একাত্তরে পাকিস্তানিরা আমার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে আটক করে
প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০১৩, ২২:৩৬
মুক্তিসংগ্রামে বাংলাদেশের মানুষ বিজয় অর্জন করেছে, কেউ তোমাদের দেয়নি। বিশ্বের অনেক দেশকে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ লড়াই করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে- বলছিলেন বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু পল কনেট।
পল কনেট ও এলন কনেট দম্পতি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। দুর্গতদের সাহায্য দেয়া, মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করা এমনকি এলন কনেট পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে বন্দিও হয়েছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের অস্তিত্বের লড়াই যেন হয়ে উঠেছিল তাদেরও লড়াই। বাংলাদেশের মানুষের মুক্তিযুদ্ধ তাদের এতোটাই অনুপ্রাণিত করেছিল যে, ১৯৭২ সালে জন্ম নেয়া তাদের সন্তানের নাম রেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে। তার ছেলের নাম, পিটার উইলিয়াম মুজিব কনেট।
মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদান রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ নিতে ইংল্যান্ড থেকে কনেট দম্পতি বাংলাদেশে এসেছেন। গতকাল শনিবার তারা এসেছিলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় অংশ নেন। বর্ণনা করেন মুক্তিযুদ্ধে তাদের নানা অভিজ্ঞতার। তারা শোনালেন উত্তাল সেই যুদ্ধদিনের কথা। এসময় উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সদস্য সচিব মফিদুল হক।
১৯৭১ সালে বিয়ে করেন ব্রিটিশ নাগরিক পল ও এলেন কনেট। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তারা দুজনেই দুর্গত মানুষের সহযোগিতার জন্য বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত হন। এলেন কাজ করতেন ‘অপারেশান ওমেগা’র সঙ্গে আর পল ‘অ্যাকশন বাংলাদেশ’-এর সঙ্গে।
এলেন কনেট বলছিলেন, একাত্তরের ৪ ডিসেম্বর যশোরবাসী বুঝতে পারে, তারা স্বাধীন হতে চলেছেন। তখন সাথে সাথে তারা রাস্তায় নেমে এসে ‘‘জয় বাংলা” স্লোগান দিতে শুরু করেন। আমি এখনো গর্ব অনুভব করি যে, আমি ঐ দৃশ্য দেখতে পেয়েছিলাম।’
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে পল কনেট বলেন, তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দলের সাথে ঘুরেছেন দেশের নানা প্রান্তে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ আন্দোলনকে প্রত্যক্ষভাবে সাহায্যদানের কর্মসূচি তৈরির জন্য সম্ভবত ২০ এপ্রিল পাক্ষিক ‘পিস নিউজ’ পত্রিকার অফিসে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ বৈঠকের উদ্যোক্তাদের মধ্যে তিনি ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ম্যারিয়েটা প্রোকোপে এবং যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধিরা। এর কিছুদিন পর আমাদের উদ্যোগে অধিকৃত বাংলাদেশে খাদ্যসামগ্রী ও ওষুধপত্র পাঠানোর জন্য ‘‘অপারেশান ওমেগা’’ শীর্ষক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়। লন্ডনের ক্যামডেন এলাকায় ম্যারিয়েটার বাড়িতে ‘অ্যাকশান বাংলাদেশ’ ও ‘অপারেশান ওমেগা’র কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়।
যুদ্ধকালীন অবস্থা তুলে ধরে তিনি আরো বলেন, ‘আমরা প্রায় ১৬০ সদস্যের একটি মুক্তিবাহিনী দলের সঙ্গে দেশের ভেতরে আসি। গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য আমাদেরকে দুই দিন হেঁটে ও দুই দিন নৌকায় চলতে হয়। আমি সেখানে পাকিস্তানি রেডিওর খবরে জানতে পারি, অপারেশান ওমেগার দুই সদস্যকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আটক করেছে, তাদের একজন নারী। তিনিই আমার স্ত্রী এলেন কনেট। এরপর আমি অধিকৃত বাংলাদেশ থেকে ভারতে ফিরে যাই। পরে আবার চারজন ছাত্র ও এক গাইড নিয়ে ফিরে আসি। সাত দিন পর সীমান্ত অতিক্রম করে আমি জানতে পারি এলেনের দুই বছর কারাদণ্ড হয়েছে। দুই মাস পর মুক্তিবাহিনী ও মিত্র বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ বাহিনী গঠিত হয় এবং সর্বাত্মক যুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। এরপরেই এলেন মুক্তি লাভ করে।
এলেন কনেট বলেন, ‘অপারেশন ওমেগা’র একটি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। বাংলাদেশের ভেতরে দুর্গত মানুষের কাছে সাহায্য পৌঁছে দেয়াই ছিল আমাদের লক্ষ্য। আমরা সীমান্ত অতিক্রম করে অত্যন্ত সাহস ও ঝুঁকির পরিচয় দিয়ে অবরুদ্ধ বাংলাদেশে প্রবেশ করি পরে গ্রেপ্তার হই। তখন এই ঘটনা বিশ্বব্যাপী তোলপাড় হওয়ায় আমি ও আমার দলের সদস্যরা প্রাণে বেঁচে গেলেও দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।’ তিনি বলেন, ‘আমি যখন যশোর কারাগারে বন্দি ছিলাম, তখন লক্ষ্য করি আমি অন্তঃসত্ত্বা। ১৯৭২ সালে আমাদের প্রথম পুত্র সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুসারে পুত্রের নাম রাখি পিটার উইলিয়াম মুজিব কনেট।’
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পল কনেট বলেন, ‘এ দেশের মানুষ সার্বক্ষণিক কাজ করেন। যেদিকেই তাকায় শুধু কাজ, কাজ আর কাজ। পুরো দেশজুড়ে সবুজের সমারোহ। যেন পুরো দেশটিই একটি ক্যানভাস।’ তিনি বলেন, আমি যখন মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে বেরিয়েছি, তখন আমার সঙ্গী ছিল একটি ক্যামেরা। যা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও দুর্গত শরণার্থীদের বিভিন্ন দৃশ্য আমি ধারণ করি।
মফিদুল হক বলেন, ‘পল ও এলেন কনেট আমাদের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে যুদ্ধদিনে তাদের বিভিন্ন স্মারক উপহার দিয়েছেন। এর মধ্যে তাদের চিঠি ও প্রচারণা পত্র রয়েছে। একই সাথে রয়েছে পলের তোলা যুদ্ধকালীন সময়ের রঙিন আলোকচিত্র। এর মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য কলকাতায় বাংলাদেশি চিত্রশিল্পীদের প্রদর্শনীর প্রতিটি ছবির আলোকচিত্র। যা শুধুমাত্র তার কাছেই ছিলো। এসব স্মারক নিয়ে শীঘ্রই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে বলেও জানান মফিদুল হক।