আমার কথা
প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০১৩, ১৮:৪৮
জাহাঙ্গীর আলম জাহান
আমার লেখালেখি শুরু হয়েছিল একেবারেই বালক বয়সে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় পাঠ্যপুস্তকে ‘বাকবাকুম পায়রা/মাথায় দিয়ে টায়রা’, ‘আমি এক কানাই মাষ্টার পড়ো মোর বিড়াল ছানাটি’ কিংবা ‘আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা ফুল তুলিতে যাই’ এইসব ছড়া-কবিতার অন্ত্যমিল আমাকে প্রচণ্ডভাবে টানতো। বাবার চাকরির কারণে আমার শৈশব কেটেছে কুমিল্লা আর ঈশ্বরদীতে। বছরে একবার আমরা গ্রামের বাড়িতে আসতাম। গ্রামে এলে গ্রামীণ বন্ধুদের সাথে মেতে উঠতাম নানান খেলায়। হাডুডু খেলতে গিয়ে গ্রামের বন্ধুরা এক দমে বিভিন্ন রকম লৌকিক ছড়া দিয়ে ‘ছি’ ধরতো। সেই ছড়ার অন্ত্যমিলও আমাকে এতটাই বিমোহিত করতো যে ওদের কাছ থেকে এক সময় আমিও ছড়াগুলো শিখে নিয়েছিলাম।
এছাড়াও আমার বড় চাচাত বোন সাফিয়া বু’র কাছ থেকেও বেশকিছু লৌকিক ছড়া আমার শেখা হয়ে গিয়েছিল। সাফিয়া বু ছোট্ট গোল ফ্রেমে সাদা রুমাল বা বালিশের কভার বেঁধে রঙিন সুই-সুতোর কম্বিনেশনে ফুল-পাখি-লতা-পাতা ইত্যাদি বুনন করতেন। পাশে রঙিন সূতোয় ছন্দোবদ্ধ কবিতার লাইনও বুনন করতেন সাফিয়া বু। সেই কবিতার লাইনগুলো আজও আমার মগজে গেঁথে আছে। যেমন— ‘পুকুরেতে পানি নাই পদ্ম কেন ভাসে/যার সাথে দেখা নাই সে কেন হাসে’।
১৯৫৭ থেকে ’৭১ পর্যন্ত বাবার চাকরির কারণে আমরা থাকতাম ঈশ্বরদী শহরে। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের পর বাঙালির অন্তরে স্বাধীনতার স্পৃহা প্রবলতর হয়ে ওঠে। শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। আব্বা ছিলেন এক্স আর্মি পার্সন। প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরেই তিনি আমাদের মহল্লার তরুণ-যুবকদের একত্রিত করে ঈশ্বরদী ইউনিয়ন পরিষদ মাঠে (বর্তমানে পৌরসভা) কাঠের ডামি রাইফেল সহযোগে সামরিক প্রশিক্ষণ দিতেন। উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের জন্য তরুণদের তৈরি করা। প্রচুর বিহারী অধ্যুষিত ঈশ্বরদী শহরে আমার বাবার এই কর্মকাণ্ড বিহারীরা ভালো চোখে দেখেনি। ১৪ এপ্রিল ঈশ্বরদীতে পাকবাহিনীর আগমন ঘটলে আমার বাবা বিহারীদের প্ররোচনায় হানাদার বাহিনীর টার্গেটে পরিণত হন। যার ফলস্বরূপ ঈশ্বরদীতেই আব্বা ওদের নির্মমতায় প্রাণ হারান। তার লাশটিও আমরা খুঁজে পাইনি। বাবাকে হারিয়ে জুলাই মাসে দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে এবং কিছুপথ ট্রেনে চড়ে আমরা গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জে ফিরে আসি।
আব্বার মৃত্যুর কথা মনে হলেই আমাদের বাড়িতে মা আর ভাই-বোনদের মধ্যে কান্নার রোল শুরু হতো। আমি ছোটবেলা থেকেই লোক দেখানো বিলাপের পক্ষপাতি ছিলাম না। বাড়িতে যখন কান্নার রোল পড়তো আমি তখন নির্লিপ্ত ভঙ্গিমায় খেলাধূলা নিয়েই ব্যস্ত থাকতাম। এসব দেখে পাড়ার মুরুব্বি মহিলারা আমাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতো। ওদের ভাষায় আমি নাকি পাষাণ, জড়পদার্থ। আমার নাকি কোনো অনুভূতি নেই। হূদয়-আবেগ কিছুই নেই। মুরুব্বি মহিলাদের এ-রকম টিপ্পনিতে এক সময় আমার ভেতর অবদমিত লেখক-সত্তাটি জেগে ওঠে। ওদের লাগাতার অভিযোগের জবাবে আমি একদিন লিখে বসি আমার জীবনের প্রথম কবিতা, ‘জল ঝরিয়ে কাঁদলেই কি কান্না শুধু হয়/হূদয় কাঁদে গুমরে গুমরে সেটা কি কান্না নয়?’ সেই যে শুরু তারপর আর থামাথামি নেই। এটি ১৯৭২ সালের কথা। সে সময় বাবার রেখে যাওয়া ওয়ান ব্যান্ডের ছোট্ট রেডিওটিই ছিল আমার নিত্যদিনের বিনোদন-সঙ্গী। তখন রেডিও’র ঢাকা কেন্দ্র থেকে প্রতি শুক্রবার প্রচারিত হতো ছোটদের আসর কলকাকলি। এ আসরে দূর-দূরান্তের নবীন লিখিয়েদের ছড়া-কবিতা প্রচার করা হতো। আমি অনেক ছড়া সে আসরে পাঠিয়েছি। কিন্তু মনোনীত না হওয়ায় একটি ছড়াও প্রচার করা হয়নি। তবু আমি দমে যাবার পাত্র নই। একের পর এক ছড়া লিখি আর কলকাকলিতে পাঠাই। শুক্রবার এলেই গভীর মনোযোগে কলকাকলি আসর শুনি। ১৯৭৩-এর মাঝামাঝি সময়ে হঠাত্ একদিন কালকাকলি আসরে আমার একটি ছড়া প্রচার করা হ’ল। আমার সেকি আনন্দ!
প্রিন্ট মিডিয়ায় আমি লেখালেখি শুরু করি অনেক পরে। ১৯৭৯ সালে সর্বপ্রথম দৈনিক সংবাদ-এর খেলাঘর পাতায় আমার ছড়া প্রকাশ পায়। তারপর আশির দশক থেকে দেশের উল্লেখযোগ্য প্রায় প্রতিটি দৈনিকেই নিয়মিত ছড়া-কবিতা লিখে আসছি। এছাড়াও মাসিক শিশু, মাসিক সবুজপাতা, মাসিক অগ্রপথিক, মাসিক সাতরংসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লিখে আসছি নিয়মিত। সাহিত্যের অন্যান্য বিষয়ে কাজ করলেও ছড়াই আমার প্রধান সাহিত্য-মাধ্যম। ছড়া, কবিতা, মুক্তিযুদ্ধ, লোকসাহিত্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে এ যাবত আমার ৩০টি গ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছে।