টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে আসা ইয়াবায় সারাদেশ সয়লাব

কক্সবাজার জেলার টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে আসা ইয়াবায় সারাদেশ সয়লাব হয়ে গেছে। এ সীমান্তে ইয়াবা অপ্রতিরোধ্য। টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে আসা ইয়াবা এদেশে প্রবেশ বন্ধ করতে পারলে সারাদেশের ইয়াবা পরিস্থিতি অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের দুই কর্মকর্তা -এর সত্যতা স্বীকার করে বলেছেন, শুধু মিয়ানমার থেকে টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে আসা ইয়াবা ট্যাবলেট বন্ধ কিংবা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে এ দেশের স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীসহ তরুণ সমাজকে রক্ষা করা সম্ভব হতো। সেখানে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, বিভিন্ন পেশার লোক ইয়াবা পাচারে জড়িত। তাদের মূল বাণিজ্য ইয়াবা বলে কর্মকর্তাগণ জানান। এ সম্পর্কে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অপর এক কর্মকর্তা বলেন, টেকনাফ এলাকা দিয়ে বিপুল পরিমাণে ইয়াবা আসতে কারা জড়িত সে বিষয় নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন কাজ করছেন। ইয়াবা পাচারে স্থানীয় প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, স্থানীয় রাজনৈতিক ও মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এক শ্রেণির কর্মকর্তা জড়িত। ঐ সব কর্মকর্তা ইয়াবা পাচারকারীদের কাছ থেকে নিয়মিত মোটা অংকের টাকা উেকাচ পেয়ে থাকেন। এমনকি টেকনাফে এক বছর দায়িত্বে থাকলে ঐ কর্মকর্তার আর সারা জীবনে আর্থিক বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। বাড়ি-গাড়ি সবই হয়ে যায়। এ কারণে ইয়াবা পাচারকারীরা টেকনাফ সীমান্তে অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়েছে। ঐ কর্মকর্তার মতে, এক দিনে যে পরিমাণ ইয়াবা টেকনাফ দিয়ে এদেশে প্রবেশ করে সারা বছর পুলিশ-র্যাব মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরসহ বিভিন্ন সংস্থা সেই পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার করতে পারেনি। ইতিমধ্যে বিজিবি ও পুলিশকে নিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা টেকনাফ সীমান্ত এলাকায় বিশেষ অভিযান চালায়। ঐ অভিযানে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। অভিযানের আগাম সংবাদ পেয়ে ইয়াবা ব্যবসায়ী কিংবা পাচারকারীরা এলাকা থেকে নিরাপদ স্থানে চলে যায়। টেকনাফে ইয়াবা পাচার ও ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকারী ১৫ গডফাদারের আস্তানায় অভিযান চালাতে গিয়ে কর্মকর্তারা হতভম্ব হয়ে যান। এসব গডফাদারের আস্তানা ও বাসভবন এমন দৃষ্টিনন্দনভাবে তৈরি যা খোদ রাজধানীর অভিজাত এলাকায়ও নেই। এ গডফাদাররা লেখাপড়ায় শূন্য। কিন্তু ইয়াবা পাচার হলো তাদের মূল ব্যবসা। সাধারণ ও দরিদ্র পরিবারের সন্তান হয়েও তারা টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা পাচার করে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। তাদের বিলাসবহুল জীবনযাপন দেখে কর্মকর্তারা বুঝতে পেরেছেন, টেকনাফ সীমান্তে ইয়াবার কী ভয়াবহ পরিস্থিতি। টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে আসা ইয়াবা সারাদেশকে ভাসিয়ে দিচ্ছে। রাজধানী থেকে গ্রামাঞ্চলে এমন স্থান নেই যেখানে ইয়াবা নেই। হাত বাড়ালেই ইয়াবা মেলে। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের দুই উপ-পরিচালক ফজলুর রহমান ও মুকুল জ্যুতি চাকমা সেই বিশেষ অভিযানে নেতৃত্ব দেন। টেকনাফে ১১টি এলাকায় গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫ দিন এক টানা অভিযান চলে। যে ১৫ জন গডফাদারের আস্তানায় অভিযান চলে তারা হচ্ছে মুক্তার আহমেদ, মো. বদি আলম, রুহুল আমিন, শাহ আলম, মো. আব্দুল্লাহ মনির, আলী হোসেন, মনজুর আলম, নূরুল বসাক ওরফে প্রকাশ মিজি, মো. সাকের, মো. আলী জহুর, মোসাম্মত্ নূরুননাহার বেগম, ৫ বছরের সাজাপ্রাপ্ত নূরুল আলম, সাইফুল, মো. আলমগীর ও নূরুল হুদা। তাদের আস্তানা থেকে ইয়াবা তৈরির ৫ কেজি পাউডার, ১৫২৭ পিস ইয়াবা ও ৮ ক্যান বিয়ার উদ্ধার করে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তারা জানান, ৫ কেজি পাউডার দিয়ে ৫ লক্ষাধিক ইয়াবা ট্যাবলেট তৈরি করা সম্ভব। অভিযানে মোবাইল কোর্ট ১২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়। ২টি নিয়মিতসহ ১৫টি মামলা দায়ের করেন কর্মকর্তারা। অভিযান শেষে কর্মকর্তারা অনুসন্ধান করে জানতে পারেন, টেকনাফ এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে শিক্ষার হার মাত্র ২২ ভাগ। তাদের বেশিরভাগই অশিক্ষিত। কর্মকর্তারা জানান, তারা টেকনাফের ৯টি স্কুল কলেজে ইয়াবার ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির কার্যক্রম পরিচালনা করেন। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ ইকবাল বলেন, টেকনাফে তাদের বিশেষ অভিযানে ফলাফল যা হোক না কেন, সেখানে একটি বড় ধরনের ধাক্কা দেয়া হয়েছে। এ সীমান্তকে টার্গেট করে ইয়াবা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার দিক-নির্দেশনা তৈরি করে দেশব্যাপী কার্যক্রম চালানো হবে। এ কার্যক্রমকে সফল করতে দলমত নির্বিশেষে সব রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবীসহ সব পেশার মানুষকে এক কাতারে এসে আন্দোলনে নামতে হবে।