ভালবাসার গল্প তারা

এই প্রথম জুটিবদ্ধ হয়ে অভিনয় করলেন কুসুম সিকদার ও আমিন খান। রুদ্র মাহফুজের রচনা ও সাখাওয়াত্ হোসেন মানিকের পরিচালনায় আসছে ঈদের জন্য নির্মিত টেলিফিল্ম ‘তবুও ভালোবাসি’তে দর্শকরা তাদের দেখতে পাবেন। এই নাটক ও দুই অভিনয়শিল্পীর অভিনয়ের নানা গল্প নিয়ে লিখেছেন খালেদ আহমেদ ও ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু মডেল ও অভিনেত্রী হিসেবে দর্শকদের কাছে কুসুম সিকদারের জনপ্রিয়তার কমতি নেই। ছোটবেলায় তিনি ভেবেছিলেন, গান নিয়ে সারাজীবন কাটিয়ে দেবেন। কিন্তু ২০০২ সালে লাক্স ফটো সুন্দরী প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়ায় পর তার সেই ভাবনা পাল্টে যায়। এর আগে একই বছর সাউন্ডটেক থেকে তিনি গায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। অ্যালবামের নাম ‘জীবনে যত চাওয়া’। এরপর তার আরও কয়েকটি মিশ্র অ্যালবাম প্রকাশিত হয়। তবে একসময়ের গায়িকা এখন পুরোদস্তুর অভিনেত্রী। চরিত্রের ভেতর ঢুকে তাকে বের করে আনার ক্ষেত্রে যে দক্ষতা তিনি দেখিয়েছেন, তাতে দর্শকদের পছন্দের তারকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে বেশি সময় লাগেনি। অভিনয়টাকে তিনি শিল্প হিসেবেই দেখেন। তার ভাষ্যে, ‘অভিনয়টা সাধারণ কোনো কাজ নয়। এটি একটি শিল্প। আর এই শিল্প তিলে তিলে গড়ে তোলে অভিনয়শিল্পীরাই। তাই শিল্পের মান রক্ষায় অভিনয়শিল্পীদের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হয়।’ মাত্রাতিরিক্ত শুটিং ব্যস্ততা কাজের মান খারাপ করে দেয় কি না জানতে চাইলে কুসুম বলেন, ‘কিছুটা তো করেই। তবে এর বেশির ভাগটাই নির্ভর করে শিল্পীর ওপর। শিল্পী কিভাবে তার ব্যস্ততাকে সমন্বয় করে তার ওপর বিষয়টি নির্ভর করে। যারা অধিক ব্যস্ত হয়েও সমন্বয়টা করতে পারে তাদের অভিনীত নাটকগুলোর মান অতটা নিচে নামে না যতটা বলা হয়। আমি চেষ্টা করি সমন্বয় করে চলার। কতটা সফল তা দর্শকরাই বলতে পারবে।’ ফটোসুন্দরী হওয়ার পর কুসুমের প্রথম অভিনীত নাটক হলো ‘বিয়ের আংটি’। এরপর অভিনয় করেন বেশকিছু মানসম্পন্ন নাটকে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘ঘাটের কথা’, ‘নৌকাডুবি’, ‘মেঘবালকের গল্প’, ‘অন্ধকারের ফুল’, ‘জলপরী’, ‘জ্যোত্স্নাকাল’, ‘হাতের রেখা কথা বলে’, ‘জহুর আলী জহুরী’, ‘মনকরা’, ‘বাঘপুতুল’ প্রভৃতি। কুসুম তার ক্যারিয়ারের গ্রাফটা মানসম্পন্ন কাজের মাধ্যমে ঠিকই উপরের দিকে নিয়ে গেছেন। নাটক এবং চলচ্চিত্র দুই মাধ্যমেই এখন ব্যস্ত তিনি। নিজের প্রথম চলচ্চিত্র ‘গহীনে শব্দ’ বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে। খালিদ মাহমুদ মিঠুর পরিচালনায় ‘গহীনে শব্দ’ ক্যালিফোর্নিয়ার পাম স্প্রিং চলচ্চিত্র উত্সবে প্রদর্শিত হয়েছে। বাংলাদেশে রেইনবো চলচ্চিত্র উত্সবে সমালোচক বিভাগে