[ রা জ নী তি ]
সংবিধান কার—জনগণের না অন্য কারও
প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০১৩, ২০:৫২
দেখতে দেখতে কিভাবে যে অনেকগুলো বছর কেটে গেল কেউ বুঝতে না পারলেও হতভাগ্য অসহায় দারিদ্র্যপিড়ীত মানুষগুলো হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। আরও টের পেয়েছে অত্যাচার-অবিচারে নিশ্চল পাথর হওয়া মানুষগুলো। যারা একটু সুখের আশায় সন্ত্রাসের ভয়াল থাবা থেকে বাঁচবার জন্য ন্যায় বিচার পাওয়ার আশায় নিম্ন বিচারালয় থেকে দেশের সর্বোত্তম বিচারালয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে। কিছুই পায়নি। পেয়েছে শুধু বেওয়ারিশ লাশের পর লাশ, হত্যা, গুম আর রক্তের হোলি খেলা। সবুজ শ্যামল শান্ত এই মাতৃভূমি আজ অজানা আহবানে ডাকছে কেন যেন সুশাসনের বদলে আজ মানুষ দুঃশাসনকে নিজের জীবনের শেষ নিয়তি ও পরিণতি বলে মেনে নিয়েছে।
দেশ আজ তার নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ। খাদ্য বস্ত্র বাসস্থানের অভাব চলছে। অতি সামান্য তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে চলছে নারকীয় হত্যাকাণ্ড। অত্যাচারীর ক্ষমতা আজ এত উঁচুতে যে তাকে কেউ খুঁজে পায় না, খুন করেই এরা পালিয়ে যায়। আন্ডার ওয়ার্ল্ডে যাদের কামলা বলা হয়। পত্রিকায় এরকম তিনশত পেশাদার কিলার রাজধানীতে আছে বলে জানা যায়। যার কারণে প্রতিদিন লাশ পড়ছে। আর হাজার হাজার পরিবার প্রিয়জনকে হারাচ্ছে।
অথচ সরকার সংবিধান রক্ষায় মরিয়া হয়ে আছে। কেন সংবিধান? কার জন্য সংবিধান? মানুষের জন্য দেশের জনগণের জন্য সংবিধান? না কোন ব্যক্তি বিশেষের বা কোন দলের জন্য সংবিধান? কেন সংবিধান রক্ষার শপথে সরকার এত মরিয়া হয়ে উঠেছে।
১৯৭২ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর বাংলাদেশের সংবিধান সর্বোচ্চ আইনের মর্যাদা লাভ করে এবং ১৬ই ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়। এটি একটি লিখিত দলিল যা দেশের সর্বোচ্চ আইন। তত্কালীন আইন ও সংসদীয় দপ্তরের মন্ত্রী ড. কামাল হোসেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের খসড়া সংবিধান বিল পেশ করেন। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান সংবিধান বিলের উপর বক্তৃতা করতে গিয়ে বলেছিলেন : “এদেশের জনগণ দীর্ঘকাল সংগ্রাম করেছে। সংবিধান হবে তাদের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের একটি বিরাট সাফল্য।” অথচ এই সংবিধানই হচ্ছে এখন মানুষের রক্ত ঝরবার অন্যতম এক কারণ । এখন অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমান পঞ্চদশ সংবিধান। শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যই না অন্য কোন উদ্দেশ্যে সংবিধান-এর দোহাই।
সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের একটি রায়কে কেন্দ্র করেই আওয়ামী লীগকে আবারও ক্ষমতায় আনবার বা একদলীয় শাসন কায়েম করবার সুযোগ এনে দেয়। সেখানে অবশ্য দেশের পরবর্তী রাজনীতির বাস্তবতা বিবেচনা করে আরও দুইবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়া বাঞ্ছনীয় উল্লেখ থাকলেও আওয়ামী সরকার এই দ্বিতীয় অংককে আমলে না নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক বাতিলের কথা বলে সংবিধান সংশোধন করে নেয়।