দু’জনার একটি চিঠি
প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০১৩, ১৮:১১
ভালো মানের নাটক নির্মাণের জন্য মানানসই জুটির বিষয়টা জরুরি। মানানসই জুটি হলে একে অপরের অভিনয়টাও অনেক সুন্দর লাগে। অবশ্য দর্শকের কাছে সজল-মিম জুটির রয়েছে বেশ ভালো গ্রহণযোগ্যতা। আসছে ঈদের জন্য নির্মিত ‘এবং একটি চিঠি’ টেলিফিল্মে তারা আবারও জুটিবদ্ধ হয়ে অভিনয় করেছেন। এই দুই তারকার গল্প নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন। লিখেছেন খালেদ আহমেদ
গতানুগতিক নায়িকা চরিত্রের মাঝে নিজেকে কখনোই বন্দি করতে চাননি লাক্সসুন্দরী মিম। তার ভাষ্যে, ‘আমি লাক্স-চ্যানেল আই সুন্দরী প্রতিযোগিতা থেকে এসেছি বলে অনেকে হয়তো ধরে নিয়ে ছিলেন, অন্য কারো কারো মতো আমিও গতানুগতিক নায়িকা চরিত্রগুলোতে কাজ করব। কিন্তু তা না করে আমি একটু ভিন্ন পথে হেঁটেছি। আমি সব সময় সেই সব চরিত্রে কাজ করেছি, যেখানে আমার অভিনয়ের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। আমার মনে হয় আমি কিছুটা হলেও পেরেছি।’ মিম অভিনীত উল্লেখযোগ্য নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে—‘বনলতা সেন’, ‘কোনো এক প্রেমিক’, ‘আমাদের ফলো করুন’, ‘বাদলা দিনে’, ‘পরী কিংবা তার বাবার গল্প’, ‘তবুও তুমি আমার’, ‘ছেলেটি ঢাকা এসেছিল’, ‘যান্ত্রিক ভালোবাসা’, ‘এমনি বিএস’, ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’, ‘অলসপুর’, ‘উত্তরাধিকার’, ‘টো টো কোম্পানি’ প্রভৃতি। এর মধ্যে আকরাম খানের পরিচালিত ‘বনলতা সেন’ নাটকে মিমের অনবদ্য অভিনয় সবার নজর কেড়েছিল। বিজ্ঞাপনচিত্রে কাজের প্রতি মিমের ঝোঁকটা বরাবরই একটু কম। তবে এই লাক্সতারকা যে কয়েকটি বিজ্ঞাপনচিত্রে কাজ করেছেন, প্রায় সবগুলোর জন্যই ভালো সাড়া পেয়েছেন। মাঝে বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচারিত বিভিন্ন বিজ্ঞাপনচিত্রে মিমের উপস্থিতি দর্শকদের মাঝে তাকে খানিকটা সমালোচিত করেছে। প্রয়াত জননন্দিত নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের ‘আমার আছে জল’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে মিম রুপালি পর্দায় নাম লেখান। বাণিজ্যিক ধারার এ ছবিতে তার নায়ক ছিলেন ফেরদৌস। এরপর জাকির হোসেন রাজু পরিচালিত শাকিব খানের বিপরীতে তার অভিনীত বাণিজ্যিক ধারার ছবি ‘আমার প্রাণের প্রিয়া’-এর সফলতার পর একাধিক নির্মাতা ও প্রযোজক নতুন চলচ্চিত্রে কাজের ব্যাপারে অফার করলে তা তিনি সানন্দে গ্রহণ করেন। এরমধ্যে খালিদ মাহমুদ মিঠু পরিচালিত ‘জোনাকির আলো’ শিরোনামের চলচ্চিত্রে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করছেন মিম। ছবিটিতে আরও অভিনয় করছেন চঞ্চল চৌধুরী ও ইমন। এর বাইরে নবীন পরিচালক তন্ময় তানসেন পরিচালিত ‘পদ্ম পাতার জল’ ছবির প্রথম লটের কাজ শুরু হয়েছে। চলতি বছরেই এই ছবি দুটো মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে। সেই