পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় অগ্রগতির পাঁচ বছর

দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে দেশে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার অন্যান্য অঞ্চলের মতো পাবনাতেও একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে, যা ইতোমধ্যে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (২০০৮) নামে সারা দেশে পরিচিতি লাভ করেছে। পাবনার মতো ঐতিহ্যবাহী একটি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়। পাবনাবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল এই শহরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় হবে। এখানকার সাংবাদিক, ছাত্রসমাজ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবীসহ সকল শ্রেণির মানুষ বিভিন্ন সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য দাবি করেছেন। ১৯৯৭ সালে সরকার দেশের পুরানো ১২টি জেলা শহরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথম ধাপে বাদ গেলেও তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কার্যক্রম শুরু হয় (শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং ১৪/১১ বিঃপ্রঃবিঃ ৭/৯৯/১১৮ তারিখ ২৩/৩/২০০০ একটি চিঠিতে পাবনা জেলা প্রশাসককে জায়গা নির্ধারণের জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়)। উলে¬খ্য যে, ১৯৯৯ সালে ‘পাবনা এডওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ-পূর্তির অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগমন করলে তার কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি উত্থাপন করা হলে তিনি পাবনায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণা দেন।’ এরপর ২০০১ সালের ১৫ জুলাই তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকার জাতীয় সংসদে পাস করে ‘পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন’। আইন পাস হলেও ২০০১ সালের নির্বাচনে ক্ষমতার পালাবদলে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম থেমে যায়। তত্কালীন বিএনপি সরকার ২০০২ সালে দেশের ৮টি পুরাতন ও ঐতিহ্যবাহী সরকারি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করার প্রকল্প (সূত্র : শিমপ্র/পরি-এডিপি (২০০২-২০০৩)/২০০২ (খণ্ড)/৪০/১ (১) : তারিখ ঃ ০৮/০৬/২০০২) হাতে নেয়, যার মধ্যে পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের নাম ছিল, তবে জগন্নাথ কলেজ ব্যতীত আর কোনো কলেজ ঐ প্রকল্পের আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়নি। পাবনার মানুষকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য তাই আরও প্রতীক্ষা করতে হয়। ২০০৮ সালে আসে ইতিহাসের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ — এ বছর ২৯ জুন পাবনার বরেণ্য সন্তান, তত্কালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ, পরিকল্পনা, বাণিজ্য এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা মোঃ আজিজুল ইসলামের প্রত্যক্ষ প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ২০০৮ সালের ১২ অক্টোবর জারি করা হয় এসআরও (নং ২৭৮)। শুরুতে রাজাপুরের টিটিসি ক্যাম্পাসকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী ক্যাম্পাস হিসেবে ব্যবহার করা হলেও বর্তমানে মূল ক্যাম্পাসে চালু হয়েছে এর শিক্ষাকার্যক্রম। পাবনা শহরের ৫ কিলোমিটার পূর্ব দিকে রাজাপুর নামক স্থানে ঢাকা-পাবনা মহাসড়কের দক্ষিণ পার্শ্বে ৩০ একর জমির উপর প্রকৃতির নয়নাভিরাম পরিবেশে স্থাপিত হয়েছে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। প্রথম ভাইস-চ্যান্সেল ছিলেন প্রফেসর ড. মোঃ আমিন উদ্দীন মৃধা। বর্তমানে ভাইস-চ্যান্সেলর পদে কর্মরত আছেন প্রফেসর ড. মোঃ মোজাফফর হোসেন ২০০৮ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ ও ভিশন-২০২১’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এই সরকার তথ্য-প্রযুক্তির প্রসারে কাজ শুরু করে। সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষা-সমপ্রসারণের বাস্তব সিদ্ধান্তের ফলে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। ২০০৯ সালের ৫ জুন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক শিক্ষাকার্যক্রম উদ্বোধন করেন মাননীয় পরিকল্পনা মন্ত্রী, পাবনার সূর্যসন্তান, মুক্তিযুদ্ধের উপ-অধিনায়ক এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকার বীর উত্তম। ২০১৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাবনা সফরে এসে উদ্বোধন করেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসে নির্মিত প্রকৌশল অনুষদ ভবন এবং ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল ও স্বাধীনতা চত্বরের। এ বছর ৯ ফেব্রুয়ারি মূল ক্যাম্পাসে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাকার্যক্রম উদ্বোধন করেন ইউজিসি-র চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এ কে আজাদ চৌধুরী। গত পাঁচ বছরে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। ইতোমধ্যে কোনো সেশনজট ছাড়াই প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা বিবিএ, বিএসসি এবং বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স সম্পন্ন করেছে। বর্তমানে ১৩টি বিভাগ (গণিত, ইলেকট্রিক্যাল এ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার সায়েন্স এ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, বিজনেস এ্যাডমিনিস্ট্রেশন, ইলেকট্রনিক এ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, ইনফরমেশন এ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, পদার্থবিজ্ঞান, অর্থনীতি, বাংলা, ভূগোল পরিবেশ ও নগর-পরিকল্পনা, আর্কিটেকচার এবং ফার্মেসি), ১টি আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, শতাধিক শিক্ষক, প্রায় ২ হাজার শিক্ষার্থী, শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী, সমৃদ্ধ ডিজিটাল লাইব্রেরি, অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি, নিজস্ব পরিবহণ ব্যবস্থা, সহশিক্ষামূলক নানা কার্যক্রম, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম-বিজ্ঞানমেলা আয়োজন, ম্যাগাজিন ও গবেষণা-জার্নাল প্রকাশ, মূল ক্যাম্পাসের নির্মাণাধীন বিভিন্ন অবকাঠামো — সবকিছু মিলিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে চলছে।