ডিজিটাল বাংলাদেশের আলো ও অন্ধকার

বর্তমান সরকার তার নির্বাচনী ঘোষণায় যুব সমপ্রদায়ের নজর কেড়েছিল ডিজিটাল বাংলাদেশের ঘোষণা দিয়ে। বিশ্বজুড়ে ডিজিটালের উন্মাতাল বাতাস বাংলাদেশের তরুণদের মনে আলোড়ন তুলেছিল। কথিত আছে, এই তরুণ সমাজের নতুন ভোটাররাই সরকারকে ক্ষমতায় আসতে সাহায্য করেছিল। সরকার তার মেয়াদের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে। এই বিগত বছরগুলোতে সরকার তার কথা রাখার চেষ্টা করেছে। দারিদ্র্যে নিপীড়িত একটি দেশে রাতারাতি সবকিছুতে ডিজিটাল বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তবুও লক্ষ করলে অনেক কিছুতেই এখন আমরা ডিজিটালের ছোঁয়া দেখতে পাই। ব্যাংকিংব্যবস্থা এদের মধ্যে অন্যতম। মোবাইলের বোতাম চেপে এখন চোখের পলকে করা যায় ব্যাংকিং লেনদেন। ছবির স্টুডিও জগতে এসেছে শতভাগ ডিজিটাল জোয়ার, ম্যানুয়াল সাদাকালো ক্যামেরা বা ফিল্মের ক্যামেরা এখন জাদুঘরে জায়গা করে নিয়েছে। সিনেমা জগতেও চলছে ডিজিটাল জ্বর। যোগাযোগ ব্যবস্থায় এসেছে আমূল পরিবর্তন, জরুরি দরকারে রিকশাওয়ালার মোবাইলে ফোন করে ডেকে নেওয়া যায়। এসেছে কৃষি ও চিকিত্সা সেবায় ডিজিটালের ব্যবহার। রজনীতিতেও শুরু হয়েছে ডিজিটালের ব্যবহার, মোবাইল ফোনের এসএমএস দিয়ে শুরু হলেও আজ তা ঝকমকে ঢাউস আকারের বিলবোর্ড আর সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটে এসে দাঁড়িয়েছে। বাড়ছে ডিজিটাল খাতে বৈদেশিক আয়। আরো অনেক কিছুৃ। এই প্রয়াসগুলো সত্যিই সাধুবাদের দাবিদার। সেইসঙ্গে আমরা যদি লক্ষ করি ডিজিটালের প্রকৃত সুবিধাভোগী কারা, তাহলে দেখবো খুব অল্প সংখ্যক মানুষ এবং এর প্রায় পুরোটাই শহরবাসী। আর গ্রামে ডিজিটাল মানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মোবাইল ফোনেই সীমাবদ্ধ। অথচ দেশের ৮৫ ভাগ মানুষ বাস করে গ্রামে। সেই গ্রামকে ডিজিটালের আওতায় না আনতে পারলে দেশকে ডিজিটালে পূর্ণতা দেওয়া সম্ভব নয় ! ডিজিটালের প্রথম এবং প্রধান বাহন দ্রুতগতির ইন্টারনেট। গত পাঁচ বছরে দেশে দ্রুত গতির ইন্টারনেটের ব্যবস্থা করা হয়নি। ওয়াই ম্যাক্স বা ব্রডব্যান্ড যেটুকু আছে তার শতভাগ বড় শহরে। সরকারি পর্যায়ে বারবার ইন্টারনেটের দাম কমানো হলেও গ্রাহক পর্যায়ে দাম কমেনি। কম্পিউটারকে করমুক্ত করলেও প্রান্তিক পর্যায়ের স্কুলগুলোতে কম্পিউটারশিক্ষার তেমন ব্যবস্থা করা হয়নি। মফস্বল আর গ্রাম পর্যায়ে কম্পিউটার শেখানো মূলত কম্পিউটারে লেখা, ছবি আর গানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। কম্পিউটারের জন্য করা হয়নি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ব্যবস্থা। দেশের একটি গ্রামেও কোনো ইন্টারনেট ক্যাফে গড়ে ওঠেনি। গ্রামের সেই দুর্বল ইন্টারনেটে ইন্টারনেটভিত্তিক কোনো কাজই সফল ও সহজভাবে করা যায় না। সরকার ইউনিয়নভিত্তিক বিশ্ব যোগাযোগের জন্য ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে কম্পিউটার দিয়েছিল, কিন্তু দুর্বল ইন্টারনেটের কারণে সেটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সফল হয়নি। দেশের একমাত্র সরকারি মোবাইল ফোন অপারেটর টেলিটক ৩জি সেবা শুরু করলেও সেটা সামান্য কিছু শহর জুড়ে বিস্তার করতে পেরেছে। মাত্র কয়েকদিন আগে দেশের চারটি বেসরকারি মোবাইল ফোন অপারেটর নিলামের মাধ্যমে ৩জি লাইসেন্স পেয়েছে। পেয়েই তাদের ঘোষণা, বড় শহর তাদের প্রথম টার্গেট। এখানে তারা তাদের মুনাফা আগে দেখবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সরকার তো তার নিজের প্রতিষ্ঠান দিয়ে গ্রামকে প্রাধান্য দিতে পারতো। কারণ সরকারি সেবাই সাধারণের প্রধান আশ্রয়। দেশকে পরিপূর্ণ ডিজিটালে রূপান্তরিত করতে চাইলে প্রাধান্য দিতে হবে গ্রামকে। গ্রাম থাকবে অ্যানালগ আর দেশ হবে ডিজিটাল এটা কখনোই সম্ভব নয়। তাই সর্বপ্রথম সকল গ্রামে পৌঁছে দিতে হবে বিদ্যুত্, করতে হবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ব্যবস্থা। সরকারিভাবে দ্রুত গতির ইন্টারনেট পৌঁছে দিতে হবে গ্রাম পর্যন্ত। আর বেসরকারি অপারেটররা তখন স্বেচ্ছায় গ্রামে যেতে বাধ্য হবে প্রতিযোগিতার খাতিরে। সকল ইউনিয়ন পর্যায়ে, সম্ভব হলে প্রতিটি ওয়ার্ডে অন্তত একটি করে সরকারি অনুদানে ছোট আকারে হলেও ইন্টারনেট ক্যাফে গড়ে তুলতে হবে, যেখান থেকে গ্রামের মানুষ সহজেই প্রবাসে যোগাযোগ করতে পারবে, পাবে ডিজিটালের দ্রুত গতির অন্যান্য সেবা। দেশের প্রতিটি স্কুলে কম্পিউটার শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অভিজ্ঞ ও যুগোপযোগী করে তুলতে হবে। করতে হবে কম্পিউটার শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক। সমস্ত হাইস্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্রি ওয়াইফাই-এর ব্যবস্থা করতে হবে এবং সর্বোপরি ইন্টারনেটের দাম সাধারণের নাগালের মধ্যে রাখতে হবে। তাহলেই একদিন এই দেশ হবে সত্যিকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ। ফিলিপাইন