এটি সেরা চলচ্চিত্রেরও পুরস্কার পেয়েছে। বর্তমানে কুসুম অভিনীত বেশ কয়েকটি ধারাবাহিক নাটক বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচার হচ্ছে। এরমধ্যে ‘উত্তরাধিকার’, ‘পণ্ডিতের মেলা’, ‘একই শহরে’, ‘ইকারুসের ডানা’, ‘যোগাযোগ’, ‘নো ম্যানসল্যান্ড’ প্রভৃতি। সামনে অভিনয় করবেন ধারাবাহিক নাটক হূদি হকের পরিচালনায় ‘দেয়াল’ এবং ফারুক হোসেনের ‘বোয়িং সেভেন ফর সেভেন’। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কুসুম সিকদারের দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘লালটিপ’ মুক্তি পায়। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেটের ইমপ্রেস টেলিফিল্মের এই ছবিটি পরিচালনা করেন স্বপন আহমেদ। এই ছবিতে কুসুম সিকদার নিধি চরিত্রে অভিনয় করেছেন। কুসুমের বিপরীতে নায়ক হিসেবে অভিনয় করেছেন ইমন। এই ছবিতে আরও অভিনয় করেছেন শহীদুল আলম সাচ্চু, এটিএম শামসুজ্জামান, মিশু, সোহেল খান, কোনালসহ আরও অনেকেই। ফ্রান্সের অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে রয়েছেন ড্যানিয়েল ক্রেমার, জেরার্ড দোপার্দো, দেবোরাহ নিউম্যান, নাতালি ফ্রান্সেস্কি ও লিয়ানা। এটি বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত একটি চলচ্চিত্র। দ্বিতীয় ছবি ‘লাল টিপ’ও কুসুমকে সফলতার ভেলায় ভাসিয়ে নিয়েছে। বর্তমানে তিনি তৃতীয় ছবিতে অভিনয়ের জন্য অপেক্ষায় আছেন। তার ভাষ্যে, ‘আমি সব সময় ভালো গল্প, ভালো পরিচালক এবং কাজ করা অনুকূল পরিবেশ থাকলেই কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।’ অন্যদিকে আমিন খান অভিনয় করছেন প্রায় দুই যুগ ধরে। কিন্তু এখনও তিনি চিরতরুণই রয়ে গেছেন। তার চেহারায় বিন্দুমাত্র বয়সের ছাপ পড়েনি। দেহাবয়বেও সে ধরনের কোনো পরিবর্তন আসেনি। মেদহীন শরীরে তিনি আগের মতোই প্রাণবন্ত রয়েছেন। ১৯৯০ সালে ‘নতুন মুখের সন্ধানে’ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মিডিয়ায় এসেছিলেন আমিন খান। মোহাম্মদ হোসেনের ‘অবুঝ দুটি মন’ ছবির মাধ্যমে তার রুপালি পর্দায় পদার্পণ ঘটে। এ ছবিতে তার সাইনিং মানি ছিল মাত্র এক টাকা। তবে প্রথম ছবিতেই তিনি সবাইকে বাজিমাত করে দিয়েছিলেন। দর্শকরা তাকে মনে-প্রাণে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। অভিনয়ের দীর্ঘ এই সময়ে ঝুলিতে প্রায় দেড়শত ছবি জমা পড়েছে। এরমধ্যে ‘ফুল নেবো না অশ্রু নেবো’, ‘আজ গায়ে হলুদ’, ‘বধূবরণ’সহ বেশ কিছু ছবি দর্শক হূদয়ে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এখনও তার দর্শক চাহিদা তুঙ্গে। বরাবরই তিনি রুচিশীল ছবিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নায়ক হিসেবে তার স্মার্টনেস এবং সু-অভিনয়ের প্রশংসা নিন্দুকের মুখেও শোনা যাচ্ছে। অমিন খান বরাবরই রোমান্টিক ধাঁচের