সাদা মাছ রপ্তানি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা

বাংলাদেশ থেকে সাদা মাছ রপ্তানি বন্ধ হওয়ার আশংকা করা হচ্ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত আগস্ট মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় সাদা মাছ শতকরা ৬৩ ভাগ কমে গেছে, যা গত বছরের এই সময়ের রপ্তানির চেয়ে শতকরা ৪০ ভাগ কম। সরকার সাদা মাছের উপর চলতি অর্থ বছর (২০১৩-১৪) নগদ সহায়তা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করায় এবং গত প্রায় দেড় বছর ধরে ইলিশ মাছ রপ্তানি নিষিদ্ধ থাকায় সাদা মাছ রপ্তানিতে ধস নামে। ২০০২-২০০৩ সাল থেকে সরকার হিমায়িত চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ (সাদা মাছ)-এর ক্ষেত্রে শতকরা ১০ ভাগ নগদ সহায়তা প্রদান করে আসছে। তাছাড়া ২০০৯-২০১০ সালে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা ও স্থানীয় বাজারে মাছ উত্পাদন কম হওয়ায় হিমায়িত মত্স্য রপ্তানিখাতকে উজ্জীবিত করার লক্ষ্যে আরো আড়াইভাগ বৃদ্ধি করে সাড়ে বার ভাগে উন্নীত করে। চলতি অর্থ বছরে অর্থ মন্ত্রণালয় হঠাত্ করে নগদ অর্থ সহায়তার ক্ষেত্রে নেতিবাচক মনোভাব দেখায়। এক্ষেত্রে সাদা মাছের জন্য অর্থ সহায়তা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয় এবং চিংড়ি মাছের ক্ষেত্রে কমিয়ে সাড়ে সাত ভাগে নিয়ে আসে। সাদা মাছ রপ্তানিকারকদের সূত্রে জানা যায়, দেশের সাদা মাছ রপ্তানির শতকরা ৯০ ভাগই চট্টগ্রাম অঞ্চল হতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়ে থাকে। ঐ সকল রপ্তানিকারকগণ ‘নন প্যাকার’ নামে সাধারণত সাদা মাছ রপ্তানি করে থাকে। এছাড়া মাঝারি ও ছোট হিমায়িত মত্স্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার মালিকগণও চিংড়ির পাশাপাশি সাদা মাছ রপ্তানি করে থাকে। যে সকল সাদা মাছ রপ্তানিকারকদের কারখানা নেই, তারা অন্য মত্স্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় মাছ প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানি করে থাকেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি অভিবাসী সাদা মাছের ভোক্তা। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের বসবাসকারী বাংলাদেশের লোকজন সাদা মাছের প্রধান ক্রেতা। যে সকল সাদা মাছ বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হয়, তার মধ্যে রয়েছে মলা, ঢেলা, বোয়াল, পুঁটি, বাইন, মাগুর, শিং, রুই, কাতলা, পাঙ্গাস, তেলাপিয়াসহ দেশীয় প্রজাতির সকল মাছ। ৬০-এর দশক থেকে প্রথমে এ সকল সাদা মাছ রপ্তানির মধ্য দিয়ে এ দেশ থেকে হিমায়িত মাছ রপ্তানি শুরু হয়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে এদেশ থেকে চিংড়ি মাছ রপ্তানি শুরু হয়। রপ্তানিকারকদের সূত্রে জানা যায়, সাদা মাছ রপ্তানি করে ব্যবসায়ীরা তেমন একটা লাভবান হয় না। মূলতঃ সরকারের নগদ সহায়তা তাদেরকে রপ্তানির ক্ষেত্রে উত্সাহিত করে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে এই নগদ প্রণোদনা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রপ্তানির ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানায়। তাদের মতে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার নগদ সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে পূর্বাবস্থায় ফিরে না আসলে সাদা মাছ রপ্তানি মোটামুটিভাবে বন্ধের উপক্রম হওয়ার আশংকা করা হচ্ছে। কারণ সাদা মাছ রপ্তানির সাথে জড়িত ছোট-বড় অনেক রপ্তানিকারক এ ব্যবসা ছেড়ে দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তাদের অভিমত। রপ্তানিকারকদের মতে, সাদা মাছ রপ্তানি আশংকাজনক হারে কমে গেলে হিমায়িত মত্স্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার মালিকগণও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ অধিকাংশ কারখানায় সাদা মাছ রপ্তানিকারকদের মাছ প্রক্রিয়াজাত করা হয়ে থাকে। তাছাড়া হিমায়িত মত্স্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার মালিকগণের বেশিরভাগ এমনিতেই ব্যাংকের ঋণে জর্জরিত। তার ওপর সাদা মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ করতে না পারলে বিরূপ প্রভাব অবধারিত। নন-প্যাকার এসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ হিমায়িত মত্স্য রপ্তানিকারক সমিতির পক্ষ থেকে সাদা মাছ ও চিংড়ি রপ্তানির ক্ষেত্রে পূর্বের ন্যায় নগদ সহায়তা প্রদান বহাল রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভাগে পত্র প্রেরণসহ তদ্বির চালালেও এ পর্যন্ত কোন কার্যকর ফল পায়নি। এমনকি মত্স্য মন্ত্রণালয় এবং এফবিসিসিআই-এর পক্ষ থেকে নগদ সহায়তা প্রদানের সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানা যায়। নন প্যাকার এসোসিয়েশনের কর্মকর্তা এবং বিশিষ্ট সাদা মাছ রপ্তানিকারক আনোয়ারুল হক জানান, সরকার একদিকে ইলিশ মাছ রপ্তানি বন্ধ করে রেখেছে। আবার সাদা মাছের নগদ সহায়তাও প্রত্যাহার করায় সাদা মাছ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। অনেকেই মাছ রপ্তানি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে। তাছাড়া পুরো মাছ রপ্তানি খাতে বিরূপ প্রভাব পড়বে। তিনি অবিলম্বে ইলিশ মাছ রপ্তানির উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাখ্যান এবং নগদ সহায়তা পুনর্বহালের দাবি জানান। বাংলাদেশ হিমায়িত মত্স্য রপ্তানিকারক সমিতির সহ-সভাপতি এবং মাসুদ ফিস প্রসেসিং এন্ড আইস কমপ্লেক্স লিঃ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশরাফ হোসেন মাসুদ ইত্তেফাককে জানান, ইলিশ মাছ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ায় রপ্তানির জন্য তার প্রায় ৪০ কোটি টাকার ভ্যালু এডেড ইলিশ মাছের ক্ষেত্রে প্রায় ১৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। তিনি বলেন, সাদা মাছের নগদ সহায়তা প্রদান বন্ধ এবং ইলিশ মাছের উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হলে মত্স্য রপ্তানিখাত বন্ধ হতে বাধ্য।