আরণ্যকের রাঢ়াঙ
সাঁওতাল বিদ্রোহের জীবন্ত দলিল
প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০১৩, ১৯:০৩
আরণ্যক নাট্যদল। প্রায় স্বাধীনতার সমান বয়স নিয়ে পথ চলছে বাংলাদেশ তথা ঢাকার মঞ্চে দাপিয়ে বেড়ানো এই থিয়েটার দলটি। লড়াই করছে সকল শোষকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। যে লড়াইয়ের প্রধান হাতিয়ার নাটক। নাটককে তারা শুধু বিনোদন মনে করে না, মনে করে শ্রেণীসংগ্রামের এক সুতীক্ষ হাতিয়ার হিসেবে। তাই তাদের মূলমন্ত্র হলো—‘নাটক শুধু বিনোদন নয়, শ্রেণীসংগ্রামের সুতীক্ষ হাতিয়ার।’ এ পর্যন্ত মঞ্চায়িত আরণ্যকের সকল নাটকেই উচ্চারিত শোষকবিরোধী বিপ্লবী শ্লোগান। গাওয়া হয়েছে খেটে খাওয়া মানুষের জয়গান। ‘রাঢ়াঙ’ নাটকটি সেগুলোর মধ্যে অন্যতম।
রাঢ়াঙ আরণ্যকের ৪০তম প্রযোজনা। এ পর্যন্ত রাঢ়াঙ-ই আরণ্যকের সবচেয়ে সফল ও জনপ্রিয় নাটক। সাঁওতাল জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও সংগ্রাম নিয়ে নাটকটি রচনা করেছেন ও নির্দেশনা দিয়েছেন আরণ্যকের প্রাণপুরুষ, বরেণ্য নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ। অভিনয় করেছেন—মামুনুর রশীদ, তমালিকা কর্মকার, চঞ্চল চৌধুরী, আখম হাসান, শামীম জামান, জয়রাজ, শামীমা শওকত লাভলী, আমানুল হক হেলাল, হাসিম মাসুদ, আরিফ হোসেন আপেল, সাজ্জাদ সাজু রুহুল আমিনসহ আরণ্যকের অন্যান্য অভিনেতা-অভিনেত্রীগণ।
রাঢ়াঙ প্রথম মঞ্চে এসেছিল ২০০৪ সালে। অদ্যবধি প্রদর্শিত হয়েছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও বহুল আলোচিত হয়েছে নাটকটি। ভারতের কোলকাতা, বহরমপুর দিল্লি, কেরালা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার তিনটি আন্তর্জাতিক নাট্যোত্সবে নাটকটি প্রদর্শিত হয়েছে একাধিকবার। বাংলাদেশে আরণ্যকই প্রথম দল যারা সরকারি অর্থায়নে বিদেশের মাটিতে নাটক মঞ্চস্থ করেছে। আর সেই মঞ্চায়িত নাটকটি হচ্ছে রাঢ়াঙ।
রাঢ়াঙ একটি সাঁওতালি শব্দ। অর্থ দূরাগত মাদলের ধ্বনি। দূরাগত মাদলের ধ্বনির সাথে শোষিত সাঁওতালদের জেগে ওঠার আহ্বান জানানো হয়েছে এই নাটকে। নাটকের কাহিনিতে দেখা যায়, তানোর নামের এক লোকালয়ে সাঁওতালরা বাস করে। সেখানে তাদের কোনো নিজস্ব জমি নেই। পরের জমিতে চাষ করেই জীবিকা নির্বাহ করতে হয় তাদের। সেখান থেকে বিশম্বর নামক এক জোতদারের প্রলোভনে তারা তানোর ছেড়ে পাড়ি জমায় ভীমপুরে। জমি পাবার আশায় তারা ছেড়ে যায় তাদের দীর্ঘদিনের বসতভিটা। কিন্তু ভীমপুরে গিয়েও তারা জমির কাগজ পায় না। আজ-কাল বলে বিশম্বর তাদের প্রতিদিনই ঘোরায়। কিন্তু তাদের দিয়ে ঠিকই ফসল ফলিয়ে তার বড় অংশটা সে নিয়ে যায়। ধীরে ধীরে ক্ষোভ বাড়তে থাকে সাঁওতালদের মনে। এদিকে ভীমপুরের স্থানীয় আরেক জোতদার হাতেম আলী তার এলাকায় সাঁওতালদের