প্রিয় লেখক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০১৩, ১৮:৪৫
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ছিলেন বাংলা শিশু সাহিত্যের অমর প্রাণ এবং বাংলা মুদ্রণ জগতের অগ্রপথিক। তিনি ১৮৬৩ খ্রিষ্টাব্দের ১০ মে কিশোরগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন।
তিনি ছিলেন একাধারে লেখক, চিত্রকর, প্রকাশক, শখের জ্যোতির্বিদ, বেহালাবাদক ও সুরকার। সন্দেশ পত্রিকা তিনিই শুরু করেন যা পরে তার পুত্র সুকুমার রায় ও পৌত্র সত্যজিত্ রায় সম্পাদনা করেন। গুপি-গাইন-বাঘা-বাইন, টুনটুনির বই ইত্যাদি তারই অমর সৃষ্টি।
উপেন্দ্রকিশোরের জন্ম ১২৭০ বঙ্গাব্দের ২৭ বৈশাখ। [১৮৬৩ সালের ১০ মে] ময়মনসিংহ জেলার মসূয়া গ্রামে, যা অধুনা বাংলাদেশে অবস্থিত। তার পিতা কালিনাথ রায় ছিলেন সুদর্শন ও আরবি, ফারসি ও সংস্কৃতে সুপন্ডিত। তার ডাকনাম ছিলো শ্যামসুন্দর মুন্সী। উপেন্দ্রকিশোর শ্যামসুন্দরের আটটি সন্তানের মধ্যে তৃতীয় পুত্রসন্তান। তার পৈত্রিক নাম ছিলো কামদারঞ্জন রায়। পাঁচ বছরেরও কম বয়সে তার পিতার অপুত্রক আত্মীয় জমিদার হরিকিশোর রায়চৌধুরী তাকে দত্তক নেন ও নতুন নাম দেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। [Upendrokishore Raychowdhury]।
মেধাবী ছাত্র বলে পড়াশোনায় ভালো ফল করলেও ছোটবেলা থেকেই উপেন্দ্রকিশোরের পড়াশোনার থেকে বেশি অনুরাগ ছিলো বাঁশি, বেহালা ও সংগীতের প্রতি। ময়মনসিংহ জেলা স্কুল থেকে উপেন্দ্রকিশোর প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বৃত্তি পান। তারপর কলকাতায় এসে ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে।
একুশ বছর বয়সে বিএ পাস করে ছবি আঁকা শিখতে আরম্ভ করেন উপেন্দ্রকিশোর। এই সময় তিনি ব্রাহ্ম সমাজের সদস্য হওয়ায় তার অনেক আত্মীয়ের সঙ্গে মনোমালিন্য ঘটে। ছাত্র থাকাকালীনই তিনি ছোটদের জন্যে লিখতে আরম্ভ করেন। সেই সময়কার সখা, সাথী, মুকুল ও জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি থেকে প্রকাশিত বালক নামে মাসিক পত্রিকাগুলোতে তার লেখা প্রকাশ হতে শুরু হয়। প্রথমদিনের [যেমন সখা, ১৮৮৩] প্রকাশিত লেখাগুলো ছিলো জীববিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ। তার পরে চিত্র অলঙ্করণযুক্ত গল্প প্রকাশিত হতে আরম্ভ হয়।
১৮৮৬ সালে ২৩ বছরের উপেন্দ্রকিশোরের সঙ্গে বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক ব্রাহ্ম সমাজের দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম কন্যা বিধুমুখীর বিবাহ হয় এবং তখনকার কলকাতার কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের ব্রাহ্ম সমাজের মন্দিরের বিপরীতে লাহাদের বাড়ির দোতলায় কয়েকটি ঘর ভাড়া নিয়ে উপেন্দ্রকিশোরের সংসার জীবন শুরু হয়। উপেন্দ্রকিশোরের তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। ছেলেরা হলেন সুকুমার, সুবিনয় ও সুকোমল এবং মেয়েরা হলেন সুখলতা, পুণ্যলতা ও শান্তিলতা।
যোগীন্দ্রনাথ সরকারের সিটি বুক সোসাইটি থেকে তার প্রথম বই ‘ছেলেদের রামায়ণ’ প্রকাশিত হয়। এই বইটি সমাজে অতি আদরের সঙ্গে সমাদৃত হলেও মুদ্রণ সম্বন্ধে অতৃপ্ত উপেন্দ্রকিশোর ১৮৮৫ সালে বিদেশ থেকে তখনকার দিনের আধুনিকতম মুদ্রণ যন্ত্রাংশাদি নিজের খরচায় আমদানি করেন এবং ৭ নম্বর শিবনারায়ণ দাস লেনে নতুন ভাঙাবাড়ি নিয়ে ইউ রায় অ্যান্ড সন্স নামে নতুন ছাপাখানা খোলেন। এখানের একটি কামরায় তিনি নিজের আঁকার স্টুডিও খোলেন এবং সেখানে হাফটোন ব-ক প্রিন্টিং নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। ১৯১১ সালে তিনি বড় ছেলে প্রখ্যাত ছড়া লেখক সুকুমার রায়কে বিলাতে পাঠান ফোটোগ্রাফি ও মুদ্রণ সম্বন্ধে উচ্চশিক্ষা লাভ করার জন্যে।
১৯১৫ সালের ২০ ডিসেম্বর মাত্র বায়ান্ন বছর বয়সে উপেন্দ্রকিশোর পরলোকগমন করেন।