বৃহত্তম গণতন্ত্রের আরো এক উত্তরণ

আরশিনগর g বাহার উদ্দিন

বিশ্বের বৃহত্তর গণতন্ত্রের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নির্বাচনের ভোটপর্ব শেষ হচ্ছে আজ, বিকেলে।

১৯৫১ সালের ভোটের মেয়াদ ছিল আরো দীর্ঘ। কারণ, অনুকূল আবহাওয়া আর সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার অগোছালো কাঠামো। সপ্তদশ লোকসভা ভোটে সব দুর্বলতা কাটিয়ে নির্বাচন কমিশন সর্ব অর্থে তার পরিণত চেহারাকে জাহির করলো। পরিপক্ষ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতায় সে এখন বেপরোয়া আর গণতান্ত্রিকতার অতন্দ্র প্রহরী। কাউকেই ছাড় দেয় না। ভয় করে না কোনো হুমকি আর রক্তচক্ষুকে। সামান্য পক্ষপাত নজরে এলেই অফিসার বদলির নির্দেশ, যে কোনো দলের প্রচারক অথবা নেতৃত্বের নামে অভিযোগ পেলেই তড়িঘড়ি খতিয়ে দেখে অভিযুক্তের প্রচারে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা, রাজ্যে রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন, প্রশাসনের ওপর বাড়তি নজরদারি, অতিরিক্ত খরচ ও কালো টাকা উদ্ধারে তীক্ষ নজর, এরকম হরেকরকমের কড়াকড়ি জারি করে কমিশন বুঝিয়ে দিল যে, শুধু লোকসংখ্যার নিরিখেই ভারত দুনিয়ার সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র, তা নয়; ভোটের আচরণবিধি রক্ষায়ও সে এক নম্বর।

টি এন সেশনের আমল থেকেই দফায় দফায় ভোট, কেন্দ্রীয় বাহিনীর ব্যবহার আর কমিশনের প্রশ্নহীন নজরদারি শুরু হয়েছিল। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা আর স্বশাসনের নির্দিষ্ট অভিমুখ গড়ে দিয়েছিলেন ব্যক্তিত্বময় সেশন। এ কারণে, ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন তিনি। তাঁরই আদর্শ, তাঁরই অঙ্কিত পথকে অনুসরণ করে, পরবর্তীকালে ভারতীয় নির্বাচনকে আরো অবাধ করে তুলতে কমিশন সংশয়হীন দৃঢ়তার অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত তৈরি করলো। এবার কী দেখলাম আমরা? সাতদফায় ভোট। ভোটের আগেই আধাসেনার উপস্থিতি, কোথাও কোথাও রুটমার্চ, হিংসা রুখতে কোথাও আবার স্থানীয় পুলিশ আর কেন্দ্রীয় বাহিনীর যৌথ প্রচেষ্টা। এ রকম যাবতীয় সতর্ক, কঠোর ব্যবস্থা অবলম্বন করে কেবল ভোটারদেরই আশ্বস্ত করেনি, প্রকারান্তরে একথাও জানাতে চাইল যে, ভোট মেশিনারির প্রয়োগেও দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের ঊর্ধ্বগতি অপ্রতিহত। ভারত এখানেও বহু দেশের সামনে অনুকরণীয় এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম।

এবারের জাতীয় নির্বাচনের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ আলাদা। প্রচারে, কী সর্বভারতীয়, কী আঞ্চলিক দলগুলোর মুখ্য মুখ এক অথবা দুই। বিজেপি দুনিয়ার সবচেয়ে বড় দল। জনবলে, অর্থবলেও হয়তো। দেশের নানা প্রান্তে চষে বেড়ালেন নরেন্দ্র মোদি, পাশাপাশি অমিতশাহ। শুধু পশ্চিমবঙ্গেই মোদি ১৬টির বেশি সভা করেছেন। তুলনায় গো বলয়ে কম। কংগ্রেসের হয়ে প্রচারের প্রধান মুখ একই পরিবারের দুই সদস্য রাহুল গান্ধী আর প্রিয়াঙ্কা ভদ্রা। বাংলায় তাঁদের সভার সংখ্যা বিজেপির ধারেকাছে নেই। মূল প্রচার গো বলয়ে সীমাবদ্ধ। মমতা রাজ্যের বাইরে, অসমে গেছেন কুল্লে একবার। তিনি যে সর্বভারতীয় তৃণমূলের একচ্ছত্র নেত্রী, তা এই ভোটপর্বেও প্রমাণিত সত্য। তাঁরই ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রার্থী হলেও, রাজ্যের নানা প্রান্তে তাঁর প্রচার সভা ও তেজিয়াল ভাষণ উঁচু করেছে তারুণ্যকে।

উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদ্যনাথকে তাঁর রাজ্যের প্রচারে বিশেষ ভূমিকায় দেখা গেল না। কারণ কী? তাঁর বিতর্কিত ভাবমূর্তি? বিজেপির বিরুদ্ধে জোট গড়েছেন সমাজবাদী পাটির অখিলেশ যাদব আর বহুজন সমাজবাদীর মায়াবতী। দুই দলের যৌথ বা একক প্রচার মূলত অখিল ও মায়াসর্বস্ব। দক্ষিণে তামিলনাড়ুতে স্ট্যালিন আর গগন। অন্ধ্রে চন্দ্রবাবু নাইডু। তেলেঙ্গানায় মুখ্যমন্ত্রী কে সি আর। কর্নাটকে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কোথাও দেবগোড়া, কোথাও মুখ্যমন্ত্রী কুমারস্বামী। মহারাষ্ট্রে শিবসেনা প্রধান উদ্ধব ঠাকুর। কেরলে সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি। গুজরাটে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী। সভা করেছেন দলের সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ, নরেন্দ্র মোদিও; কিন্তু বাংলায় তাঁদের যে উপস্থিতি, যে ঝড়ো প্রচার লক্ষ করলাম আমরা, তুলনায় তা যে কোনো রাজ্যের চেয়ে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক। ঝাঁঝালো। কারণ কী? বিজেপির স্থানীয় নেতৃত্বের দুর্বলতা, সাংগঠনিক অক্ষমতা? না বাংলা দখলের স্বপ্ন? বলা বাহুল্য এই স্বপ্নের প্রধান অন্তরায় মমতার জনপ্রিয়তা আর একক ব্যক্তিত্বের বেনজির গ্রহণযোগ্যতা।

বাংলায় এই মুহূর্তে, জনস্তরে বিজেপি সবচেয়ে বড় বিরোধী দল। সিপিএম ময়দানে আছে, প্রচারেও আছে, সংগঠনেও তাঁদের ক্ষমতা এখনো ব্যাপক; কিন্তু গণচিত্তে তাঁরা বড় বেশি গরহাজির। বাংলায় কংগ্রেসের উপস্থিতি আরো করুণ। যদি দুই-একটি আসনে তাঁরা জেতেন, জিতবেন রাহুলের নামে, কারণ কংগ্রেসের যুবশক্তির একমাত্র ভরসা তাঁর তারুণ্য আর প্রিয়াঙ্কার মোহনীয় আকর্ষণ। রাহুল ক্রমশ পরিণত হয়ে উঠছেন। ভোটের আগে, ভোটের মুহূর্তে তাঁর বিচক্ষণতা বিজেপিকে ভাবিয়ে তোলে। গুজরাটের গত বিধানসভা নির্বাচন থেকে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্রিশগড়ে তাঁর নেতৃত্বের সাফল্যে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে কংগ্রেস, প্রায় সর্বভারতীয় স্তরে। তাই নরেন্দ্র মোদির প্রধান টার্গেট রাহুল আর তাঁর ‘নামদার’ পরিবার। রাহুলের লক্ষ্যও ‘চৌকিদার’ প্রধানমন্ত্রী। এরূপ কটাক্ষ ও বিদ্রুপের কারণে নির্বাচন কমিশনে নালিশ হয়েছে, কমিশন যথাসম্ভব দুইপক্ষকে সাবধান করেছে।

প্রচারের আরো কয়েকটি চেহারার বহুমুখ বলা জরুরি। বিজেপি ইস্যু করল, সন্ত্রাস আর পাকিস্তানি উস্কানিকে, সীমান্তে লাগাতার সংঘর্ষকে। সার্জিক্যাল স্ট্রাইককে। কোথাও কোথাও এন আর সি আর অনুপ্রবেশের জুজুকেও। স্ট্রাইকের স্বচ্ছতা ও জঙ্গিদের ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রমাণ দাবি করলেন বিরোধীরা। অভিযোগ তুললেন, শহিদ জওয়ানদের রক্ত ও সেনা অভিযানকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁদের অভিযোগকে আমল দেয়নি বিজেপি। বলতে চাইল, একমাত্র মোদিই সন্ত্রাসকে শায়েস্তা করতে সক্ষম। অতএব মোদির নেতৃত্বেই মজবুত ভারত, উন্নয়নমুখী ভারতের নিরাপত্তা বহাল থাকবে।

বিজেপির বিরুদ্ধে বিরোধীদের ইস্যুর অভাব নেই। ডিমনিটাইজেশনের পরিণতি, বেকার বৃদ্ধি, ১২ হাজার কৃষকের আত্মহত্যা, সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ, বিদ্বেষের রাজনীতি, উগ্রজাতীয়তাবাদের উন্মেষ, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের রাজনীতিকরণ— বহুত্ববাদী সংস্কৃতির বদলে একমুখী ঐতিহ্যের পুনর্বিন্যাস ইত্যাদি। এসব অভিযোগ আর বিজেপির সাফাইকে গণরায়, কোথায় কতটা আমল দেবে, তা আমাদের অজানা নয়। এবার কোথাও ঝড়ো হাওয়া নেই। না মোদির, না রাহুলের। ভোটারের মনোভাব চাপা, উত্তেজনাহীন। প্রচারময় দলগুলির নিনাদিত কণ্ঠস্বর যত বেড়েছে, জনসমাবেশে আয়োজিত ভিড় যতটা উপচে পড়তে দেখা গেছে, ঠিক ততটাই ভোটারের গোপানীয়তা রক্ষার সতর্ক কৌশল ছড়িয়ে পড়েছে চরাচরে। এটাও গণতান্ত্রিক উত্তরণের বিশুদ্ধ, বিভ্রান্তিহীন আরেক লক্ষ্মণ।

n লেখক: ভারতীয় সাংবাদিক, আরম্ভ পত্রিকার সম্পাদক

mail :bahar.uddin.editor@gmail.com