হজ্ব পালনের স্মৃতিকথা
প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০১৩, ১৯:১৫
২০০৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর থেকে ২০০৭ এর ৫ জানুয়ারি সরকারি প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে সরকারি ব্যবস্থাপনায় আমি এবং নিজ খরচে আমার স্ত্রী আমরা পবিত্র হজ্ব পালন করি। আল্লাহর ঘর তাওয়াফ আর (সেবার) আকবরী হজ্ব পালনার্থে নিয়ত করার পর থেকেই মনের মধ্যে এমন এক তাগিদ অনুভব করি যা ঠিক ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। ২৪ ডিসেম্বর অফিস থেকে দুপুর ২টায় বাসায় ফিরে অনেক আবেগ উত্কণ্ঠায় কাটালাম। শেষ মুহূর্তে গোছগাছ করে গোসল সেরে নিলাম চূড়ান্ত প্রস্ততির জন্য। খুলনা থেকে বড় ভাই এসেছেন। অনেক আত্মীয় স্বজন সবাই এসেছেন বিদায় জানাতে। যিনি যেভাবে জেনেছেন শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, চেয়েছেন দোয়া। অনুরোধ রেখেছেন তাদের সালাম যেন পৌছাই নবীর(স.) রওজায়। অনুজ প্রতীম আবু নসর আব্দুল হাই এসেছিল খুলনা থেকে। আবু নসরের বাবা হাজী ছিলেন—বুজর্গ আলেম ছিলেন। তিনি নাকি নির্দেশনা দিয়েছিলেন যে লোক হজ্বে যাবে তার কাছে নিজে উপস্থিত হয়ে দোয়া চেয়ে আসতে হবে। তার নির্দিষ্ট সময় কাবায় পৌঁছালাম। যেদিন ৮ জিলহজ্ব ১৪২৭ হিজরী (সৌদী আরবের পঞ্জিকা অনুযায়ী;বাংলাদেশে ৬ জিলহজ্ব) ইংরেজী ২৮শে ডিসেম্বর ২০০৬। আমরা মিনাতে এসেছি গতরাত সাড়ে ১১ টায়। মক্কা মোয়াজ্জমা থেকে রাত পৌনে এগারটার দিকে বিশেষ কোচে চাপি । বন্ধুবর ফজলুর রহমান (ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সাবেক ডিজি) নিজে একলা। তিনি তাই গতরাতে আমাদের সাথে আসেন নি। ভোরে কাবায় নামাজ পড়ে সকাল দশটা নাগাদ এলেন এখানে। ঘটনাবহুল ১১টি দিন। অনেক উদ্বেগ উত্কণ্ঠা, পরিশ্রম ও প্রার্থনার মধ্য দিয়ে দ্রুত কেটে গেল। সেবার আকবরী হজ্ব হওয়ায় বৈধ অবৈধ অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বেড়ে যায়। শুক্রবার ৯ই জিলহজ্ব অর্থাত্ আরাফাত দিবস বা হজ্ব দিবস হওয়ায় এবারের হজ্বকে আকবরী হজ্ব বা সেরা হজ্ব হলা হচ্ছে। ১৬ বছর পর সেবার আকবরী হজ্ব হল। আরাফাতে খোতবা দেয়ার সময় অন্ধ মুফতি জানালেন হযরত আদম ও বিবি হাওয়ার এ ময়দানে মিলন হয়েছিল শুক্রবারেও, বড় বড় নবীদের সফর হয়েছিল শুক্রবারে, মহানবী (স.) এর বিদায় হজ্বের ভাষণ ছিল এই শুক্রবারে। শুক্রবারে হজ্ব তাই আকবরী হজ্ব। প্রচুর জনসমাগম হওয়ায় মক্কায় কাবা শরীফ তাওয়াফে, সাঈতে, আরাফাতে, মুজদালিফায় ও জামারাতে কংকর নিক্ষেপের ক্ষেত্রে প্রচণ্ড চাপের সৃষ্টি হয়। ট্রাফিক জ্যাম অসহনীয় হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি হারেম শরীফে ওয়াক্তিয় নামাজ জামাতে পড়ার ক্ষেত্রেও হয় ব্যাপক বিস্তারের বিষয়। হজ্ব মিশন থেকে কাবা শরীফের মসজিদ সোয়া মাইল দূরে হওয়ায় মক্কায় মোট অবস্থানকালে (৪দিন) মোট ২০ ওয়াক্ত নামাজের মধ্যে ৩ ওয়াক্ত মসজিদুল হারামের জামাতের বাইরে স্থানীয় মসজিদে জামাতে পড়তে হয়েছে—দুই ওয়াক্ত কাবার চত্বরে, দুই ওয়াক্ত মসজিদের নীচতলায়, এক ওয়াক্ত ছাদে এবং বাদবাকী ১২ ওয়াক্ত মসজিদের চত্বরে কিংবা মেসফালা পর্যন্ত বিস্তৃত জামাতে রাস্তায় পড়তে হয়েছে। রিয়াজুল জান্নাত বা বেহেশতের টুকরার মধ্যে, মসজিদের দোরগোড়ায় নামাজ পড়ার সুযোগ হয়েছে। মসজিদে নববীর মূল কাঠামোর প্রবেশ পথে ঐ স্থানে নামাজ পড়তে যেয়ে বেশ স্মৃতিকাতর হয়েছি। নবীজি (স.) এ পথ দিয়ে মসজিদে ঢুকতেন-তার কাছাকাছি