাকার বাউকূল বিক্রি হচ্ছে। হূদয়ে মাটি ও মানুষ সমবায় সমিতির নেতা ও পদকপ্রাপ্ত কিতাব মন্ডল জানান, এখানে জরুরি ভিত্তিতে সবজি বেইজড হিমাগার নির্মাণের জন্য বিভিন্ন সময়ে দাবি জানানো হলেও এব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া হয়নি। প্রক্রিয়াকরণের ব্যবস্থা না থাকায় ভরা মৌসুমে দাম কমে গেলে কৃষকরা চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঈশ্বরদীর অর্থনীতিকে আরো সমৃদ্ধ করার জন্য কৃষকরা আধুনিক বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা অতীব জরুরি বলে জানিয়েছে।