তথ্য অধিকার আইন এবং বাস্তবতা

বর্তমান যুগে তথ্যের যে অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ‘জ্ঞানই শক্তি’র পরিবর্তে এখন বলা হয়ে থাকে ‘তথ্যই শক্তি’। তথ্যের গুরুত্ব সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেমস ম্যাডিসন বলেছেন, ‘...সরকারের কাছে জনগণের জন্য যদি তথ্য উন্মুক্ত না থাকে এবং তথ্য পাওয়ার উপায়ও যদি না থাকে, তাহলে সেটা হয় একটি প্রহসন বা ট্র্যাজিডির সূচনা অথবা একসঙ্গে দুটোই।’ সুতরাং গণতন্ত্র থাকা দেশগুলোর জনগণের জন্য তথ্য সংগ্রহের অধিকার একটি নাগরিক অধিকার হিসেবেই বিবেচিত হয়। শুধু তাই নয়, কল্যাণ বিবেচনায় পৃথিবীর ৯৩টি দেশে তথ্য জানার অধিকারকে ইতিমধ্যে আইনে পরিণত করা হয়েছে। বাংলাদেশে সংবিধান প্রদত্ত চিন্তা-বিবেক ও বাক-স্বাধীনতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তথ্য অধিকার স্বীকৃত। প্রতিটি নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে তথ্যের রয়েছে ওতপ্রোত সম্পর্ক। উপযুক্ত ও প্রয়োজনীয় তথ্যের আদান-প্রদান মানুষের জীবনমান বাড়াতে সহায়তা করে এবং সেবা প্রদানকারী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা বৃদ্ধির পরিবেশ তৈরি করে। তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিত করার জন্য বর্তমান সরকার ২০০৯ সালের ২৯ মার্চ তথ্য অধিকার আইন পাস করে। জনগণের তথ্য জানার অধিকার নিয়ে ইতিপূর্বে দেশে কোনো আইন ছিল না। বরং দাপ্তরিক গোপনীয়তা আইন, এভিডেন্স অ্যাক্ট, রুল্স অব বিজনেস অ্যাক্ট ইত্যাদির মাধ্যমে তথ্য লুকিয়ে রাখার পথ উন্মুক্ত রাখা হতো। গণতান্ত্রিক দেশে যেহেতু জনগণ সকল ক্ষমতার মালিক, তাই জনগণের ক্ষমতায়নের জন্য তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এটি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা স্থাপনে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠায় এর চেয়ে আর ভালো হাতিয়ার নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের দেশে এই আইনটি কতটুকু কার্যকর হচ্ছে? আইন পাসের চার বছরেও যখন বেশিরভাগ সরকারি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা নির্ধারণ করা হয় না অথবা নির্ধারিত থাকলেও তিনি দায়িত্ব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হন না বা তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা যদি আগের দাপ্তরিক গোপনীয়তা আইন মেনে চলতে আগ্রহী হন, তাহলে সকলের মনেই প্রশ্ন জাগা স্বভাবিক যে, তথ্য অধিকার আইনটি কি আমাদের দেশে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে প্রকৃতপক্ষে সহায়ক হচ্ছে? বাজেট, আইন, নীতিমালা ইত্যাদিসহ বেশ কিছু ক্ষেত্রে এখন ওয়েবসাইট বা তথ্য অধিকারের মাধ্যমে জনগণের মতামত প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা জনসম্পৃক্ততার পাশাপাশি জনগণের হীনন্মন্যতা হ্রাস করে। বিশ্বের ছয়টি দেশের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাজেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনসম্পৃক্ততা বাজেটকে জনবান্ধবে পরিণত করে। শুধু বাজেটই নয়, হাতেগোনা অল্প কিছু ক্ষেত্র বাদ রেখে রাষ্ট্রের যে কেউ সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তথ্যের জন্য আবেদন করতে পারেন। এমনকি সংশ্লিষ্ট দলিলাদি দিতেও বাধ্য সংস্থাগুলো। এতে করে প্রতিষ্ঠানগুলোও যেমন দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনে বাধ্য হয়, তেমনি দুর্নীতির আশ্রয় নিতেও ভয় পায়। আবার যে কয়টি সেক্টর বা ক্ষেত্র বাদ রাখা হয়েছে, সেগুলোতে যদি দুর্নীতি বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে থাকে তবে তা এর আওতামুক্ত থাকে। তথ্য অধিকার আইনে যেহেতু বলা হয়েছে, জনগণ এবং বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত সংগঠনগুলো এই আইনের আওতায় তথ্য দিতে বাধ্য