‘শাটডাউন’ আমেরিকা!
প্রকাশ : ০৬ অক্টোবর ২০১৩, ১৯:৫৩
মার্কিন কংগ্রেসে অর্থ বরাদ্দ সংক্রান্ত বিল পাস না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে সৃষ্টি হয়েছে অচলাবস্থা। মার্কিন পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ও প্রধান বিরোধী দল রিপাবলিকান পার্টির সদস্যদের মতানৈক্যের কারণে অর্থ বরাদ্দ সংক্রান্ত বিল পাস হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র সময় ৩০ সেপ্টেম্বর সোমবার রাত ১২টার আগ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সেবা খাতগুলোতে অর্থ বরাদ্দ সংক্রান্ত বিলটি পাস হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওবামার স্বাস্থ্যবিল নিয়ে রিপাবলিকানদের বিরোধীতার কারণে তা পাস হয়নি। তাই ১৭ বছর পর আবারও অচলাবস্থা হলো বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির দেশটিতে। এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘শাটডাউন’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
বিল পাস না হওয়ায় দেশের কয়েকটি সরকারি সেবা খাতের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে শুরু হয়েছে ব্লেইম গেম। এই পরিস্থিতির জন্য কে কার উপর দোষ চাপাতে পারে শুরু হয়েছে তার প্রতিযোগিতা। রিপাবলিকানরা বলছে, ওবামাকে আলোচনায় আমন্ত্রণ জানানো হলেও তিনি তাতে আমল দেননি। রিপাবলিকান হাউস স্পিকার জন বোয়েনার বলেছেন, স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে ওবামার একগুয়েমি এই অচলাবস্থার কারণ। অন্যদিকে, ওবামা বলেছেন রিপাবলিকানরা গোটা দেশকে জিম্মি করার চেষ্টা চালিয়েছেন। এ কারণে এশিয়া সফর বাতিল করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। রিপাবলিকানদের সামনে মাথা নত করতে রাজি হননি তিনি। রিপাবলিকান সিনেটরদের ইঙ্গিত করে তিনি আরো বলেছেন, আমরা যদি একটি দলের কয়েকজন ‘চরমপন্থি’ লোককে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ও বিশ্বাসকে হেয় প্রতিপন্ন করার সুযোগ দিতে মাথা নত করি, তবে আমার পরে যিনিই প্রেসিডেন্ট হবেন, তার পক্ষে সুষ্ঠুভাবে সরকার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। আমি তাদের সেই অনিষ্ট করার সুযোগ দিতে পারি না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, যা ঘটেছে তাতে তিনি যারপরনাই মর্মাহত। কারণ এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করার কোনো প্রয়োজনই ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ যে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসিয়েছে তা বিরোধীরা ভুলে গেছে বলে মন্তব্য করেন ওবামা।
এদিকে, সরকারি ও বিরোধী দলের এই লড়াইরে শিকার হচ্ছে সাধারণ মার্কিনীরা। এই অচলাবস্থার ফলে সরকারি স্কুল, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত খাতে কোনো প্রভাব পড়বে না। বিলটি পাস না হওয়ায় প্রায় সাড়ে সাত লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারি ১ অক্টোবর থেকে বেতন পাবেন না। এর ফলে মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা, ন্যাশনাল পার্ক, জাদুঘর, স্মৃতিস্তম্ভ, পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক সংস্থাসহ বেশ কিছু সেবা-সংস্থার বেশিরভাগ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অচলাবস্থার কারণে ওয়াশিংটনেই একদিনে ক্ষতি হবে ২০ কোটি মার্কিন ডলার আর এক সপ্তাহে পুরো যুক্তরাষ্ট্রে লোকসান হবে ১০০ কোটি মার্কিন ডলার। মার্কিন ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলো এই খবর গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করেছে। আর মার্কিন অর্থনীতি হচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতির ‘কান’। তাতে টান পড়লে গোটা মাথাতেই টান লাগবে।
