নিরাপদ পানির সংকট

জ্যাষ্টিন গোমেজ

চারদিকে পানি আর পানি তবু তেষ্টার জল অপ্রতুল। তার উপর আবার এই খর তাপদাহে পানি শুকিয়ে পুকুরের তলায় গিয়ে ঠেকেছে। রং হালকা সবুজ। পাড় ভেঙে মাটি ধসে পড়ছে।

জীবাণুযুক্ত পানির কারণে পেটের পীড়া, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগছে উচ্চ থেকে নিম্নবিত্ত পর্যায়ের মানুষ। এর মধ্যে দারিদ্র্যপীড়িতরা উচ্চবিত্তের চেয়ে তিনগুণ বেশি পীড়ায় ভুগছে। মূলত অপর্যাপ্ত পরিশোধন ও অনিয়মিত প্রবাহের কারণে বাংলাদেশের পানিতে কোলির হার বাড়ছে। এছাড়া পানির সরবরাহ লাইনে ছিদ্রের কারণেও ঝুঁকি বাড়ছে। দেশের অধিকাংশ শিশুই ঝুঁকিতে রয়েছে। দেশের একেক এলাকায় পানির সমস্যা একেক ধরনের। বাংলাদেশের প্রায় শতভাগ মানুষের হাতের নাগালে পানি আছে। কিন্তু নিরাপদ পানির ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে আছে আর্সেনিক। দেশের দক্ষিণের জেলাগুলোতে লবণাক্ততা বাড়ছে। সুন্দরবন লাগোয়া উপজেলাগুলোতে সুপেয় পানি দুর্লভ হয়ে পড়ছে। কিছু পকেট এলাকায় সুপেয় পানি পাওয়া যায়। ক্রমাগত লবণাক্ততা বৃদ্ধি এসব পকেটের সংখ্যাও কমিয়ে দিচ্ছে। এই এলাকায় বৃষ্টির পানি মটকায় ধরে রেখে ব্যবহার করার চর্চা আছে। তবে এই পানি ব্যবস্থাপনায় জটিলতা আছে। এবার দেখা যাক অন্যদিকের খবর। জীববৈচিত্র্য ও বন ধ্বংস হওয়ার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় ছড়া ও ঝরনা শুকিয়ে যাচ্ছে অবাদে। পানি নিয়ে এখন পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে বড় সমস্যায়। টাকা দিয়ে পানি কিনব সেখানেও প্রতারণা। মান নিয়ে প্রশ্ন ব্যাপক। কিছু কিছু অঞ্চলে এমনও দেখা গিয়েছে পানিতে লবণের সঙ্গে আর্সেনিক। পানির সংকটপূর্ণ এলাকা অনেক। অনেক জায়গায় বস্তিবাসীও পানি পায় না। অবৈধ বসতিতে বৈধ পানি। হাওর বলতে চোখে ভাসে থইথই পানির দৃশ্য। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে একটি-দুটি বিলে পানি থাকে মাত্র। তাই ভিন্ন ধরনের পানি সমস্যা দেখা গেছে দেশের হাওর অঞ্চলগুলোতে। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) ১৭টির মধ্যে ৬ নম্বর লক্ষ্যমাত্রায় নিরাপদ পানি ও পয়োঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার কথা বলা আছে। এতে সব নাগরিকের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা বিধান করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ২০১১ সালে জাতিসংঘের পানি বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও নিরাপদ পানির বিষয়টি মানবাধিকারের অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বাংলাদেশের ২০১৩ সালের পানি আইনে প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপদ পানির অধিকারের কথা বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা বিধানে বাংলাদেশকে দিশারি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। এসডিজির ৬ নম্বর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বিষয়ে তদারকি করতে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে উচ্চপর্যায়ের প্ল্যাটফর্ম গঠন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তাতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সুতরাং, এসডিজি অভীষ্টের ৬/১ ও ৬/২ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দিকে বাংলাদেশের বিশেষ নজর আছে।

জীবনধারণ করতে আমাদের প্রতিদিন পানি পান করতে হয়। কিন্তু এই পানিই যদি নিরাপদ না হয় সেটি উল্টো জীবনহানির কারণ হতে পারে। এ অবস্থায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশুদ্ধ পানি নিয়ে সংকট নতুন নয়। ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত হওয়ায় ওয়াসার পানি পান করতে ভয় পায় লোকজন। এ জন্য পানি ফুটিয়ে পান করতে হয়। এটি যেমন বাড়তি পরিশ্রমের তেমনি মূল্যবান গ্যাসও নষ্ট হচ্ছে পানি ফুটাতে গিয়ে। এছাড়া জার বা বোতলজাত পানি নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। এ অবস্থায় যে কোনো মূল্যে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে হবে। মানুষ পানি কিনে খায়। পয়সা দিয়ে যদি বিশুদ্ধ পানি না পাওয়া যায় সেটি হবে অত্যন্ত দুঃখজনক। নিরাপদ ও সুপেয় পানি নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা করার সময় এসেছে। পানি নিয়ে নগরবাসীর দুর্ভোগ কমাতে ওয়াসাকে আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। দেশের ৯০ শতাংশ মানুষের নিরাপদ পানির চাহিদা মিটলে সেটা ভালো কথা। কিন্তু বাকি ১০ শতাংশের কথাও ভুললে চলবে না। উপকূল, পাহাড়, বস্তি, হাওর এসব এলাকার জন্য বিশেষভাবে ভাবতে হবে ও বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে হবে। শিশুমৃত্যু ও অপুষ্টি ঠেকাতে পানি, স্বাস্থ্য ও পুষ্টিখাতে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। পানি ও স্যানিটেশনের আলাদা উদ্যোগ নিলে শিশুদের কল্যাণ বাড়বে।

মনে রাখতে হবে, পানি নিরাপদ না হলে স্বাস্থ্য ভালো থাকে না। স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে উন্নয়ন টেকসই হয় না।

n লেখক:শিক্ষার্থী, নটর ডেম কলেজ, ঢাকা