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ঠিক ১৯৯৬ সালে তিনি যেমন তার দলের বিজয় নিশ্চিত করার জন্য সংবিধান সংশোধনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক আন্দোলন করেন। সেদিন অবশ্য তার সঙ্গী ছিল জামায়াতে ইসলামী। যাদেরকে তিনি পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা পেয়ে যুদ্ধাপরাধের মামলায় এখন ফাঁসি দিচ্ছেন। তিনি অবশ্য তখন লাঠি বৈঠার আন্দোলনও করেছিলেন তার সুনিশ্চিত বিজয়ের জন্য। এজন্য বাঁশ দিয়ে, লগি দিয়ে পিটিয়ে সেদিন তার দলের অনুসারীরা পৃথিবীর ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম জঘন্য কাজ করে মানুষ হত্যা করে। এখন ২০১৩ সাল আওয়ামী লীগের রূপ পরিকল্পনার যুগ, ২০২১ সালের স্বপ্নের যুগ। এখন আর তিনি তত্ত্বাবধায়ক নিরপেক্ষ কোন দল বা সরকারের কোন ফর্মুলায় বিশ্বাস করেন না। বিশ্বাস করেন যেভাবেই হোক ক্ষমতায় আসার ফর্মুলায়। এজন্য কোন আইন নিয়ম কিছুই তিনি মানেন না। তিনি মানেন তার নিজের হাতের তৈরি ক্ষমতায় আসবার ফাঁক ফোকরের সংবিধান। তাছাড়া গত নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার অভাবনীয় সাফল্যের চাবিকাঠি ও ফর্মুলা তাদের জানা আছে। একদিকে সংবিধান রক্ষা অন্যদিকে বিরোধী দলে দমন নিপীড়ন চালানো হচ্ছে। আর মুখে বলছেন বৃটিশ মডেলে নির্বাচন করব। বৃটিশ মডেলের নির্বাচন তো একটি সংসদ রেখে আরেকটি সংসদ নির্বাচন হওয়ার নজির নেই, তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে এটি কোন বৃটিশ মডেলের নির্বাচন। বৃটিশ পার্লামেন্টকে Mother of all Parliament বলা হয় । এ পার্লামেন্ট হচ্ছে অন্যান্য দেশের জন্য রোল মডেল। যেখানে বিরোধী দলের মতের ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রতি সম্মান দেখানো হয়। অথচ বাংলাদেশের পার্লামেন্টে একদল আরেক দলের প্রতি অশালীন ও অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করে, যা শুনতেও লজ্জা পায়।
নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হবে না এই দাবী জানিয়ে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস এখন বিপদে আছেন। সরকারের কোপানলে পড়ে ড. ইউনূস এখন নিজেই ট্যাক্স না দেয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
বিরোধী দলের চীফ হুইপ জয়নাল আবেদীন ফারুকের উপর অতর্কিত হামলার ন্যক্কারজনক ঘটনা তত্কালীন সময়ে দেশে বিদেশে আলোচিত ঘটনা ছিল। আক্রমণকারী দু’জনকে রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে ভূষিত করার অসুস্থ মানসিকতাকে দেশবাসী ভালভাবে নেয়নি। এভাবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের অসম্মান করে হেয় করা ছিল তাদের কাজ। দেশের প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠান ও সম্মানিত ব্যক্তিদের হেয় করে শুধু তারাই ভাল। অন্যসব খারাপ, অন্যরা সব জামায়াত, হেফাজত এবং দেশদ্রোহী মৌলবাদী বলে প্রচার করে আসছে।
সুতরাং সময় এসেছে যুগ পাল্টেছে, মত পাল্টেছে; তাই আওয়ামী লীগকেও পাল্টাতে হবে। স্বৈরাচারী ও একরোখা নীতি পরিহার করতে হবে। অন্যায়কে অন্যায় বলতে হবে। ঢালাওভাবে কাউকে সন্ত্রাসী ও খারাপ বলা যাবে না। সবাই এদেশের নাগরিক- এই কথাই তাদের মনে রাখতে হবে।
বর্তমান সরবার ক্ষমতায় আসার পর মাত্র ৫০দিনের মধ্যেই অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে পিলখানা হত্যাকাণ্ডে ৫৭জন চৌকস ও মেধাবী আর্মি অফিসারকে হত্যা করা হয়। শাপলা চত্বরের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হয়নি। এখানে কোন হত্যাকাণ্ড হয়েছিল নাকি হয়নি তার সম্পর্কে জনমনে বিরূপ ধারণা নিরসনে সরকার কোন ভূমিকাই রাখেনি। গত পাঁচ বছরে ভারতের কাছ থেকে ন্যায্য কোন হিস্যাই পাওয়া যায়নি। বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ও দুর্বল পররাষ্ট্রনীতি। ফেলানীর বিচারের নামে প্রহসন। গুম, হত্যা এবং গণহত্যার সময়ে মানুষের লাশের পর লাশের বিনা বিচার, সাগর রুনির মত আলোচিত হত্যাকাণ্ডের কোন সুরাহা না হওয়া।
বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা দুর্নীতির রেকর্ড। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা পয়সা লুটপাট এবং এর দায়ভার বিএনপি জোটের উপর দেয়া এবং সবকিছু করে আবার যুদ্ধাপরাধীদের উপর চাপিয়ে দেয়া এসব কারণেই সংবিধানের দোহাই ছাড়া বর্তমানে তাদের কোন উপায় নেই। ফখরুদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া বিগত তিনটি তত্ত্বাবধায়কের সামান্য দোষত্রুটি ছাড়া বড় ধরনের কোন অভিযোগ ছিল না। ফখরুদ্দিনের সরকার ছিল সরাসরি আর্মি তত্ত্বাবধায়ক সরকার। জরুরী অবস্থায় আর্মিদের ব্যবহার ও কর্মকাণ্ডে রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা চরম অসন্তুষ্ট ফখরুদ্দিনের সরকারের উপর। তারা অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে জনমনে অসন্তোস তৈরী করে।
বর্তমান পঞ্চদশ সংশোধনীতে শেখ হাসিনাকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান রেখে তার অধীনে নির্বাচন করার কথা রয়েছে। এ অবস্থায় দেশের কতিপয় রাজনৈতিক দল তার অধীনে নির্বাচন না করার মনোভাব ব্যক্ত করলেও আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন করার সিদ্ধান্তে অটল। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক মহলের একের পর এক কোন উদ্যোগের কোন আসার আলো দেখা যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের নতুন করে দুই দলের মধ্যে সমঝোতার কোন উদ্যোগের ফলও দেখা যাচ্ছে না। গত ৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরীর সংলাপে বসার জন্য দুই নেত্রীকে দেয়া চিঠিরও কোন ফল দেখা যাচ্ছে না। সর্বশেষ সমঝোতার নতুন উদ্যোগ হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট দুই দল থেকে দুইজন প্রতিনিধি পাঠানোর কথা ছিল যাতে করে জাতিসংঘের চলমান অধিবেশন শেষ হলে ওয়াশিংটন ডিসিতে বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। এই উদ্যোগও ব্যর্থ হয়েছে এবং ২৪ অক্টোবরের মধ্যে সংবিধান সংশোধন না হলে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, সংঘাত অনিবার্য । সুতরাং সংবিধান থেকে একচুলও নড়বো না যদি প্রধানমন্ত্রী এখান থেকে সরে না আসেন, তাহলে দেশ কোন পথে যাবে তা ২৫ অক্টোবরের পরেই বলে দিবে। এদিকে বিএনপিও ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত অপেক্ষা করবে তারপর ঢাকা অচল করার অলিখিত ঘোষণা তাদের রয়েছে। ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত বর্তমান সংসদের চলতি অধিবেশনের কার্যক্রম চলবে। তারপর থেকে হরতাল, অবরোধ, সড়ক, নৌ ও রেলপথসহ ঢাকা অচলের ঘোষণা আসতে পারে।
সুতরাং সংবিধানের দোহাই দিয়ে এখন একটা নির্বাচন করিয়ে নেয়া আর যদি পারা না যায় তাহলে দেশের অবস্থা ভাল না বলে প্রধানমন্ত্রী জরুরী অবস্থা ঘোষণা করবেন। এবং এজন্যই তিনি সংসদ না ভেঙ্গে দিয়ে তার অধীনেই নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। সব সংবিধান বিশেষজ্ঞরাই রীতিমত হতবাক হয়েছেন। অবশ্য আওয়ামী লীগের তৈরি করা সংবিধানে এসব আইন লেখা আছে। যে কোন পরিস্থিতিতে পরবর্তী করণীয় কি তা তারা লিখে নিয়েছেন। অবশ্য কমিশনার আবু হাফিজ সংসদ বহাল রেখে আরেকটি সংসদ নির্বাচন করা কঠিন বলে মত দিয়েছেন।
জানি না সংবিধান সংশোধন না হলে ২৪শে অক্টোবরের পর কি হবে দেশে। এর শেষ দৃশ্যটুকু দেখবার জন্য জাতিকে রুদ্ধশ্বাসে আরও কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হবে।
লেখক : শিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়