পৌঁছানোর আনন্দে। প্রতি ওয়াক্তে চেষ্টা করেছি রওজার কাছাকাছি জামাতে শরিক হতে। রওজার দেয়াল ঘেষে(রিয়াজুল জান্নাত এর ভিতর) বসে কুরআন তেলওয়াত, দরূদ পাঠ ও দু’ওয়াক্ত নামাজ পাঠ করার সুযোগ মদিনায় পৌঁছার প্রথম দিন পেয়েছিলাম, পরে পাই নি। মসজিদে নববীতে জামাতে নামাজ পাঠ করে মন ভরে যায়। ইমামের বলিষ্ঠ উচ্চারণে কুরআন তেলওয়াত বিশেষ ভাবে উপভোগ করেছি। নবীজির (স.) রওজায় পৌছে তার রওজাকে ধরে জিয়ারত—স্পর্শ করে, লাইনবদ্ধ হয়ে জিয়ারত করার অযৌক্তিক emotional আয়োজনকে avoid করেছি সচেতনভাবে। নবীজির (স.) রওজা মোবারকে পৌছে লাইনবদ্ধ হয়ে থেকে নয় সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে দু’হাত তুলে দোয়া করেছি—তাকে সালাম জানিয়েছি ও দরূদ পাঠ করেছি—আমাদের জন্য তাঁর শাফায়াতের প্রার্থনা করেছি। তাঁর রুহের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেছি। এ আত্মিক যোগাযোগের প্রয়াস প্রচেষ্টা রওজা শরীফে শারীরিক উপস্থিত হয়ে যেমন সম্ভব এটি সম্ভব সার্বক্ষণিক পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে অবস্থান করেও। নবীজী (স.)-এর কাছে এবার সে ধরণের একটা ইচ্ছা পূরণের প্রার্থনা করে এসেছি। মসজিদে নববী থেকে গতকাল সকালে ফেরার সময় তার আশেকে বিচ্ছেদের বেদনা অনুভব করেছি—আরো কিছুটা সময় থাকার ইচ্ছা বাস্তবায়ন না হওয়ায় মর্মপীড়া বোধ করেছি। বার বার পিছে ফিরে তাকিয়েছি। বিদায়ী তওয়াফের পর কাবাগৃহকে পিছনে ফেলে আসতে বার বার ব্যথিত ও কাতর হয়েছি। এক মায়াবী দৃশ্যের অবতারণা অনুভব করেছি। কালো চাদরে মোড়া বায়তুল্লাহেক হঠাত্ করে প্রিয়তমের প্রতীকে পেয়েছি। আল্লার কাছে এখানে বার বার আসার আর্জি পেশ করেছি। এ এগারো দিনে মনে মনে সারাক্ষণ কিংবা সকল মোনাজাতে নিজের অপরাধের ক্ষমা প্রার্থনা, বেহেশত কামনা, দোজখের থেকে মুক্তি প্রার্থনা, নিজের দুনিয়াদারীতে শৃংখলা, নীতিনির্ভরতা ও ন্যায়পরায়নতায় আল্লাহ ও রসূলের হুকুম আহকাম মেনে চলার আকুতি, হালাল রুজি, দৃঢ়চিত্ত ঈমানে অধিষ্ঠিত হওয়া, সংশয় সন্দেহ শিরক নাফরমানী বর্জিত সাচ্চা ও সজাগ জীবন যাপন, আল্লাহর জিকিরে মশগুল ও মানব কল্যাণে নিবেদিত চিত্ত হওয়ার প্রার্থনা করেছি। দুনিয়াদারীর ইবাদত পরকালের স্থায়ী শান্তি অর্জনের উপায় ও অবলম্বন বিবেচনাকে সামনে এনেছি। পিতামাতা, পিতৃকুল, মাতৃকুল, শ্বশুরকুল, সন্তান সন্ততি নিকটাত্মীয়, শিক্ষক, সহপাঠী, দোস্ত-বন্ধু বান্ধব, প্রতিবেশী, অফিস সহকর্মীদের কথা স্মরণ করে মৃতদের জন্য মাগফেরাতের দোয়া এবং জীবিতদের দীর্ঘজীবি হওয়াসহ সুস্থতা, নেক মাকছুদ পূরণ, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার, অসুস্থতা থেকে নিষ্কৃতির জন্য মোনাজাত করেছি। অনেকে দোয়া চেয়েছিলেন, অনেকে সালাম পৌছাতে বলেছিলেন, অনেকে বলেছিলেন তারা যেন হজ্বে আসতে পারেন সে মর্মে দোয়া করতে বলেছিলেন—যখন যারটা মনে হয়েছে তাদেরটা বলেছি—সকলের জন্য বলেছি—যারা বলেননি তাদের জন্য দোয়া করেছি। যারা একসময় কোন না কোন ভাবে আমার উপকার করেছেন তাদের কথা মক্কায় মিনায় কিংবা মদীনায় মনে হয়েছে। উপকার করতে হবে নিঃস্বার্থে প্রতিদান আসবে আসবেই। এভাবে মানবতাকে উপকারের বন্ধনে বাঁধার উপায়। আরাফাত ময়দানে দোয়া কবুল হবার উত্তম সহান। সংগোপনে দাঁড়িয়ে প্রাণ খুলে দোয়া করলাম আল্লাহর দরবারে। মহান রাব্বুল আলামীনের শানে। এ জীবন যেন চলে আমৃত্যুকাল সিরাতুল মুস্তাকিমের সহজ-সরল ও আলোকিত সোজা পথে।
লেখক :সরকারের সাবেক সচিব এবং এন বি আরের চেয়ারম্যান