সম্প্রতি ঢাকার শিল্পকলা একাডেমিতে হয়ে গেল সার্ক হস্তশিল্প প্রদর্শনী ও মেলা। এই অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে শ্রীলংকার সার্ক কালচারাল সেন্টার। এই সেন্টারের ভাইস প্রেসিডেন্ট সাউন্দ্রি ডেভিড রড্রিগো এই মেলায় আসেন। শিল্প সংস্কৃতি নিয়ে তিনি কথা বলেন মহিলা অঙ্গনের সাথে। তাকে নিয়ে আমাদের এই প্রতিবেদন—

শিল্পকলাকেই সম্প্রীতির হাতিয়ার বানাতে চাই —সাউন্দ্রি ডেভিড রড্রিগো

‘যথেষ্ট সম্ভাবনা এবং ভৌগোলিক ও সংস্কৃতিগত মিল থাকা সত্ত্বেও আমাদের দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে সৌহার্দ্যের কাঙ্ক্ষিত সেই বৃত্ত রচিত হচ্ছে না। আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, শিল্পকলার মাধ্যমেই সেই সমপ্রীতির বন্ধন রচনা করা।’ রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমিতে সার্ক কালচারাল সেন্টারের উদ্যোগে আয়োজিত সাত দিনব্যাপী হস্তশিল্প প্রদর্শনী শেষে এভাবেই সংগঠনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বললেন এর সহকারী পরিচালক শ্রীলংকার সাউন্দ্রি ডেভিড রড্রিগো। জন্মের পরেই সাউন্দ্রি ঘরে পেয়েছিলেন সংস্কৃতিমনা বাবা-মাকে। তাদের হাত ধরেই শিল্পের প্রতি ভাললাগা গড়ে ওঠে। এরপর বড় হবার সাথে সাথে বেড়েছে তার শিল্পানুরাগও। গান শিখছেন সেই ছোটবেলা থেকেই। সঙ্গীতশিল্পী হিসেবেও সাউন্দ্রির আলাদা একটা পরিচয় আছে। তবে সাংগঠনিক দায়িত্বের বাইরে একজন আইনজীবী হিসেবেই নিজের পরিচয় দিতে ভালবাসেন। প্রায় চার বছর আগে প্রতিষ্ঠিত সার্ক কালচারাল সেন্টারে বর্তমান পদে কাজ করছেন সংগঠনের প্রায় জন্মলগ্ন থেকেই। আর এই সংগঠনের পক্ষ থেকেই এনিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশে এলেন তিনি। প্রথমবার ঢাকায় এসেছিলেন সার্ক দেশগুলোর একটি নৃত্যকলা বিষয়ক উত্সবের আয়োজনে। সে তুলনায় এবারের আয়োজনটি একেবারে ভিন্ন বলেই জানালেন সাউন্দ্রি, ‘নাচের বিষয়টি অনেকটাই মানসিক উপলব্ধির ব্যাপার। সেখানে মূল বিষয়টি হূদয় দিয়ে অনুভব করতে হয়। আর হস্তশিল্পের ক্ষেত্রে মানুষ নান্দনিকতার পাশাপাশি প্রয়োজনকেও গুরুত্ব দেয়।’ তবে দু’বারের অনুষ্ঠানে ভিন্নতা থাকলো দু’বছর আগের ঢাকা আর এই ঢাকায় বস্তুগত-অবস্তুগত বড় কোন পরিবর্তনই চোখে পড়েনি বলে জানালেন সাউন্দ্রি। বললেন, ঢাকার রাস্তার সেই যানজট যেমন আগের মতোই আছে, তেমনি পাল্টায়নি মানুষের আচার-আচরণও। তারা এখনো আগের মতোই আন্তরিক এবং অতিথিপরায়ণ। কি উদ্দেশ্য সামনে রেখে এই সংগঠন যাত্রা শুরু করেছে এমন প্রশ্নের জবাবে ৫২ বছর বয়সী এই লঙ্কান জানালেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য খুবই সাধারণ। আমরা সাংস্কৃতিক বিষয়গুলোকে আসলে একটি উপকরণের মতো ব্যবহার করতে চাই। আপনি যদি সার্ক দেশগুলোর মধ্যে একটি টেকসই সম্পর্ক গড়ে তুলতে চান তাহলে সেখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে শিল্পকলা। তাছাড়া আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে এই দেশগুলোর (সার্ক দেশ) সংস্কৃতির মূল সুরটি কিন্তু প্রায় এক। সুতরাং আমরা যদি পরস্পরের মধ্যে এই সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো বিনিময় করতে পারি তাহলে সেটা হবে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য খুবই সহায়ক। আর সার্ক কালচারাল সেন্টার ঠিক সেটাই করতে চাইছে।’ ছোটবেলায় নিজের ঘরে যে পরিবেশ আর বাইরে বিভিন্ন কাজে পরিবারের যে সহযোগিতা পেয়েছেন দক্ষিণ এশিয়ার নারীদের একটি বিরাট অংশই সেটা থেকে বঞ্চিত। সাউন্দ্রি নিজেও জানেন দক্ষিণ এশিয়ার এই আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা। একারণেই এই সংগঠনকে কাজে লাগাতে চান এই অঞ্চলের নারীদের সহযোগিতার জন্য। তিনি বলেন, ‘আমি জানি যে সুযোগ আমি পেয়েছি সেটা আমাদের সমাজের অনেকেই (নারী) হয়তো পাবে না। আমরা চাই কালচারাল সেন্টারের মাধ্যমে সব নারীদের ছোট-বড় নানা অর্জন এবং তাদের তৈরি নানা দ্রব্যাদি মানুষের সামনে নিয়ে আসতে। যেন তারা নিজেদেরকে বঞ্চিত না ভাবে এবং তাদের পরিশ্রমের উপযুক্ত মূল্য পায়।’ হস্তশিল্পের ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে নারীর ভূমিকাই যে বেশি বললেন সে কথাও। প্রদর্শনীতে আমাদের দেশের আদিবাসী নারীদের অংশগ্রহণ এবং তাদের তৈরি করা নানা হস্তজাত দ্রব্যাদির দারুণ প্রশংসা ঝরলো সাউন্দ্রির কণ্ঠে। সব মিলিয়ে প্রদর্শনী সম্পর্কে নিজের সন্তুষ্টির কথাই জানালেন তিনি। তবে তাই বলে থেমে যেতে চান না এখানেই। যে উদ্দেশ্য নিয়ে সাংগঠনিক কাজে নেমেছেন সেখানে নিজে পুরোপুরি সফল বলতে নারাজ এই ভারতীয় বধূ। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা বেশ কিছু কাজ করেছি। আর এগুলোর মাধ্যমে আমি প্রতিনিয়তই শিখছি। এখনই নিজেকে সফল বা ব্যর্থ বলার সময় আসেনি। আমার ধারণা, আমার শিক্ষাগুলোকে যখন পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারবো তখনই কেবল নিজেকে সফল বলা যুক্তিসঙ্গত হবে।’ আর সে কাজে যে কালচারাল সেন্টারের পরিচালক আর সবার সহযোগিতা পাচ্ছেন বলতে ভুল করেননি সেটিও। মানুষের ভালবাসাকে পুঁজি করে সাউন্দ্রি এগিয়ে যান আর হাত ধরে সফল হোক সার্কের প্রকৃত উদ্দেশ্য; এই প্রত্যাশা আমাদেরও। আ ছে ও রা ও জাতীয় চিত্রশালার বিশাল গ্যালারিতে চলছে হস্তশিল্প প্রদর্শনী। দেশি-বিদেশি নানা অতিথি আর ক্রেতারা আসছেন। আফগানিস্তান থেকে শুরু করে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা আর এদেশের আদিবাসীদের তৈরি মন জুড়ানো নানা হস্তনির্মিত দ্রব্যাদি ঘুরে ফিরে দেখছেন। থেমে নেই দামদর করা আর কেনাকাটা। আর এই ব্যস্ততার মাঝে গ্যালারির এক কোণে একদল ছেলে-মেয়ে ব্যস্ত আগত অতিথিদের রসনাতৃপ্তিতে। কাছে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেল শিল্পকলা একাডেমিই তাদের ছয় জনকে দায়িত্ব দিয়েছে এই ফুড কর্নার চালানোর। আর লেখাপড়া আর দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের বাইরে এই কাজটি তারা উপভোগও করছেন খুব। দলের সবাই লেখাপড়া করছেন। কেউ আছেন শিক্ষাজীবন সমাপনী পর্যায়ে আবার ওবাইদুল ইসলামের মতো দুয়েকজন মাত্রই শুরু করেছেন সম্মান শ্রেণির লেখাপড়া। তবে এক সাথে কাজ করতে করতে বয়সের বাধা ডিঙ্গিয়ে তারা সবাই এখন বন্ধু। পরিচয়ের সূত্র কি এমন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতেই তাদের দলনেতা আসিফ আরমান জানালেন, একটি আবৃত্তি সংগঠনেই সবার পরিচয়। সেখানে কাজ করতে করতেই ধীরে ধীরে বন্ধু হয়ে ওঠা। আর সবাই একসাথে কাজ করতে পারবেন এমন নিশ্চয়তা পাওয়াতেই দল বেধে এই ফুড কর্নারের দায়িত্ব নেয়া।’ লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যই হচ্ছেন নারী। মেয়ে বাইরে কাজ করছে, রাতে একা একা ঘরে ফিরবে; এব্যাপারে বাবা-মায়ের কোন অভিযোগ আছে কিনা জানতে চাইলে দলের একজন মারিয়া জামান বললেন, ‘হ্যাঁ, সন্ধ্যার পরে বাসায় ফিরলে বাবা-মা তো একটু রাগ করেই। তবে এখানে সবাই অনেকদিনের পরিচিত বলে তারা মেনে নিয়েছেন।’ ইডেন কলেজ পড়ুয়া মারিয়ার কথায় সায় দিলেন সবাই। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর শেষ করতে যাওয়া সাম্মীরুল ইসলাম জানালেন, ‘সাথে বড় ভাই (আসিফ) থাকায় আমার তেমন কোন সমস্যায় পড়তে হয় না।’ প্রদর্শনী কেমন উপভোগ করছেন জানতে চাইলে সবাই একবাক্যে জানালেন, ‘খুব ভালো। যারা আসছেন সবাই বেশ সংস্কৃতিমনা বোঝাই যাচ্ছে। তাই অন্যান্য সব প্রদর্শনী আর মেলার মতো এখানে হৈ-হুল্লোড় খুব বেশি নেই। বেশ সুন্দর আয়োজন।’ কাজের ফাঁকে ফাঁকেই চলছে আড্ডাবাজি। হঠাত্ করেই হেসে উঠছেন সবাই। আবার ক্রেতা আসলেই সবাই পুরোদস্তুর দোকানী। বোঝাই যাচ্ছিল সময়টা বেশ উপভোগ করছেন তারা। কাজ বেশি হচ্ছে নাকি আড্ডা, প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নের জবাবে আসিফের গম্ভীর উত্তর, ‘আমরা আসলে হাসি-ঠাট্টার মধ্য দিয়েই সিরিয়াসলি কাজ করছি!’