শিক্ষকের প্রাপ্তি ও বাস্তবতা

জাতীয় শহীদ মিনার অঙ্গনে সমবেত মানুষ গড়ার কারিগরদের ‘রাসায়নিক যৌগ’ প্রয়োগে যখন দমন করা হয় তখন মনে মনে ধন্যবাদ জানাই কবি কাদের নওয়াজকে! মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সমবেত হওয়া সব পেশাজীবীরই মৌলিক অধিকার। কিন্তু টিকে থাকা ও নিজেকে মেলে ধরবার সংগ্রামে ক্লান্ত মানুষ গড়ার কারিগরদের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গ্লানিকর; তখন নিজের ভাগ্যদশার সান্ত্বনা খুঁজি—‘শিক্ষক আমি শ্রেষ্ঠ সবার’। যে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা যত উন্নত সে দেশকে তত উন্নত ও নিরাপদ বিবেচনা করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে শিক্ষার যত্সামান্য উন্নয়ন হলেও উন্নতি হয়নি শিক্ষকদের। ফলে বর্তমানে শিক্ষকতা একটি নির্মোহ পেশা ও বঞ্চনার পরিভাষা। আবার অভিন্ন সিলেবাসে পাঠদানকারী শিক্ষকদের ৯০ ভাগ বেসরকারি শিক্ষক বা ‘বেদরকারি শিক্ষক’! যাদের সঙ্গে সরকারিদের পার্থক্য পর্বতপ্রমাণ। বিশেষত সরকারি কলেজে কর্মরতগণের চাকরি নিরাপত্তা, জাতীয় স্কেলে পূর্ণ আর্থিক সুবিধাদি ছাড়াও পদোন্নতির ক্রমধারায় শিক্ষাপ্রশাসনের চরম শিখরে উত্তীর্ণ হওয়াসহ আমলাতন্ত্রের শীর্ষপদ (সচিব) অলংকৃত করবার সুযোগ রয়েছে। পক্ষান্তরে বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় পদমর্যাদা অনুযায়ী সুযোগ-সম্মানীর দাবি উপেক্ষিত। প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন পদের সবাই একই পরিমাণ বাড়িভাড়া পান। তাঁরা বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল ও উত্সব ভাতা পান না। তাঁরা পদোন্নতি, স্বেচ্ছা অবসর ও বদলি সুবিধাসহ অসংখ্য বঞ্চনার শিকার। এমনকি প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদায়নে অনুপাত নামক কালো আইনের কারণে অধিকাংশর পথচলা দুর্ভাগ্যের কাদায় আটকে আছে ! কলেজে অধ্যাপনারতদের সসম্মানে ‘অধ্যাপক’ বলা হলেও তাদের জন্য ‘সহকারী’ পর্যন্ত যাওয়ার সামান্য সুযোগ থাকলেও নেই আইনগতভাবে ‘সহযোগী’ বা ‘অধ্যাপক’ হওয়ার অধিকার! তাদের জন্য কোনো গবেষণা কাজ, প্রশিক্ষণ বা উচ্চতর ডিগ্রি লাভের প্রক্রিয়াও নেই !!! সম্প্রতি মানুষ গড়ার কারিগরদের বাড়িভাড়া পাঁচগুণ ও চিকিত্সাভাতা দ্বিগুণ করা হলেও তা নিতান্তই অপ্রতুল ও হাস্যকর। এ যেন ‘রবীন্দ্র-দর্শনে’র সার্থক উপলব্ধি— রাশি রাশি মিল করিতেছ জড়ো রচিতে পুথি বসি বড় বড় মাথার ওপর বাড়ি পরো পরো— তাহার খোঁজ রাখ কি...? আশার কথা—প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা এক যুগান্তকারী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু নানান বঞ্চনায় নিমজ্জিত সাধারণ শিক্ষক সমাজ কবে তাদের বাঁচার ন্যূনতম সুযোগ পেয়ে উত্সবে হেসে উঠবে? বিনাচিকিত্সায় ধুঁকবে না? মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুর জন্য অস্থির হবে না? ‘প্রভাষক’ নামক একই পদে বিশ-পঁচিশ বছর থেকেও কি একেকজন ‘বয়োবৃদ্ধ প্রভাষক’ হিসেবেই কবরে যাবেন? স্কুল-মাদ্রাসা শিক্ষক ও কর্মচারীদের বহু বৈষম্য-বঞ্চনার কি কোনো সমাধান নেই? নন এমপিওগণের ভাগ্যেই বা কী আছে? পেশাগত দাবিতে শিক্ষকদের মলিন জীবনে ত্যাগ, সংগ্রাম ও মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘতর হোক তা কাম্য নয়। মানব সম্পদ উন্নয়নে শিক্ষার উন্নয়নের বিকল্প নেই। ‘শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড’। মেরুদণ্ড যেমন শরীরের পেছনে থাকে তেমনি আমরা শিক্ষক সমাজও জাতির সবচেয়ে পেছনেই রয়ে গেছি! অথচ শিক্ষকের জীবনমানের উন্নতি ছাড়া শিক্ষার উন্নয়ন সম্ভব নয়। সারাদেশের গ্রাম-গঞ্জের বঞ্চিত, অবহেলিত শিক্ষক সমাজ ‘শিক্ষা জাতীয়করণে’র আওয়াজে ঐক্যবদ্ধ হলেও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দলীয় লেজুড়বৃত্তির কারণে তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। পূর্ণাঙ্গ উত্সবভাতা ও মেডিকেল সুবিধা, অমানবিক অনুপাত প্রথার গ্যারাকলে আটকে থাকা বিশ-পঁচিশ বছর যাঁরা ‘প্রভাষক’ নামের একই পদে থেকে জীবন-যৌবন হারিয়েছেন সঙ্গে চরম আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন তাদেরকে জরুরিভিত্তিতে ‘সম্মান সূচক’ পদোন্নতি দেওয়া , অন্তত ৩০% বাড়িভাড়া এবং পর্যায়ক্রমে ‘শিক্ষা জাতীয়করণে’র ঘোষণার মাধ্যমে মানুষ গড়ার কারিগরদের কষ্টের হাহাকার প্রশমন করা সম্ভব। শিক্ষক সমাজ দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্ব গতিতে নাকাল। অত্যন্ত সীমিত আয়ের এ মানুষগুলোর জীবন দারুণ কায়ক্লেশে স্থবির ও অস্থির। তাই তাদেরকে ৫০% মহার্ঘভাতা প্রদান করা জরুরি। গাজীপুর