বেনারসিতে রঙ নকশা আভিজাত্যের ছাপ

সিল্ক সুতার শাড়িতে রূপালি ব্রোকেট আর সোনালি জরির জমাট কাজ। এর ওপরে আলো পড়লে পিছলে যায়। শাড়িতে আলোর রোশনাই মোহময়ী করে তোলে বেনারসি শাড়ি জড়িয়ে থাকা সেই নারীকে। নারীদের কাছে বেনারসি শাড়ি তাই সবসময় আগ্রহের কেন্দ্রে।

নামেই বোঝা যায় বেনারসি শাড়ি এসেছে ভারতের বেনারস থেকে। এই বেনারসি শাড়ি কোনোভাবেই ঘরোয়া শাড়ি নয়। উত্সব, অনুষ্ঠানের আনন্দকে শরীরে জড়িয়ে নিতেই যেন বেনারসি শাড়ি পরেন নারীরা। বেনারসি শাড়ির রঙিন জমিন, উজ্জ্বল সুতার কাজ উত্সবের আনন্দে রোশনাই আরো বাড়িয়ে দেয়। বিয়েতে নতুন বউকে বেনারসি কাতান দেওয়া ঢাকার আদি বাসিন্দাদের মাঝে রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। ঈদে ঐতিহ্যবাহী বেনারসি কাতান শাড়ির প্রতি সহজাত একটা টান থাকে মেয়েদের। সেজন্যই মিরপুরের বেনারসি পল্লিতে মেয়েদের আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে রোজার আগে থেকেই।

বেনারসি শাড়ির মূল ডিজাইনের ধারা সৃষ্টি হয়েছে মোগল ঘরানা থেকে। ফুল ও আল্পনার মোটিফ, কালগা ও বেল পাতার নকশা। সেসব নকশায় শাড়ির রঙের সঙ্গে মিলিয়ে বা রূপালি সোনালি সুতার জমাট কাজ। বেনারসি শাড়িতে রয়েছে আভিজাত্যের ছাপ। এসব শাড়ির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো পাকা রঙ আর ওজনে হাল্কা। দামটাও নাগালের মধ্যেই। তাই সবার কাছেই এ শাড়ির রয়েছে কদর। শাড়ির নামগুলো মনকাড়া। ফুলকলি কাতান, দুলহান কাতান, মিরপুরি রেশমি কাতান, মিলেনিয়াম কাতান, বেনারসি কসমস, অরগ্যান্ডি কাতান, ব্রোকেট কাতান, বেশমি কাতান, প্রিন্স কাতান, রিমঝিম কাতান, টিসু কাতান, মিরপুরি গিনি গোল্ড কাতান, জর্জেট গিনি গোল্ড কাতান, চুনরি কাতান ।

মিরপুরে বেনারসি পল্লির যাত্রা শুরু সেই ১৯০৫ সালে। মানে একশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এইখানে বেনারসি কাতান শাড়ি বেচাকেনা চলছে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ভারতের বেনারসের কয়েকশ মুসলিম তাঁতি পরিবার তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে আসে। তারা বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ব্যবসা শুরু করে। এদের বড় অংশটি ছিল প্রায় ২০০ পরিবারের, যারা ঢাকার মিরপুরে বসতি স্থাপন করে। তবে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে স্থানীয়রা এ পেশায় ব্যাপকভাবে জড়িত হবার পরই ঢাকায় বেনারসি শিল্পের প্রসার বাড়তে থাকে। তবে মানুষের আগ্রহ বেড়েছে গত শতকের নব্বইয়ের দশকে এসে।

মিরপুর ১০ ও ১১ নম্বরের বিশাল একটা অংশ জুড়ে বেনারসি পল্লি গড়ে উঠেছে। পুরো এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে শত শত কাতান আর বেনারসি শাড়ির দোকান। প্রায় প্রতিটি দোকানেরই রয়েছে নিজস্ব কারখানা। কাতানের দাম নির্ভর করে নকশা, উপকরণ আর জরির কাজের ওপর। এসব দোকানে সাধারণত ১৩০০-১৫০০ টাকায়ই ভালো মানের শাড়ি পাওয়া যাচ্ছে। ভালো মানের কাতান শাড়ির দাম শুরু হয় ৩০০০ থেকে। নকশা আর কাপড়ের মান অনুযায়ী এসব কাতানের দাম ১৫ হাজার পর্যন্ত হয়ে থাকে।

বিক্রেতারা বলেন, ঐতিহ্যবাহী বিশ্বখ্যাত মসলিনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে বেনারসি পল্লিতে। তাঁতের বুনন, কারচুপি না দেখলে বোঝা যাবে না বিভিন্ন ডিজাইনের কারুকার্যখচিত শাড়িগুলো কতটা দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয়। এসব শাড়ির দামও ক্রেতার সামর্থ্যের মধ্যেই রাখা হয়েছে।

বেনারসির নামে প্রতারণা :তবে ভারতীয় নিম্নমানের শাড়িতে বেনারসি পল্লি ছেয়ে গেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে ভুঁইফোড় ব্যবসায়ীদের এই ধরনের দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ না হলে বেনারসি তার ঐতিহ্য ও মানুষের আস্থা হারাবে। কারণ শাড়ি বিনা শুল্কে চোরাইপথে আসায় দাম কম পড়ছে। ফলে দাম ও চাকচিক্যের প্রতিযোগিতায় হেরে যাচ্ছে আসল বেনারসি। তার ওপর সরকার প্রতিবছরই বেনারসির কাঁচামাল সুতা বা সিল্কের ওপর নতুন নতুন কর ও ভ্যাট আরোপ করে যাচ্ছে। ফলে এ শাড়ি তৈরির কাঁচামালের দাম বেড়ে যাচ্ছে। বেড়ে যাচ্ছে শাড়ি তৈরির খরচ।