সাথে তার কাছে আরও কয়েকটি নতুন চলচ্চিত্রের অফার রয়েছে। নিজের চলচ্চিত্রের ক্যারিয়ার প্রসঙ্গে মিম বলেন, ‘চলচ্চিত্রে সাফল্য আসলে ভাগ্যের ব্যাপার। তবে আমি লাকি যে, আমার আগের দুটি ছবিই ব্যবসা সফল হয়েছে। এখন প্রতিনিয়ত চলচ্চিত্রের অফার আসছে। বেছে বেছে ছবির কাজ করছি। আশা করছি, খুব শিগগিরই ভালো কিছু ছবির মাধ্যমে আমার চলচ্চিত্রের ক্যারিয়ারে একটা স্থায়িত্ব আনতে পারব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি এ বছর চলচ্চিত্রকে গুরুত্ব দেব। চলচ্চিত্রে কিন্তু একটা পরিবর্তন আসছে। আমি এ সুযোগ ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে চাই। কিছু ভালো ছবিতে কাজ করার ইচ্ছা আছে।’ এই লাক্স সুন্দরী বর্তমানে বেশ কয়েকটি এক খণ্ডের নাটকে অভিনয় করছেন। ভবিষ্যতের ভাবনার কথা জানতে চাইলে প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী মিম বলেন, ‘ভালো অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকের হূদয়ে টিকে থাকতে চাই।’ অন্যদিকে টিভি মিডিয়ায় তার বলবার মতো অর্জনের জায়গাটি সজল তৈরি করে নিয়েছেন অনেক আগেই। তারপর থেকে একে একে শুধুমাত্র নিজের জনপ্রিয়তা আর অভিনয় দক্ষতার সাথেই যেন হাত ধরাধরি করে এগিয়ে গেছেন দর্শকপ্রিয় এই অভিনেতা। এ কারণে টিভি নাটকের অভিনেতা হিসেবে তাকে পরিচয় করিয়ে দিতে এখন আর বাড়তি কোনো বিশেষণের প্রয়োজন হয় না। অভিনয়ের শুরুর কথা জানতে চাইলে তিনি সুন্দর একটি হাসি উপহার দিয়ে বলেন, ‘তখন সবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা দিয়েছি। তাই পৃথিবীটাও অন্যরকম, ভালোমন্দের মিশেলে রঙিন ভুবন। অনুষ্ঠানে হৈচৈ লাফালাফির মধ্যেই চোখে পড়ে যাই কোকাকোলা প্রতিনিধির। এবং তখনই কোকাকোলার বিজ্ঞাপনে কাজ করার প্রস্তাবটা আসে। সেই থেকে শুরু। আর বিজ্ঞাপনচিত্রে কাজ করতে গিয়ে গুণী নির্মাতা ও অভিনেতা আফজাল হোসেনের সান্নিধ্য পাই। এরপর বন্ধু তন্ময় এসে একদিন বলল, চল আমরা হাসতে হাসতে একটি নাটক তৈরি করে ফেলি। কেউ দেখুক বা না দেখুক আমরাই দেখব। সেই বন্ধুর কথাতেই ‘তখন জানতে বাকি’ নাটকে কাজ করলাম। নাটক দেখে আফজাল হোসেন তো মহা খ্যাপা। ফোন দিয়ে খুব করে বকাবকি করলেন। আফজাল হোসেনের কথা শুনে অভিমান হলো খুব। পণ করেছিলাম জীবনে আর কখনও নাটকে অভিনয় করব না। এটাই শেষ। পরে সেই আফজাল হোসেনই বাসায় ডেকে ধরে ধরে বোঝালেন বিজ্ঞাপন ও নাটকে কাজ করার পার্থক্য—সংলাপগুলো কখন কীভাবে আওড়াতে হয়, কিভাবে এক্সপ্রেশন দিতে হয়। এরপর থেকেই অভিনয় করে যাচ্ছি।’ মাস্তান, পুলিশ, চোর, ডিরেক্টর থেকে শুরু করে এমন কোনো চরিত্র নেই, যে ভূমিকায় সজল অভিনয় করেননি। নিজের অভিনীত চরিত্রগুলো সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘গতানুগতিক চরিত্রের বাইরে ভিন্ন মাত্রার চরিত্রের প্রতি আমি সব সময়ই দুর্বল। প্রতিটি নাটকে অভিনয়ের আগেই আমি হোমওয়ার্ক করি। অভিনয়ের জন্য চরিত্রকে বোঝা ও পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা একজন অভিনেতা বা অভিনেত্রীর মধ্যে থাকতে হবে। আমি বরাবরই কোনো একটি চরিত্রে অভিনয় করার আগে স্ক্রিপ্ট ভালোভাবে পড়ি। পরিচালকের কাছে চরিত্র সম্পর্কে ব্রিফ নিই। এরপর ওই চরিত্রটি নিজের ভেতর ধারণ করি।’ সজলের কাছে নিজের অভিনীত পছন্দের কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে কৌশিক শংকর দাসের পরিচালনায় ‘একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা নাটক’, আলভি আহমেদের ‘ওসিডি’, অঞ্জন আইচের পরিচালনায় ‘চশমা পরিবার’, ‘মেয়েটি জাতিস্মর অথচ সেদিন ছিল অহেতুক অমাবস্যা’ ও ‘একটি বিবর্ণ রাতের গল্প’, জয়ন্ত মণ্ডল ও সাজ্জাদ সনির পরিচালনায় ‘শেষ চিঠি’, মিজানুর রহমান লাবুর পরিচালনায় ‘বিষ্যুদবারের কালো গোলাপ’, সকাল আহমেদের ‘ভোটিং লাইফ’ উল্লেখযোগ্য। ভবিষ্যতের স্বপ্ন প্রসঙ্গে সজল বলেন, ‘আমি খুব বেশি স্বপ্ন দেখি না। সুন্দরভাবে থাকার চেষ্টা করি সব সময়। আর ভালো থাকতে পছন্দ করি। আগামীতে আরও ভালো অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকের মনে ঠাঁই করে নিতে চাই।’ লাক্সতারকা মিম যতগুলো নাটকে অভিনয় করেছেন বেশিরভাগ নাটকেই সজল ছিলেন বিপরীতে। যে কারণে দর্শকের কাছে ‘সজল-মিম’ জুটিরও রয়েছে বেশ ভালো গ্রহণযোগ্যতা। আসছে ঈদের জন্য নির্মিত ‘এবং একটি চিঠি’ শিরোনামের একটি নাটকে দর্শকপ্রিয় এই জুটি আবারও একসাথে অভিনয় করলেন। এটি রচনা করেছেন মাহবুব বাপ্পী এবং পরিচালনা করেছেন ইভান রেহান। আবারও সজলের সাথে কাজ করা প্রসঙ্গে মিম বলেন, ‘একজন অভিনেতা হিসেবে সজল ভাই একজন সিরিয়াস পারফর্মার। দারুণ কো-অপারেটিভ তিনি। তার সাথে অভিনয় করতে আমি সব সময়ই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। মানুষ হিসেবেও সজল ভাই অসাধারণ।’ আর সজল বলেন, ‘শুরু থেকেই মিম তার প্রতিটি কাজের ক্ষেত্রে খুব সিরিয়াস। ভবিষ্যতে তার অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে বলেই আমি মনে করি।’ সজল মিম প্রথম জুটিবদ্ধ হয়ে অভিনয় করেন হিমেল আশরাফের একটি নাটকে। এরপর তারা দুজন বহু নাটকে অভিনয় করেছেন। গত রোজার ঈদে সজল অভিনীত সবচেয়ে আলোচিত নাটক ছিল শাহীন কবির টুটুল পরিচালিত ‘লুকোচুরি’। এই নাটকে তিনি জনপ্রিয় পাঁচ অভিনেত্রীর বিপরীতে অভিনয় করেছেন। অন্যদিকে মিজানুর রহমান আরিয়ান পরিচালিত টেলিফিল্ম ‘ট্যাম্প কার্ড’-এ দুটি ভিন্ন চরিত্রে মিমের অভিনয় দর্শককে ব্যাপকভাবে মুগ্ধ করে। বন্ধুত্ব, প্রেম, দাম্পত্য টানাপোড়েনের গল্প নিয়ে নির্মিত টেলিফিল্ম প্রসঙ্গে মিম বলেন, ‘এর গল্পটা বেশ মজার। সব মিলিয়ে কাজটি করতে পেরে ভালো লেগেছে।’ সজল বলেন, ‘এর আগেও আমি ও মিম এই নির্মাতার সাথে কাজ করেছি। এই টেলিফিল্মের গল্প ও নির্মাণ ভালো হয়েছে। আশা করছি দর্শকদের ভালো লাগবে।’