ব্যয় সংকোচনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ পরিবার যখন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন এ ধরনের অচলাবস্থা তাদের আরো পেছনের দিকে ঠেলে দেবে। এ পরিস্থিতির উন্নয়নের সম্ভাবনাও খুব ক্ষীণ বলে অনেকের ধারণা। এই অচলাবস্থার জন্য কেউ দায়ী করছেন ডেমোক্র্যাটদের আবার কেউ দায়ী করছেন রিপাবলিকানদের। এই অচলাবস্থার প্রভাব পড়ে প্রেসিডেন্টের সফরেও। এই পরিস্থিতির কারণে এশিয়া সফর বাতিল করেছেন বারাক ওবামা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি তার প্রতিনিধি হিসেবে এই সফরে যাবেন। অচলাবস্থার কারণে বার্ষিক যে সম্মেলনগুলো রয়েছে, ওবামা সেগুলোর সবগুলোই বাতিল করবেন কিনা তা প্রকাশ করেননি।
এই বিলটি পাস না হওয়ায় প্রায় সাড়ে সাত লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ১ অক্টোবর থেকে বেতন পাবেন না। এছাড়াও অচলাবস্থা নিরসনের পর বেতন ছাড় হবে কিনা তারও কোনো নিশ্চয়তা থাকছে না। সংবাদ মাধ্যমগুলো বলছে, অর্থবছর শেষ হওয়ায় সেবাখাতগুলোতে নতুন করে অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বিলটি পাস না হওয়ায় দেশটির মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (নাসা), জাতীয় পার্ক, পরিবেশ সংরক্ষণবিষয়ক সংস্থাসহ বেশ কিছু সেবা সংস্থার অধিকাংশ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। অবশ্য সামরিক বাহিনী, পুলিশ প্রশাসন, অগ্নিনির্বাপণ কর্তৃপক্ষ ও নিরাপত্তাবিষয়ক সংস্থাগুলোর ওপর এর কোনো প্রভাব পড়বে না।
বিলটি পাস না হওয়ার কারণ, প্রেসিডেন্ট ওবামার স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত আইনটি। ‘ওবামাকেয়ার’ নামে পরিচিতি পাওয়া এই বিলটি পাস না করতে অথবা এতে কোনো অর্থ বরাদ্দ না দিতে ওবামার প্রতি আহ্বান জানান রিপাবলিকানরা। কিন্তু বিলটি পাসে ডেমোক্র্যাটরা অনড় থাকে। তাদের ধারণা ছিল জনগণের রোষানলের পড়ার ভয়ে রিপাবলিকানরা শেষ মুহুর্তে হলেও এতে সমর্থন দিবেন। কিন্তু তাদের ধারণ বাস্তবে রূপ নেয়নি। সোমবার রাত ১১টার দিকে অচলাবস্থা নিরসনে আলোচনার প্রস্তাব দেন রিপাবলিকানরা। কিন্তু তখন খুব বেশি কিছু করার ছিল না ওবামার।
রাত ১২ টার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায় অর্থের জোগান। ফলে সেবাখাতগুলোকে কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দেয় হোয়াইট হাউজের বাজেট অফিস। সেবাখাতগুলো বন্ধ হওয়ার প্রথম শিকার ছিল খোদ মার্কিন আইনসভার অফিসিয়াল টুইটার অ্যাকউন্টটি। রাত ১২টার পর অ্যাকাউন্টটিতে একটি পোস্ট করে বলা হয়, ‘সরকারি অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় এই অ্যাকাউন্টটি পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করবে না।’
এ ঘটনায় প্রেসিডেন্ট ওবামা তার ব্যক্তিগত টুইটার বার্তায় বলেন, তারা প্রকৃতই কাণ্ডটি ঘটালো। একটি সঠিক বাজেট পাস করতে না দিয়ে ‘ওবামাকেয়ারের’ দোহাই দিয়ে রিপাবলিকানরা সরকারকে সেবাখাতগুলো বন্ধে বাধ্য করলো।