ছবিতে অভিনয় করেছেন। তবে ‘দুুদু মিয়া’ নামের একটি ব্যতিক্রম ছবিতে অভিনয় করছেন। ফরায়েজি আন্দোলনের অন্যতম নেতা এবং ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেওয়া দুদু মিয়ার সংগ্রাম ও জীবনকাহিনী নিয়ে চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়। ডায়েল রহমানের চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় এ ছবিতে দুদু মিয়ার চরিত্রে অভিনয় করছেন আমিন। ‘দুদু মিয়া’ ছবিতে আমিন খানের বিপরীতে অভিনয় করেন নওশীন। আমিন খান-নওশীন ছাড়াও ‘দুদু মিয়া’ ছবিতে আরও অভিনয় করছেন সুজাতা, আহমেদ শরীফ, শ্যামল জাকারিয়া প্রমুখ। বর্তমান সময়ে ডিজিটাল ছবির জোয়ার বইছে। ‘ভালোবাসার রঙ’-এর সফলতার ধারাবাহিকতায় মুক্তিপ্রতীক্ষিত অধিকাংশ ছবিই ডিজিটাল ফরমেটে ট্রান্সফার করা হচ্ছে। ‘দেবদাস’, ‘চোরাবালি’, ‘মাই নেম ইজ খান’-এর পর এবার এ তালিকায় যোগ হয়েছে আমিন খান অভিনীত ‘লোভে পাপ পাপে মৃত্যু’ ছবিটি। এটি নির্মাণ করেছেন সোহানুর রহমান সোহান। ডিসেম্বরে ছবিটি মুক্তি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ছবির পরিচালক-প্রযোজক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন। ছবিটিকে ডিজিটাল ফরমেটে ট্রান্সফার করে তবেই মুক্তি দেওয়া হবে। ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনী নিয়ে ছবিটির গল্প আবর্তিত হয়েছে। আমিন খানের পাশাপাশি এ ছবিতে আরও অভিনয় করেছেন চিত্রনায়ক রিয়াজ ও পূর্ণিমা। এ বিষয়ে আমিন খান বলেন, ‘বিশ্ব এখন ক্রমশ আধুনিক প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে। তাই এ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে প্রতিটি ছবিকে ডিজিটাল রূপে মুক্তি দেওয়াই উত্তম।’ সর্বশেষ গত ঈদে আমিন খানের ‘স্বামীভাগ্য’ ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল। এতে তার বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন রোমানা। ছবিটি বেশ দর্শকপ্রিয়তা লাভ করেছিল। এই প্রথম জুটিবদ্ধ হয়ে অভিনয় করলেন কুসুম সিকদার ও আমিন খান । আসছে ঈদের জন্য নির্মিত টেলিফিল্ম ‘তবুও ভালোবাসি’-তে দর্শকরা তাদের দেখতে পাবেন। রুদ্র মাহফুজের রচনায় এটি পরিচালনা করেছেন সাখাওয়াত্ হোসেন মানিক। টেলিফিল্মের গল্পে দেখা যাবে, কেউ কেউ দেখতে সুদর্শন হন। আর আট-দশটা পুরুষের তুলনায় তার শারীরিক গঠন ও ব্যক্তিত্ব থাকে চমক লাগার মতো। যে ধরনের পোশাকেই তিনি নিজেকে আবৃত করেন না কেন তাতে তিনি হয়ে ওঠেন অনন্য সাধারণ। তেমনি একজন রুমী। একটি কর্পোরেট অফিসে উচ্চ পদে চাকরি করেন। অফিসের বেশ ক’জন সুন্দরী রমণী রুমীকে পছন্দ করে। কিন্তু রুমীর কখনোই তাদের প্রতি কলিগ বাদে অন্য কোনো দৃষ্টি দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। অফিসের সুর্দশনা তরুণী নায়লা। নায়লার সাথে কথা বলার জন্য অন্যান্য ছেলে কলিগরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। কিন্তু নায়লা অপেক্ষায় থাকে কখন রুমী অফিসে আসবে। নিজ ডেস্কে রুমী নিশ্চুপ হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করে যায়। কাজ শেষ হলে এক মুহূর্তও অফিসে থাকে না। নায়লা কখনও কখনও কথা বলতে গেলে কিংবা এক সাথে লাঞ্চ করতে বললে তা অফিসের প্রয়োজনীয় না হলে রুমী তেমন আগ্রহ দেখায় না। নায়লার মতো এ রকম আরও আছে সুমি ও শাকিলা। এরা সবাই রুমীর কলিগ। কেউ মনে মনে আবার কেউবা প্রকাশ্যে রুমীকে পছন্দ করে। কখনও তার ডেস্কে থাকে চিরকুট আবার কখনও লম্বা কোনো চিঠি। এর কোনোটাতেই রুমীর তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটে না। অফিসের এমডি শাহানা চৌধুরী রুমীকে বিশেষ পছন্দ করেন। যখন তখন রুমীর ডেস্কে চলে আসা, নিজের ফ্ল্যাটে ডেকে ডিনার করানো, বিদেশ থেকে ফিরলেই কোনো গিফট দেওয়া—এই নিয়ে অফিসের ছেলে কর্মচারীদের মাঝে আছে নানা গসিপ। প্রত্যেক সপ্তাহেই রুমী শুক্রবারের সাথে বৃহস্পতিবারটিও ছুটি নিয়ে চলে যায়। এতে শাহানা চৌধুরী কখনও রুমীকে কিছু বলেছে বলে কেউ শুনেনি। শাহানা চৌধুরী বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও রুমীকে পছন্দ করে। কিন্তু রুমী অর্থ ও ক্যারিয়ারের প্রচণ্ড হাতছানিতেও শাহানা চৌধুরীর সাথে কখনও অফিসের প্রয়োজন বাদে কথা বলেনি। রুমী যে ফ্ল্যাটটিতে ভাড়া থাকে, সেই বাড়ির মালিকের মেয়ে মৌ’ও রুমীকে পছন্দ করে। প্রায় নানা অজুহাতে সময়-অসময়ে মৌ রুমীর ফ্ল্যাটে আসে। কিন্তু রুমী কখনও তাকে ভেতরে বসতে বলে না। কখনও মজার কোনো বই, সুস্বাদু খাবার আবার কখনও ফ্ল্যাটের পানির কল ঠিক আছে কি না দেখার অজুহাতে রুমীর ফ্ল্যাটে আসে মৌ। প্রত্যেকের সাথেই ভালো ব্যবহার করে রুমী। তবে কখনোই ব্যক্তিত্ব ব্যতিরেকে নয়। সপ্তাহে প্রায়ই রুমী দু’দিনের জন্য কোথায় যেন যায়, এ বিষয়ে মৌ অনেক বার জিজ্ঞেস করেও কোনো গ্রহণযোগ্য উত্তর পায়নি। অন্যদিকে নায়লা নিজে একবার পিছু নিয়েছিল, তবে পরক্ষণেই বুঝতে পারে রুমী কোথায় আছে তা বুঝা বেশ কঠিন। শেষমেশ শাহানা চৌধুরী অফিসের একজন নিম্ন কর্মচারীকে বিশেষভাবে রুমীকে অনুসরণ করতে বলে। সে কোথায় কোথায় যায় জানার জন্য। এভাবেই এগিয়ে যায় কাহিনী। এই টেলিফিল্মে অভিনয় প্রসঙ্গে কুসুম সিকদার বলেন, ‘এর গল্প খুব সুন্দর। আর আমিন ভাইও ভালো অভিনেতা। তার সঙ্গে অভিনয় করতে পেরে ভালো লেগেছে।’ আমিন খান বলেন, ‘আমি নাটক বা টেলিফিল্মে কমই অভিনয় করি। এই টেলিফিল্মের গল্পটা ভালো লেগেছে বলেই করছি। সব মিলিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা বেশ মজার।’ পরিচালক সাখাওয়াত্ হোসেন মানিক বলেন, ‘সমাজের বাস্তব গল্প নিয়েই এই টেলিফিল্ম। আশা করছি টেলিফিল্মটি দর্শকদের ভালো লাগবে।’