প্রবীণদের প্রতি কর্তব্য অপরিসীম
প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০১৩, ১৯:১৬
ইংরেজিতে প্রবীণদের বলা হয় Senior citizen , প্রতি বছর ০১ অক্টোবর পালিত হয় ‘বিশ্ব প্রবীণ দিবস’। অথচ আমাদের প্রবীণগণ সে্রফ ‘বুড়া-বুড়ি’ হিসেবে চিহ্নিত। সাম্প্রতিক আই,এম ,এফের রিপোর্টে পাওয়া যায় ; মানুষের গড় আয়ু তিন বছর বেড়ে গেছে। ২০৫০ এর মধ্যে প্রতি একজন কর্মক্ষমের বিপরীতে একজন বৃদ্ধ থাকবেন অগ্রসর দেশগুলোতে। যাতে জি.ডি.পির দু’শতাংশ অতিরিক্ত সম্পদের প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশে ষাট বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় এক কোটি যা মোট জনসংখ্যার প্রায় সাত শতাংশ। এ সংখ্যা ২০৫০ এ হবে চার কোটি বা বেশি। আর এদের মধ্যে অনেকেই হলেন মহিলা তথা জননী— “যার পদতলে স্বর্গোদ্যান”। কিন্তু এ সব জননীকূলের অনেকের অবস্থা খুবই অসহায়—এরাই অনেকে ‘সন্তান পরিত্যক্তা জননী’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সের অধ্যাপক ড.এ.কে.এম নুরুন্নবী (ভিসি-বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় রংপুর) এক গবেষণায় দেখিয়েছেন বাংলাদেশের প্রবীণদের মধ্যে ৮৮.৪% মানসিক ৮৩.৩% অবহেলা ৫৪.৫% দৈহিকসহ নানান নির্যাতনের শিকার হন, এ ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় নারীরাই বেশি অপদস্থ হচ্ছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর প্রজন্মটি এখনই পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনীতিতে চাপ ফেলা শুরু করেছে। অন্যদিকে যৌথ পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় বয়স্ক ও শিশুরা। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে নগরায়ন ও বহুমুখী কর্ম ব্যস্ততায় আমাদের মধ্যেও চিরচেনা পারস্পরিক দায়বদ্ধতা লোপ পাচ্ছে। মা-বাবা তথা প্রিয়জনের প্রতি টানও কমে যাচ্ছে বস্তু-বৈষয়িক হিসেব-নিকাশ ও ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ আর মান-অভিমানে। তাই শোনা যায় এক নিরব হাহাকার। তবে এর সমাধানে ইসলামি দর্শনই যথার্থ। কেননা , আল্লাহ্র নির্দেশ “পিতা মাতার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে। তোমাদের সামনে তাদের একজন বা উভয়েই যদি বার্ধক্যে উপনীত হন , তবে তাদের প্রতি ‘উহ্’ ! শব্দটি উচ্চারণ করবে না। তাদের সঙ্গে কর্কশ ভাষায় কথা বলবে না। তাদের প্রতি দয়া পরবশ হয়ে বিনয়ের বাহু প্রসারিত করে দেবে। আর তাদের সম্পর্কে বলবে: হে প্রভু ; তাদের ওপর সদয় হোন। যেমন শিশুকালে তারা আমাদের প্রতি সদয় ছিলেন ” (বাণী ইসরাইল:২৩,২৪)। আল্লাহ্ বলেন “ মা সন্তানকে কষ্টের ওপর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করেছেন। সুতরাং সে যেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে” (লোকমান: ১৪)। বৃদ্ধ ও অসুস্থ পিতা মাতার সেবা-সন্তুষ্টির মাধ্যমে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি পাওয়া যায়। প্রিয়নবী (স.) বলেন “পিতা মাতার সন্তুষ্টিই আল্লাহ্র সন্তুষ্টি..” (তিরমিযি)। মানুষের পারষ্পরিক দায়িত্ব একটি আমানত ও এটাই ইসলামের দর্শন। এ জন্যই প্রিয়নবী (স.) বলেন “যে প্রবীণদের সম্মান করে না, সে আমার দলভূক্ত (উম্মত) নয়” (আবুদাউদ)। বয়স্কদের প্রতি সম্মানের তাত্পর্য প্রসঙ্গে প্রিয়নবী (স.) বলেন “যে ব্যক্তি কোন বৃদ্ধকে তার বয়সের কারণে সম্মান করল, আল্লাহ্ও অন্যের দ্বারা তার সম্মান করাবেন” (আবুদাউদ)। এক সময় জীবন-যৌবন লুটিয়ে যারা সন্তানের ভবিষ্যত গড়েছিলেন আজ অনেকেই তারা ‘নিদানে’র কালে বড়ই একা ও অপাঙক্তেয়। অথচ সচল-সুস্থ আমরা সব কিছু সময় মতো বুঝি না। এক সময় যে প্রিয় স্বজন বা পিতা মাতার প্রার্থনা ছিল আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামিনের দরবারে —‘রাব্বানা হাবলানা মিন্ আজওয়াজিনা ওয়া জুররিইয়াতিনা কুররাতা আইনিউ ওয়াজাআল্না লিল্ মুত্তাকিনা ইমামা’ অর্থাত্ —“ হে প্রভু ! দাও যে এমন স্ত্রী-সন্তান (পরিজন) ওদের সবাই যেন—শীতল করে , শুধুই মোদের নয়ন ”(ফুরকান:৭৪)। অথচ আজ ‘প্রীতি প্রেমের পূণ্য বাঁধনে’র চিরায়ত ভাবনা বদলে তৈরি হচ্ছে ‘বৃদ্ধাশ্রম’ ! ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে ‘স্বর্গীয়’ সুখের ধারণা । যেন ঐ বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে পারলেই সব দায়-দায়িত্ব থেকে মুক্তি ! আর সবার কাছ থেকে একা হয়ে ঐসব প্রবীণগণ যখন এক আল্লাহ্র সান্নিধ্যের অপেক্ষায় থেকে থেকে নিরব অভিমানে চলে যান তখনো তবুও কারো কারো বোধোদয় হয় না। প্রবীণদের প্রতি মানসিকতার চরম স্খলন ও অবক্ষয় ‘বৃদ্ধাশ্রম’ আমাদের সংস্কৃতির অংশ নয়। অন্যদিকে প্রবীণদের প্রত্যাশা থাকে জীবনের শেষদিন গুলো কাটুক সন্তান-স্বজন স্বীকৃত ও পরিবেষ্টিত নিরাপদ আশ্রয়ে । কিন্তু হায় আপসোস —“ছেলে আমার মস্ত মানুষ মস্ত অফিসার, মস্ত ফ্ল্যাটে যায় না দেখা এপার-ওপার ! নানা রকম জিনিস আর আসবাব দামিদামি , সবচেয়ে কম দামি ছিলাম একমাত্র আমি !! ছেলে আমার , আমার প্রতি অগাধ সম্ভ্রম, আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম ”!!! (নচিকেতা)
লেখক : কলেজে ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ে অধ্যাপনারত