পাবনার ঐতিহ্যবাহী হোসিয়ারি শিল্প ধ্বংসের মুখে

এখনও বলা হয়ে থাকে মানসিক হাসপাতাল ও গেঞ্জির কলের জন্য পাবনা বিখ্যাত। সেই পাবনার ঐতিহ্যবাহী হোসিয়ারী শিল্প আজ ধ্বংসপ্রায়। এককালে পাবনা হোসিয়ারী শিল্পের নাম ডাক ছিল দেশ জুড়ে। এখন এই শিল্প নারায়ণগঞ্জে স্থানান্তর হয়ে গেছে। তত্কালীন পাকিস্তানের সর্বত্র এর ব্যাপক চাহিদা ছিল। এমনকি দেশের বাইরেও বিশেষ করে ভারতে পাবনার এই দ্রব্য ব্যাপকভাবে সমাদৃত ছিলো। চীন-জাপানসহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৮/১০টি দেশে পাবনার তৈরি গেঞ্জি রফতানি করা হতো।১৯০৫ সালে পাবনা শহরের বর্তমান দিলালপুরে শিল্প সঞ্জীবনী নামে একটি হোসিয়ারী প্রতিষ্ঠিত হয়। জমিদার রায় বাহাদুর এবং জিতেন্দ নাথ কবিরাজ নামের দুই ব্যক্তি এই উদ্যোক্তা ছিলেন। শিল্প সঞ্জীবনী ব্যাপক সাফল্য লাভ করলে অন্যরা এ ব্যবসায় পুঁজি বিনিয়োগ করতে শুরু করেন। এভাবে দেখতে দেখতে মাত্র ১০ বছরের মাথায় ১৯১৫ সালে পাবনা শহর ও এর আশে পাশে ছোট-বড় প্রায় ৬০০ হোসিয়ারী শিল্প গড়ে ওঠে। হোসিয়ারী শিল্পের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে ১৯১৮ সালে পাবনা শহরের আশপাশে তাঁত শিল্পের বিকাশ ঘটে। এ সময় তাঁত শিল্পের পাশাপাশি হোসিয়ারী শিল্পের ব্যাপকতা আরো বেড়ে যায় এবং ব্যবসা মজবুত হয়। তাঁত শিল্পের প্রয়োজনে সুতা, রং ও রাসায়নিক দ্রব্যের বাজারও পাবনায় গড়ে ওঠে। ১৯২২ সালে নেতাজী সুভাস বসু একবার পাবনায় আসেন। এ সময় তিনি পাবনার সাতটি হোসিয়ারী শিল্প পরিদর্শন করেন। তিনি হোসিয়ারী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো দেখে মুগ্ধ হন। এসব প্রতিষ্ঠানে উত্পাদিত দ্রব্যের মান ও চাহিদা দেখে তিনি এই শিল্পকে বস্ত্রশিল্পের মা বলে আখ্যায়িত করেন। কবি রবীন্দ নাথ ঠাকুরও পাবনার হোসিয়ারী শিল্পের উত্পাদিত দ্রব্য গেঞ্জি, পাবনার তাঁত শিল্পের শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা ব্যবহার করতেন। তিনি অনেক সময় প্রিয়জনকে পাবনার হোসিয়ারী ও তাঁত শিল্পের উত্পাদিত সামগ্রী উপহার দিতেন। ১৯১৮ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত মূলত এ শিল্পের যৌবনকাল ছিল। এ সময় পাবনা শহরে যে কটা হাতেগোনা পাকা ভবন ছিল, তার সবকটির ছাদেই গেঞ্জি শুকানো হতো। এতে প্রতীয়মান হয় যে, সম্পদশালী ব্যক্তিরাই এ শিল্পের মালিক ছিলেন। ১৯৪৭ সালে পাক ভারত বিভক্তির ফলে রাজনৈতিক কারণে অনেক হিন্দু ধনী বিশেষ করে যারা হোসিয়ারী শিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তারা আস্তে আস্তে ভারতে চলে যেতে থাকেন। এ সময় থেকে হোসিয়ারী শিল্পে ভাটা পড়তে শুরু করে। অনেক ধনী হিন্দু এখানে থাকলেও ব্যবসা থেকে আস্তে আস্তে পুঁজি গুটিয়ে নিতে থাকেন। ফলে উত্পাদিত দ্রব্যের মান নামতে থাকে। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অল্পসংখ্যক উদ্যোক্তা ও শ্রমিকের প্রায় সবাই ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে চলে যায়। মালিকরা পরে আবার ব্যবসা শুরু করার চেষ্টা করতে না করতেই এ শিল্পে কাঁচামালের ব্যাপক অভাব দেখা দেয়। ১৯৭৩ সালে কয়েক দফায় কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো আর দাঁড়াতে পারেনি। বর্তমানে পাবনায় মাত্র ৩৫ জন মহোজন রয়েছে। স্বাধীনের আগে যার সংখ্যা ছিল ৭‘শ এর অধিক। শ্রমিক ইউনিয়নেল সভাপতি মোতালেব হোসেন জানান, দেশ স্বাধীনের পূর্বে পাবনাতে প্রায় ৫০টির অধিক স্বয়ংসম্পূর্ণ মেশিন ছিল। যে মেশিনে সুতা থেকে শুরু করে গেঞ্জি পর্যন্ত সবকিছু পাবনাতেই তৈরি করা হতো। কিন্তু বর্তমানে পাবনাতে একটি মেশিনও নেই। এখন গেঞ্জি তৈরি করা হয় নারায়ণগঞ্জ থেকে কাপড় এনে। সেই কাপড় দিয়ে পেটের তাগিদে এই ব্যবসা ধরে রাখা হয়েছে। তিনি হতাশ কণ্ঠে বলেন, বর্তমানে শ্রমিক ও মালিকের অবস্থা খুবই নাজুক। শ্রমিকদের সারা দিন কাজ করে মাত্র ৭০/৮০ টাকা আয় করা দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।