থাকবে, সুতরাং রাজনৈতিক দল এবং বেসরকারি (এনজিও) সংস্থাগুলো এর বাইরে নয়। কারণ এই সংস্থাগুলো জনগণের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। তাছাড়া এই দুই খাতে সুশাসনের চরম ঘাটতি রয়েছে বলে বিভিন্ন সময় দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক আন্দোলন টিআইবির জরিপে উঠে এসেছে। রাজনৈতিক দল এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোতে যেহেতু সুশাসনের ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে, সুতরাং এই সেক্টর দুটোকে পরিশীলিত করতে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত তথ্য প্রদানের ওপর জোর দেওয়া উচিত। তথ্য অধিকারের সত্যিকার বাস্তবায়ন কীভাবে দুর্নীতি হ্রাসে ভূমিকা পালন করে তা অনেকটাই গবেষণালব্ধ। দুর্নীতির বৈশ্বিক সূচকে সেই দেশগুলোই কম দুর্নীতিগ্রস্ত যেগুলোতে তথ্য অধিকার আইন কার্যকর রয়েছে। তথ্য অধিকার ফোরামের এক গবেষণায় দেখা যায়, এ দেশের ৪৪.২ শতাংশ জনগণই তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে অবগত নয়। আবার যাঁরা এ আইনটি সম্পর্কে অবগত আছেন তাঁরা তা প্রয়োগে খুব একটা আগ্রহী নন। ওই গবেষণায় আরো দেখা যায়, এ আইনটি সম্পর্কে জ্ঞাতরা প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য সনাতন ও অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতিতে তথ্য পেতে বেশি অভ্যস্ত। আর মূল সমস্যাটি মূলত এখানেই। বাংলাদেশ তথ্য কমিশন কর্তৃক প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন (২০১২) অনুযায়ী, ২০১১ সালে তথ্য অধিকার আইনের নির্ধারিত ফর্ম ব্যবহার করে সারা দেশে প্রায় সাত হাজার আট শ’ আবেদন পাওয়া গেলেও বেশিরভাগ তথ্যই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছ থেকে পাওয়ায় আপিল আবেদনের মাত্রা খুবই কম। এক শ চারটি অভিযোগের মধ্যে ত্রুটিমুক্ত মাত্র ৪৪টি অভিযোগ গৃহীত হয়। অথচ আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে তথ্য অধিকার আইন পাস হওয়ার মাত্র এক বছরের মাথায় দুই হাজার আবেদনের প্রায় চার শটিই আপিল আবেদনের বিবেচনাধীন ছিল। আমাদের দেশের তথ্য অধিকার আইনে বলা হয়েছে, অনুরোধকৃত তথ্য কোনো ব্যক্তির জীবন-মৃত্যু, গ্রেফতার এবং কারাগার থেকে মুক্তি সম্পর্কিত হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অনুরোধ প্রাপ্তির অনধিক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রাথমিক তথ্য প্রদান করবেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তথ্য অধিকার আইনের দোহাই দিয়ে তথ্য আরো লুকিয়ে রাখা হচ্ছে কিনা? অনেক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ না হওয়া বা নিযুক্ত হলেও প্রচারের অভাব অথবা নিযুক্ত ব্যক্তির আইন সম্পর্কে অস্পষ্ট ধারণা আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিকূল পরিবেশের সৃষ্টি করে। তথ্যের আবেদন করতে গিয়ে হুমকির শিকার বা আবেদন গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোর ঘটনাও কম নয়। আবার গ্রামাঞ্চলে তথ্য অধিকারের হুমকি দিয়ে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের কথাও শোনা যায়। আমরা এখন যদিও ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলি কিন্তু এ পর্যন্ত অধিকাংশ সরকারি অফিসের তথ্য ও দলিলাদি সেই অ্যানালগ পদ্ধতিতেই রয়ে গেছে। তাই তথ্যের সন্নিবেশনসহ ডিজিটাল পদ্ধতিতে তা ধারাবাহিকভাবে সংরক্ষণ করা জরুরি। পাশাপাশি কোন দপ্তরে কী ধরনের সেবা পাওয়া যাবে এবং সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব স্ব-প্রণোদিত হয়ে প্রকাশ করার ব্যবস্থা করা জরুরি। তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণও অপরিহার্য। আর এটি করা সম্ভব হলে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে দুর্নীতি অনেকাংশে হ্রাস পাবে তা অনেকটাই নিশ্চিতভাবে বলা যায়। ঢাকা