সরকারি চাকুরেদের জন্য ২০% মহার্ঘ্য ভাতা

নৌকায় ভোট দিলে শান্তির বাংলাদেশ উপহার দেব

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীর উদ্দেশে বলেছেন, আগামী নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে এবং ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণ ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করতে আগামী নির্বাচনেও নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করুন। আমরা উন্নত-সমৃদ্ধ ও শান্তিময় বাংলাদেশ উপহার দেব। গতকাল রবিবার বিকালে গণভবনে ৬টি জেলার আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় বৈঠকে প্রারম্ভিক বক্তব্যে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। সম্প্রতি বিভিন্ন জনসভায় খালেদা জিয়ার বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতেই বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়া ‘হাসিনা মুক্ত বাংলাদেশ’ চান। আমি ক্ষমতায় না থাকলে উনি যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি দিয়ে আবার মন্ত্রী বানাতে পারবেন, আবারও লাখো শহীদের রক্তস্নাত জাতীয় পতাকা তাদের গাড়িতে তুলে দিতে পারবেন। আর এ কারণেই তিনি আমাকে ক্ষমতায় দেখতে চান না।” শেখ হাসিনা বলেন, উনি (খালেদা জিয়া) আমাকে দেখতে চান না বলেই তার ক্যাবিনেটের মন্ত্রী ও পুত্রকে দিয়ে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালিয়ে আমাকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বলেন, যে ১৫ আগস্ট আমার বাবা-মাসহ পরিবারের ১৮ জনকে হত্যা করা হয়েছিল, সেই দিনে খালেদা জিয়া মিথ্যা জন্মদিন পালনের নামে উল্লাস করেন। শনিবার সিলেটের জনসভায় ‘সাপকে বিশ্বাস করা যায়, আওয়ামী লীগকে নয়’ বলে খালেদা জিয়ার দেয়া বক্তব্যের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘উনিই (খালেদা জিয়া) তো সাপ নিয়ে চলছেন। স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবির ও হেফাজতকে নিয়ে উনি চলেন বলেই সাপকে বিশ্বাস করেন, আওয়ামী লীগকে নয়। দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করতে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে আবার বিজয়ী করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে প্রায় ৫ হাজারেরও বেশি নির্বাচন করেছে। একটি নির্বাচনেও আমরা হস্তক্ষেপ করিনি, কোন নির্বাচন নিয়েও কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেনি। তিনি বলেন, বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় বাংলাদেশের পরিচয়ই ছিল সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও জঙ্গিবাদের দেশ হিসেবে। প্রধানমন্ত্রী হয়েও খালেদা জিয়া দুর্নীতির কালো টাকা জরিমানা দিয়ে সাদা করেছেন। তার পুত্রের পাচারকৃত অর্থ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুরে ধরা পড়েছে। টাকা চুরি করা উনাদের চরিত্র বলে কিছুতেই তাদের লজ্জ্বা লাগে না। শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে সারাবিশ্ব থেকে দেশের জন্য পুরস্কার নিয়ে আসে, আর বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশের ভাগ্যে জুটে শুধুই তিরষ্কার। বিরোধী দলের অপপ্রচার সম্পর্কে দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, কোরআন শরিফ হাতে নিয়ে যারা মিথ্যা কথা বলেন, তারা কখনোই ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী হতে পারে না। এদের ব্যাপারে সবাইকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। কোরআন শরিফ দেখে কথা দিয়ে বা কিছু টাকার বিনিময়ে এসব মিথ্যাচারী ধর্মব্যবসায়ীদের কাছে ভোটের আমানত নষ্ট করবেন না। ধারাবাহিক সিরিজ বৈঠকের অংশ হিসেবে গতকাল ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঝালকাঠি, মেহেরপুর, মাদারীপুর, নড়াইল ও জয়পুরহাট জেলার আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে দলীয় সভানেত্রী এই ছয়টি জেলার সম্ভাব্য তিনজন করে প্রার্থীর তালিকা সংগ্রহ করেন। সূত্র জানায়, বৈঠকে বেশ কিছু জেলার তৃণমূল নেতারা স্ব স্ব এলাকার সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করেন। জবাবে শেখ হাসিনা সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে দল ও দেশের স্বার্থে দল মনোনীত প্রার্থীর পক্ষেই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে বিজয় নিশ্চিত করার জন্য তৃণমূল নেতাদের নির্দেশ দেন। মতবিনিময় সভায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, সতিশ চন্দ্র রায়, নূহ-উল-আলম লেনিন, মাহবুবউল আলম হানিফ, ডা. দীপু মনি, অধ্যাপক ড. আলাউদ্দিন আহমেদ, একেএম এনামুল হক শামীম, নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন এমপি প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। ‘আরো ৬ হাজার ৬শ’ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা’ গতকাল সকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের মহাসমাবেশে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রামপাল বিদ্যুেকন্দ্রের বিরোধিতাকারীদের সমালোচনা করে বলেন, দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়ায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ প্রকল্প রয়েছে। সেখানে তো অ্যাসিড বৃষ্টি হয়নি, মানুষ মরে যায়নি। সেখানে কৃষকেরা উত্পাদন করছে। তাহলে রামপাল নিয়ে যে হায় হায় রব পড়ে গেছে, সেটার অন্য কোন উদ্দেশ্য রয়েছে। আমরা জানি, কোথায় কী করতে হবে। সুন্দরবনের ক্ষতি আমরা নিশ্চয় চাই না। তিনি বলেন, সরকার আরও ছয় হাজার ৬০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সংবিধান অনুযায়ী আগামী দশম জাতীয় নির্বাচন করার দৃঢ় প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, বিশ্বের অন্যান্য সংসদীয় পদ্ধতির দেশগুলোতে যেভাবে নির্বাচন হয়, বাংলাদেশেও আগামী নির্বাচন সেভাবেই হবে। আর উন্নয়ন চাইলে জনগণ ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগকেই ভোট দেবে। অনুষ্ঠানে সরকারি চাকরিজীবীদের ২০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা দেয়ার ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য স্থায়ী পে-কমিশন গঠন করা হবে। বর্তমান মহাজোট সরকারের সময়ে নির্বাচন কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) স্বাধীনভাবে কাজ করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের সময়ে অনুষ্ঠিত সবগুলো নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয়েছে। যে কারণে পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী বিজয়ী হয়েছে। এসব নির্বাচনে মাগুরা উপ-নির্বাচনের মতো প্রভাব খাটানো হয়নি। শেখ হাসিনা বলেন, ২০০৮ সালে জনগণ ভোট দিয়ে আমাদের নির্বাচিত করেছে। জনগণের রায় নিয়ে আমরা সংবিধান সংশোধন করেছি। ১৯৭৫ সালের পর একমাত্র ১৯৯৬ সালেই শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের আমানত যাতে খেয়ানত হতে না পারে, সে জন্যই আমরা সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচনের উদ্যোগ নিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের নানা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের বিবরণ তুলে ধরে এর ধারাবাহিকতা ধরে রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, গাজীপুর, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের জয়ী করে এখন জনগণের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে মহাসমাবেশের কার্যক্রম শুরু হয়। পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের সভাপতি বিচারপতি এ এফ মিসবাহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সংগঠনের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক এস এম নজরুল ইসলামসহ সংগঠনের বিভাগীয় নেতারাও অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের ওপর হত্যা ও রাজনৈতিক নিপীড়ন, জঙ্গিবাদের উত্থান, বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর উন্নয়ন, নারী অবমানা করে হেফাজতে ইসলাম নেতা আহমেদ শফীর বক্তব্যের ভিডিও উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের মহাসচিব অধ্যাপক কামরুল হাসান খান বক্তব্য শুরু করেন।