মেনে নিতে পারে না। সে বিভিন্নভাবে সাঁওতালদের উচ্ছেদ করার চেষ্টা চালায়। এমনকি সাঁওতালদের পেছনে পুলিশও লেলিয়ে দেয়। ্এরই মধ্যে বিশম্বরের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর বিশম্বরের ভাইয়ের ছেলে গদাই হাতেম আলীর সাথে মিলে সাঁওতালদের শোষণের ফন্দি আঁটে। কিন্তু সাঁওতালরা যখন দেখে যে, হাতেম ও গদাইয়ের লোকজন তাদের না জানিয়ে তাদের ঘামে ফলানো ফসল কেটে নিয়ে যাচ্ছে তখন তারা ফেটে পড়ে বিদ্রোহে। সাঁওতাল যুবক আলফ্রেড সরেনের নেতৃত্বে হাতেম ও গদাইয়ের সাঙ্গপাঙ্গদের সাথে তাদের লড়াই বাঁধে। কিন্তু সাঁওতালদের সম্বল বলতে কিছু তীর-ধনুক। এই সামান্য তীর-ধনুক দিয়ে তারা ভাড়া করা গুন্ডা বাহিনীর সাথে পেরে ওঠে না। লড়াইয়ে করুণ পরাজয় ঘটে সাঁওতালদের। নিহত হয় তাদের নেতা আলফ্রেড সরেন।
রাঢ়াঙ নাটকের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো—এটি একটি সেটবিহীন নাটক। নাটকের সেট বলতে একটি মাত্র টুল। কোনোপ্রকার সেটের সহায়তা না নিয়ে নাটকটিকে এত সুন্দর করে মঞ্চায়নের ক্ষেত্রে নির্দেশক মামুনুর রশীদ বিশেষ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। নাটকে সেট না থাকার কারণে প্রত্যেক শিল্পীর ভালো অভিনয় করাটা ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নাটকের শিল্পীরা সে চ্যালেঞ্জ সফলভাবেই উতরে গিয়েছে। এছাড়া নাটকটির একটি মূল বৈশিষ্ট্য হলো এর সংগীত ও কোরিওগ্রাফি। সাঁওতালদের নিজস্ব নাচ ও গানগুলো উপস্থাপিত হয়েছে একেবারে জীবন্তভাবে। মুগ্ধ করেছে দর্শকদের।
এ অঞ্চলের আদিবাসীদের ভূমির অধিকারের লড়াইয়ে সাঁওতালদের অবদান একটি কিংবদন্তিসম উপাখ্যান। ভারত বিভক্তির পর ইলা মিত্রের নেতৃত্বে নাচোলের কৃষক আন্দোলনে সাঁওতালদের ভূমিকা আজও সংগ্রামী কৃষক ও আদিবাসীদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে এক অনুসরণীয় আলোকবর্তিকা। ভারতীয় উপমহাদেশে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সাঁওতালরাই প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধে রুখে দাঁড়ায়। ১৭৮৪ সালে হাজারীবাগ জেলার কালেক্টর ক্লিভল্যান্ডকে হত্যার মাধ্যমে এই প্রতিরোধের সূত্রপাত। তারপর ১৮৫৫ সালে সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরবের নেতৃত্বে ঘটে সাঁওতাল বিদ্রোহ। যা ছিল এক ঐতিহাসিক প্রতিরোধ। এই বিদ্রোহের প্রভাবেই পরবর্তীতে ১৮৫৭ সালে সংঘটিত হয় সিপাহী বিদ্রোহ।
সর্বশেষ ২০০০ সালে বাংলাদেশের নওগাঁয় সাঁওতাল যুবক আলফ্রেড সরেনের নেতৃত্বে সাঁওতালরা জেগে ওঠে ভূমির লড়াইয়ে। এ লড়াইয়ের শেষ পরিণতি ঘটে আলফ্রেড সরেনের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে। সাঁওতালদের এই সংগ্রামের বিশাল ইতিহাসকে মঞ্চে দর্শকদের সামনে তুলে ধরার প্রয়াসই রাঢ়াঙ।