পঞ্চাশ থেকে প্রথম দশক
প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০১৩, ১৯:০৭
নান্দী পাঠ
সংখ্যা : ৫
প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১৩
সম্পাদক : সাজ্জাদ আরেফিন
মূল্য : চারশ টাকা
কথাসাহিত্যে বাংলাদেশের অনুজ্জ্বল উপস্থিতি অনেকটা সময় দেখা গেছে। সেই ঘাটতি অনেকটাই পূরণ করতে পেরেছেন প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। হুমায়ূন আহমেদ-এর সৃষ্ট হিমু চরিত্রটি এখনো আমাদের তরুণ প্রজন্মের কাছে একটি আদর্শ। কিন্তু সমালোচনা সাহিত্যে আমাদের সাহিত্যসেবীদের অনাগ্রহ বরাবরই লক্ষ করার মতো। কোনো কবির নতুন বই প্রকাশিত হলে, তার সমসাময়িক অন্য কবি বন্ধু তা নিয়ে আলোচনা করতে চান না। অথচ তিনি নিজেই আশা করেন—বন্ধুরা তার বইটি নিয়ে আলোচনা করুক। আর তাই কথিত আছে, আবদুল মান্নান সৈয়দ এক তরুণ কবির কাছে দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘আমি আগাগোড়া কবি হতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমার বন্ধুরা আমাকে সমালোচক বানালো।’ এ কারণে বাংলাদেশে আবদুল মান্নান সৈয়দের পর তেমন কোনো সমালোচক দেখা যায়নি। আর তাই সাহিত্যের বিচার-বিশ্লেষণ অনেকটাই অস্পষ্ট। সমালোচনা সাহিত্যের প্রতি অনীহার কারণে কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে যথার্থ সমালোচনা আজ দুর্লভ হয়ে পড়েছে। অথচ একটি দেশের সাহিত্যকে বুঝতে হলে, থাকতে হবে যথেষ্ট সাহিত্য-সমালোচনা। ১৯৪০-২০১০ পর্যন্ত তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো সমালোচনা সংকলন চোখে পড়েনি। ছোটকাগজ সম্পাদকদেরও এ বিষয়ে উদ্যোগের অভাব রয়েছে। সমালোচনা সাহিত্যের এই খরার দিনে সাজ্জাদ আরেফিন নিয়ে এসেছেন তার ছোটকাগজ ‘নান্দী পাঠ’। এর একটি অংশে তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের বিভিন্ন দশকের কবিদের কাব্যসমালোচনা ও দশকওয়ারি কবিতার বিশ্লেষণ। এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। ঢাউস আকৃতির নান্দী পাঠ-এর এ সংখ্যায় অনেক কবির সমালোচনা আমরা দেখতে পাই। আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, সিকদার আমিনুল হক, আবদুল মান্নান সৈয়দ, মিনার মনসুর, নাসির আহমেদ, মহীবুল আজিজ, মাসুদুল হক, ওবায়েদ আকাশসহ আরও অনেকেই লিখেছেন এ সংখ্যায়। সবচেয়ে বিশ্লেষণধর্মী কয়েকটি প্রবন্ধের নাম উল্লেখ না করলেই নয়। যেমন—পঞ্চাশের দশক নিয়ে আবদুল মান্নান সৈয়দ বলেন, ‘আবুল হোসেনের মাধ্যমে অমিয় চক্রবর্তী, ফররুখ আহমদের মাধ্যমে জীবনানন্দ দাশ, আহসান হাবীবের মাধ্যমে প্রেমেন্দ্র মিত্র এবং সানাউল হকের মাধ্যমে বিষ্ণু দে বাংলাদেশের কবিতায় প্রবেশ করেছে’ তা কজন পাঠক বা কবি জানে? একইভাবে ষাটের কবিদের আলোচনায় সিকদার আমিনুল হকের যে দর্শনচিন্তা মিনার মনসুর তুলে ধরেছেন—তা নবীন পাঠকের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে। তিনি প্রমাণ করেছেন কীভাবে মৃত্যুচিন্তা ও প্রেমকে সাধারণ যুক্তিতে সাজিয়ে দার্শনিক সত্যরূপে প্রকাশ করা যায়। তাঁর এ আলোচনা না পড়লে বোঝা যায় না, কবি রফিক আজাদ প্রতিবাদী হলেও ‘বহিরঙ্গে নাগরিক, অন্তরঙ্গে অতৃপ্ত কৃষক’। আমরা হয়তো জানতেও পারতাম না খনার বচন বা প্রাচীন শ্লোকের পুনরুজ্জীবন ঘটে যাঁর হাতে, সেই ‘শাশ্বত বাংলার বাঁশি’ আসাদ চৌধুরীর কাব্যভাষা কেমন? আমরা হয়তো বুঝতেই পারতাম না—মহাদেব সাহা চিরকালীন প্রেমের কবি? সেই সাথে কবি আল মাহমুদ ও সিকদার আমিনুল হকের নব্বইয়ের কবিতা নিয়ে আলোচনা নজর কাড়ার মতো। শুধু যে তরুণরাই তাঁদের পূর্বপুরুষদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা করবেন, তা নয়—এ সংখ্যায় বড় বড় কবিদের তীক্ষ কাব্য-সমালোচনা সংযোজন পাঠককে সহজেই আকর্ষণ করবে। এ সংকলন আমাদের জানিয়ে দেয়, প্রকৃত কবি কে, কার কাব্যভাষা কালান্তরেও বাংলা ভাষায় টিকে থাকবে। এ সংকলনের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি, সত্তরের প্রতিবাদী অগ্নিমূর্তি মাত্র দুজন—একজন রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ আর অপরজন মিনার মনসুর। ঠিক তেমনি আশি, নব্বই ও প্রথম দশকের প্রতিনিধিত্বিশীল কবিদের কাব্য সমালোচনা সন্নিবেশিত হয়েছে এ সংখ্যায়, যদিও এর অধিকাংশই পুনর্মুদ্রিত। কিন্তু এক মলাটে বিভিন্ন দশকের কবির উপস্থিতি সংগ্রহে রাখার মতো।