প্রসঙ্গ:ডাণ্ডাবেড়ি

কারাবন্দি আসামিদের পায়ে ডাণ্ডাবেড়ি পরানোর ক্ষেত্রে কোনো নিয়মের তোয়াক্কা করছেন না কারা কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ। ব্রিটিশ আমলে প্রণীত জেলকোড অনুযায়ী যে কোনো আসামির পায়ে ডাণ্ডাবেড়ি পরানো হয়। তবে জেলকোডের সেই বিধি-বিধান যথাযথ অনুসরণ করা হচ্ছে না। ইচ্ছামতো চলছে ডাণ্ডাবেড়ির অপব্যবহার কারাগার ও কারাগারের বাইরে। অন্যের সাহায্য ছাড়া চলতে পারে না এমন গুরুতর অসুস্থ কারাবন্দিদের পায়েও ডাণ্ডাবেড়ি পরানো হচ্ছে। এতে পদে পদে লঙ্ঘিত হচ্ছে বন্দি আসামিদের মানবাধিকার। কারাগার পরিচালনার জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৮৬৪ সালে জেলকোড প্রণয়ন করে। এখনও কারাগার চলছে সেই জেলকোডের বিধি-বিধান অনুযায়ী। কারা অভ্যন্তরে কোনো আসামি শৃঙ্খলা বিঘ্নিত কাজ করলে এর জন্য জেলকোডে দুই ধরনের শাস্তির বিধান আছে—গুরু শাস্তি ও লঘু শাস্তি। শাস্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে সেলে আটক রাখা, শ্রম পরিবর্তন করে কঠিন শ্রম দেওয়া, রেয়াত কমিয়ে দেওয়া, রেয়াত বাতিল, হ্যান্ডকাপ পরানো, পায়ে ডাণ্ডাবেড়ি লাগানো এবং আড়াআড়ি বেড়ি লাগানো ইত্যাদি। এ শাস্তিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পীড়াদায়ক শাস্তি হলো ডাণ্ডাবেড়ি। বর্তমানে তিনটি মামলার আসামি হলেই সংশ্লিষ্ট বন্দীর পায়ে ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে থাকেন জেল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ঐ বন্দী প্রকৃত অর্থেই দুর্ধর্ষ কিনা তা অনেক সময়ই খতিয়ে দেখা হয় না। যে মামলাগুলো আসামির বিরুদ্ধে হয়েছে, তার সত্য-মিথ্যাও খতিয়ে দেখা হয় না। মামলার সংখ্যা তিনটি হলেই কারা কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট আসামিকে কোর্টে হাজিরার সময় এবং এক কারাগার থেকে অন্য কারাগারে স্থানান্তরের সময় নিরাপত্তার জন্য পায়ে ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে দেন। এতে মিথ্যা মামলার শিকার অনেক আসামিকে প্রতিদিন ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে কারাগারের বাইরে আসতে হচ্ছে। আবার যারা দুর্ধর্ষ প্রকৃতির আসামি, টাকা নিয়ে তাদের পায়ে ডাণ্ডাবেড়ি না পরানোর ঘটনাও ঘটছে হরহামেশাই। যেসব আসামি আদালতে হাজির করা হয় তাদের মধ্যে দুর্ধর্ষ প্রকৃতির আসামিদের ডাণ্ডাবেড়ি পরানোর জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানানো হয়। এই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে আসামিদের পরানো হয় ডাণ্ডাবেড়ি। তবে পুলিশ অনুরোধ করেনি তারপরও যদি জেল কর্তৃপক্ষ আসামি পালিয়ে যেতে পারে এই অজুহাতে তাদের পায়ে ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে থাকেন তাহলে এক্ষেত্রে জেলকোড আইন লঙ্ঘন করা হয়। জেলকোডের ৭২০ বিধিতে বলা আছে, কারা অপরাধের জন্য যে কোনো ধরনের বেড়ি আরোপের শাস্তি প্রদানের পর পুনরায় ডাণ্ডাবেড়ি পরাতে হলে মাঝখানে ১০দিন বিরতি দিতে হবে। বিধির ৭২১-এ বলা হয়েছে, সকল প্রকার বেড়ির রং উজ্জ্বল ও ঝকঝকে থাকতে হবে। বন্দীদের ত্বকের ক্ষতি রোধের জন্য নরম চামড়া বা কম্বল বা মোটা কাপড় ব্যবহারের অনুমতি দিতে হবে। এ বিধিগুলো ঠিকমতো মানা হয় না। দেখা গেছে অধিকাংশ ডাণ্ডাবেড়িই মরচে ধরা। যা পরার ফলে সংশ্লিষ্ট বন্দির পায়ে ক্ষত সৃষ্টি হয়ে থাকে। সেই ক্ষত নিয়ে তাদের আদালতে হাজির হতে হয়। এক্ষেত্রেও মানবাধিকার ক্ষুণ্ন হয়ে থাকে। কোনো আসামিকে আদালতে হাজির করার আগে কোর্ট অথরিটি বা পুলিশ তাদের একটি তালিকা কারাগারে পাঠান। ওই তালিকার সঙ্গে কোনো আসামিকে ডাণ্ডাবেড়ি পরার প্রয়োজন হলে পুলিশ একটি চাহিদাপত্র কারা কর্তৃপক্ষের কাছে দেয়। সেই চাহিদাপত্র অনুযায়ী ও আসামিকে ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু পুলিশ হেফাজত থেকে আসামি পালিয়ে গেলে এর দায়ভার বহন করতে হয় পুলিশকেই। তাই উল্লিখিত সমস্যাগুলো বিবেচনা করে ডাণ্ডাবেড়ির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়