এর আগে ১৯৯৫ ও ১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু সেবা খাতের কার্যক্রম স্থগিত করে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৯৫ সালের ১৪ নভেম্বর থেকে ১৯ নভেম্বর ও ১৯৯৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৯৬ সালের ৬ জানুয়ারি দেশটির অজরুরি সরকারি কর্মকর্তাদের সাময়িক ছুটি প্রদান এবং অজরুরি সেবাগুলো স্থগিত রাখা হয়েছিল। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবেশসহ বিভিন্ন সেবাখাতে তহবিল বরাদ্দ নিয়ে ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাটিক ও বিরোধী রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্যদের দ্বন্দ্বের কারণে এমনটি হয়েছিল। তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন বিল ক্লিনটন।
বাজেট পাস করার শর্ত হিসেবে রিপাবলিকানরা প্রেসিডেন্ট ওবামার স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার (ওবামাকেয়ার) এক বছর পিছিয়ে দেয়ার কথা বলেছিল।
১৯৭৬ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত ১৭ বার এ ঘটনা ঘটেছে। শেষবার এমন ঘটেছিল বিল ক্লিন্টনের সময়। ১৯৯৫ সালে রেকর্ড ২১ দিন বন্ধ ছিল সরকারি সেবাখাত। এবার দুই দলের বিরোধের কারণ সেই বহুল আলোচিত স্বাস্থ্যবিল। যুক্তরাষ্ট্রে কম খরচে প্রায় সবাইকে চিকিত্সা পরিসেবার আওতায় আনতে এই বিল পাসের জন্য ২০০৮ সাল থেকেই জোরালো দাবি জানিয়ে আসছিলেন ওবামা। ২০১০ সালের ২৩ মার্চ বিলটি আইনে পরিণত হয়। চলতি মাস থেকে তার একটা বড় অংশ কার্যকর হওয়ার কথা। কিন্তু এখানেই বেঁকে বসেছে বিরোধী রিপাবলিকানরা। শুরু থেকেই তারা এই আইনের বিরোধিতা করে আসছে। তাদের যুক্তি, এটি আসলে করদাতাদের অর্থের বিশাল অপচয়। সেই সঙ্গে বেসরকারি স্বাস্থ্য বিমার সর্বনাশও। এই যুক্তিতেই বিলটি আপাতত এক বছর পিছিয়ে দেয়ার কথা বলে প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগুরু রিপাবলিকানরা। কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা একমত হয়নি। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি অনিবার্য হয়ে ওঠে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে হঠাত্ বেকার হয়ে যাওয়া এসব সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারির ভবিষ্যত্ কী হবে তা নিয়ে এখন শঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদিও গত মঙ্গলবার দেশটির প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা অতিদ্রুত সময়ে সঙ্কট নিরসন করে বেকার হয়ে যাওয়া এসব শ্রমিকের কাজের ব্যবস্থা করবেন বলে কথা দিয়েছেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু সেবাখাত বরাদ্দের অভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও দেশটি ভাবমূর্তি সংকটে পড়তে পারে। এর ফলে বিদেশে মার্কিন মিশনগুলোতে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। গত মঙ্গলবার দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে এক সফরে এসে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী চাক হেগেল বলেন, সরকারি সেবা খাতগুলো বন্ধের ঘটনা অনিবার্যভাবে মিত্রদের কাছে দেশের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করবে’।
পিটারসন ইনস্টিটিউটের অর্থনীতিবিদ জ্যাকব কির্কেগার্ড বলেছেন, পরিস্থিতি ভালো হওয়ার চেয়ে খারাপ হওয়ার সম্ভাবনাটাই বেশি। কেননা এমনিতেই দেশটি অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে রয়েছে, তাই এ অবস্থায় অচলাবস্থা দেশের জন্য একটা বড় ধরনের ক্ষতি। কয়েকদিনের জন্য হলেও এর ফলে শেয়ারবাজার, চাকুরির সুযোগ সৃষ্টিতে ব্যাপক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন তিনি।