ট্রাইব্যুনালের সকল রায়ই প্রশ্নবিদ্ধ
প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০১৩, ২২:৪৫
একাত্তরে মানবতা বিরোধী অপরাধে ট্রাইব্যুনাল ঘোষিত সকল রায় ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি নেতারা। তারা বলেছেন, বিচারকাজ নিয়ে বাইরের লোকজনের সঙ্গে বিচারপতিদের স্কাইপি আলোচনা এবং আদালতে রায় ঘোষণার আগেই তা প্রকাশ হয়ে যাওয়াসহ সরকারের লোকজনের বিভিন্ন বক্তব্য-মন্তব্য এসব রায়কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ‘অন্ধ’ থাকতে পারে না। সর্বোচ্চ আদালতের উচিত এই বিষয়গুলো আমলে নিয়ে রায় পুনর্বিবেচনা করা। বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ কারো রায় কার্যকর না করার দাবি জানান তারা।
‘রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার এবং সুপরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রীয় সকল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের সরকারি অপচেষ্টার’ প্রতিবাদে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢাকা মহানগর বিএনপি আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে দলটির নেতারা এই অভিযোগ করেন।
সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বলেন, আমি ৫৩ বছর ধরে আদালতের আঙ্গিনায় ঘুরছি, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে দেয়া এই রায় চূড়ান্ত নয়। যেহেতু আদালতে ঘোষণার আগেই রায়টি ফাঁস হয়ে গেছে, সে কারণে এই রায় ত্রুটিপূর্ণ। আপিল বিভাগ নিশ্চয়ই চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে না। সর্বোচ্চ আদালত কোনো ফাঁদে পা না দিয়ে এসব বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখবে। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে যখন অপরাধ সংঘটনের কথা বলা হচ্ছে, তার সাফাই সাক্ষীরা বলেছেন-ওই সময় তিনি দেশেই ছিলেন না। তাহলে যারা বলেছেন একাত্তরে তিনি মানুষ হত্যা করেছেন, বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছেন তা আপিল বিভাগ গ্রহণ করবে কিভাবে? তাছাড়া হাইকোর্টের একজন বিচারপতি সাক্ষ্য দিতে পারেননি। আপিল বিভাগে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে এ দুটি বড় গ্রাউন্ড রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমরা বুঝতে পেরেছি, এই রায় তৈরি করে দেয়া হয়েছে। তাই এই রায় মেনে নেয়া যায় না।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, এ সরকারের গত পাঁচ বছরের শাসনামলে অনেক কিছু দেখলাম। এবার তারা সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে। রায় ঘোষণার আগেই তা প্রকাশ হয়ে গেছে। ট্রাইব্যুনালও এটা স্বীকার করেছে, রেজিস্ট্রার থানায় জিডি করেছেন। সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে এবং এখানকার আইনি প্রক্রিয়াকে এভাবে অবমূল্যায়ন করবেন না।
মওদুদ বলেন, বিরোধী দলকে নির্যাতন ও দমন করা এই সরকার এক নম্বর এজেন্ডা হিসাবে নিয়েছে। তবে সরকার যতোই চেষ্টা কিংবা কৌশল করুক না কেন, এক পর্যায়ে নির্দলীয় সরকারের দাবি মেনে নিতে তারা বাধ্য হবে। দেশে নির্বাচনও হবে, নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই এবং নির্দলীয় সরকারের অধীনেই সেই নির্বাচন হবে। আর সেই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও শান্তি ফিরে আসবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেন, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে দেয়া রায়টি আইন মন্ত্রণালয়ের। ঘোষণার আগেই হাইকোর্টের রায় প্রকাশ হয়-এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে নেই। প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, রায়টি কার? ট্রাইব্যুনাল ছাড়া অন্য কারো রায় তৈরির সুযোগ নেই। এই বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর রায় কার্যকরেরও কোনো সুযোগ নেই। সঠিক বিচার করতে হলে আগে রায় প্রকাশের অভিযোগে আইনমন্ত্রীর বিচার করতে হবে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা বারবার বলছি, বিএনপি সবসময়ই প্রকৃত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়। তবে সেই বিচার হতে হবে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানের। রাজনৈতিক উদ্দেশে এটিকে ব্যবহার করা যাবে না। অথচ এই বিচারের মান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল পর্যন্ত আজ প্রশ্ন তুলছে। অবাক বিস্ময়ে তারা তাকিয়ে দেখছে, বিচারের নামে এখানে কী হচ্ছে! যাবজ্জীবন দণ্ড হওয়ার পর আইন পরিবর্তন করে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া হল। রায় ঘোষণার আগেই তা আইন মন্ত্রণালয় থেকে ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। তাহলে ন্যায়বিচার কিংবা আইনের শাসন বলতে কী কিছু আছে!
ফখরুল বলেন, আমরা ন্যায়বিচার চাই। রাজনৈতিক উদ্দেশে কাউকে শাস্তি দেয়া জনগণ মেনে নিতে পারে না। একথা আজ স্পষ্ট যে-এ সরকার যতদিন ক্ষমতায় থাকবে ততদিন মানুষ ন্যায়বিচার পাবে না, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল নাম দেয়া হলেও এর বিচার আন্তর্জাতিক মানের নয়, সব রায়ই প্রশ্নবিদ্ধ। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার বলেই তাকে এমন শাস্তি দেয়া হচ্ছে। তবে ত্রুটিপূর্ণ রায় কার্যকর করা হলে এ সরকার খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত হবে। সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে নগর বিএনপির আহ্বায়ক সাদেক হোসেন খোকা বলেন, আগে রায় প্রকাশের দায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত। সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পত্নী ফারহাত কাদের চৌধুরী, বিএনপি নেতা শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, সালাহউদ্দিন আহমেদ, আব্দুস সালাম ও সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল প্রমুখ।