লিডিয়া ডেভিসের গল্প

তুমি চলে গেলে

তুমি সব জানতে চেয়েছিলে। আমরা আলাদা হওয়ার পর কী কী ঘটল। আমার অবশ্যই খারাপ লেগেছিল। আবার ভালোও লেগেছিল। আমি ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে তোমার চলে যাওয়া দেখলাম। কেবল এটুকুই। তুমি তখন ট্রেনের ভেতরে। যতক্ষণ পর্যন্ত আওয়াজ শোনা যায়, দেখা যায়, আমি তাকিয়ে থাকি। তোমার ট্রেনের উল্টোপাশে, রোয়েনের আকাশে তখন লাল আর বেগুনি রঙের খেলা। আমি যখন রোয়েনে পৌঁছালাম আর তুমি প্যারিসে তখন আকাশে গাঢ় অন্ধকার। আমার খুব ক্লান্ত ও হাত-পা অবশ লাগছিল। রাস্তার ওপারের ক্যাফেতে ঢুকে একটা কিশ ড্রিঙ্ক নিই। আমার ট্রেন চলে আসে যার গন্তব্য তোমার উল্টোদিকে। ট্রেনের বগিতে আমার স্কুলের এক বন্ধুর সাথে দেখা হলো। রোয়েনে পৌঁছানো পর্যন্ত আমরা অনেকক্ষণ ধরে আলাপ করি। কথা অনুযায়ী লুইস আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। কিন্তু মা আমাকে নেওয়ার জন্য কোনো গাড়ি পাঠায়নি। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে চাঁদের আলোয় হাঁটতে হাঁটতে ব্রিজ এবং বন্দর পার হই। সেখানে ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া নেওয়ার জায়গা ছিল দুটো। দ্বিতীয় জায়গাটিতে, অধিবাসীরা একটি পুরোনো গির্জায় থাকে। জায়গাটি অন্ধকারাচ্ছন্ন, আমরা দরজায় নক করতে একজন মহিলা বেরিয়ে আসে। মাথায় তার নাইটক্যাপ। দৃশ্যটা একবার ভাবো, একে তো মধ্যরাত তার ওপর মোমবাতি হাতে দাঁড়ানো এক মহিলা। তার গায়ের চাদরটা বেশ বড়। গাড়িতে নিশ্চয়ই ঘোড়া সাজানো থাকবে, কিন্তু না, গাড়ি টানার দড়ি ছিঁড়ে গেছে। আমরা আরেকটা দড়ি লাগানো পর্যন্ত অপেক্ষা করি। বাড়ি ফেরার পথে, আমি লুইসকে আমার স্কুল বন্ধুর কথা বলি। সে তারও বন্ধু। লুইসের সাথে কাটানো পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে গেল। বাইরে তখন নদীর ওপর জোছনার আলো। বহু বছর আগে এমনই এক চাঁদের আলোতে আমরা বাড়ি ফিরছিলাম। আমার মনে পড়ে, জায়গাটা তখন পুরু বরফে ঢাকা ছিল। আমি আমার ফারকোট আর উলের লাল টুপি পরে স্লেজে উঠি। আফ্রিকার জীবজন্তুর প্রদর্শনী দেখে ফেরার পথে আমার বুট হারিয়ে যায়। আমি সিগারেট টানছিলাম। সব জানালা তখন খোলা। নদীটি অন্ধকারাচ্ছন্ন, গাছগুলোও। তুষারের ওপর চাঁদের আলো শাটিনের মতো মসৃণ। তুষারে ঢাকা বাড়িগুলো শ্বেত ভালুকের বাচ্চার মতো গুটিসুটি হয়ে শুয়ে আছে। আমার মনে হলো, আমি রাশিয়ান পাহাড়ের ঢালে আছি। যেন কুয়াশার মধ্যে ঘুমন্ত বুনো হরিণের নাক ডাকা শুনতে পেলাম। একদল নেকড়ে যেন লাফিয়ে লাফিয়ে আসছে। তাদের চোখগুলো রাস্তার দুপাশের জ্বলন্ত কয়লার মতো জ্বলজ্বল করছে। যখন আমরা বাড়ি পৌঁছালাম তখন রাত একটা। আমি ঘুমাতে যাওয়ার আগে আমার টেবিলটি গোছালাম। আমার পড়ার ঘরে জানালার বাইরে তখন চাঁদের আলো। চাঁদের আলো পানির ওপর, বাড়ির পাশে টিউলিপ গাছটির ওপর এবং পথের দুইপাশে। কাজ শেষে লুইস তার ঘরে আর আমি আমার ঘরে চলে আসি। [লিডিয়া ডেভিস আমেরিকান লেখক। তিনি ১৯৪৭ সালে মেসাচুসেটস-এ জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি নিউ ইয়র্কের আলবেনি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত। তাঁর কাজগুলোকে দর্শন, গল্প বা কবিতা হিসেবে অভিহিত করা যায়। কারণ তাঁর রচনার দৈর্ঘ্য দুই-তিন পৃষ্ঠার বেশি হয় না। সমপ্রতি তিনি বুকার পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।]