তারুণ্যের অগ্রযাত্রায় বড় বাধা বেকারত্ব
প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০১৩, ২২:৫৬
বরিশাল বিএম কলেজ থেকে স্নাতক সম্মান (রসায়ন) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণি পেয়েছেন সোহেল (ছদ্মনাম)। গত পাঁচ বছরে ২৫টি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিলেও একটি চাকরি তার ভাগ্যে জোটেনি। বেকার জীবন থেকে মুক্ত হবার জন্য দু’বার আত্মহননেরও চেষ্টা করেন সোহেল। কিন্তু সফল হননি। বেকারত্বের দু:সহ ভার নিয়ে অর্থকষ্টে দিন কাটে তার। নিজের ও পরিবারের ভরণপোষণের টাকা আয়ের জন্য সে এখন কী করবে? অসত্ পথে গিয়ে টাকা আয় করবে নাকি সবকিছু ভুলে যাওয়ার জন্য অন্ধকার পথে পা বাড়াবে! এমন দোলাচলে জীবন কাটছে এখন এই বেকার তরুণের।
সোহেলের মতো দেশে কয়েক লাখ তরুণ বর্তমানে বেকার। গভীর হতাশা নিয়ে পথ চলছেন তারা। দেশে শিক্ষা সমাপ্তির পর বেকার জীবন যেন বেশিরভাগ তরুণেরই নিয়তি। বেকারত্ব থেকে হতাশা, অত:পর রাগ, ক্ষোভ, অসন্তোষ, অবিশ্বাস ও অস্থিরতার মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছে তারা। এসব নেতিবাচক আবেগ-অনুভূতি এক পর্যায়ে তাদের অনেককে নিয়ে যাচ্ছে অন্ধকার পথে। কেউ অসত্ পথে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করছেন, কেউবা মাদকের মধ্যে জীবনের স্বস্তি খুঁজে ফিরছেন। আবার কেউ কেউ সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিলেও নষ্ট হওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করছেন।
রবি তাদেরই একজন। শাওন, রবি, সজল ও সজিব (ছদ্মনাম) চার বন্ধু। ২০০৬ সালে লেখাপড়া শেষ করেছেন সরকারি বাংলা কলেজ থেকে। এদের মধ্যে তিনজন চাকরি করছেন। রবি এখনও বেকার। অতীতের মতো চার বন্ধুর আড্ডায় এখন আর সে থাকছে না। ক্ষোভ, লজ্জায় নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। বেকার এই তরুণ ইত্তেফাককে জানান, ‘কোন্ মুখ নিয়ে সবার সামনে যাবো? সরকারি চাকরির বয়স অনেক আগেই শেষ, কিন্তু আমি বেকার। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি খোঁজার চেষ্টা করেছি। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি। তাই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি। যারা বেকার তারা আমার মনের অবস্থা বুঝতে পারবে। আমার জন্য দোয়া করবেন যেন আমি অনেকের মতো অন্ধকার পথে পা না বাড়াই।’
পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী দেশে কর্মক্ষম বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখের বেশি। তবে কারো কারো মতে এই সংখ্যা ৫০ লাখের কম হবে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেকার জীবনে ব্যর্থতা ও হতাশা সবসময়ই আক্রান্ত করতে পারে। চেষ্টা ও সংগ্রামে বিফল হয়ে কেউ যখন নিজের ও অপরের জন্য ধ্বংসাত্মক কাজে নিজেকে নিয়োগ করে, তখন সেটা কেবল তার নিজের বা পরিবারের জন্য নয়, গোটা সমাজের জন্য হয়ে ওঠে ভয়ঙ্কর। হতাশ তরুণরা যে সকল অপরাধকর্মে সহজেই জড়িয়ে পড়ে, তার মধ্যে মাদকাসক্তি প্রধান।
আলিফ নামে এক তরুণ জানায়, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছি। কিন্তু আমার অনেক সহপাঠী আছে, যারা এখনো বেকার। কোথাও চাকরি না পেয়ে অনেকেই এখন মাদকাসক্ত। তিনি বলেন, চাকরি না পেয়ে আবার অনেক তরুণ ব্যবসা করছেন। এদের সংখ্যাও কম।
মিরপুরের পল্লবীর বাসিন্দা মোরশেদ এই প্রতিবেদককে জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে চাকরি খুঁজেছেন। চাকরির জন্য সুপারিশ প্রয়োজন। কিন্তু তার এমন কোন লোক নেই। বেকার এই তরুণ বলেন, ‘চাকরির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। কিন্তু কোন লাভ হয়নি। বাবা-মা বাড়ি থাকেন। তারা আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। কবে আমি চাকরি পেয়ে তাদের টাকা পাঠাতে পারবো। কিন্তু আমি জানি, আমি চাকরি পাবো না। তাই সবকিছু ভুলে যাওয়ার জন্য এখন কিছুটা অন্যপথে হাঁটছি।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আফজাল হোসেন বলেন, প্রতিটি তরুণই শিক্ষাজীবন শেষে চাকরি চায়। কিন্তু বার বার চেষ্টা করেও চাকরি না পেয়ে যখন যে বেকার থাকে তার মধ্যে মানসিক যন্ত্রণা বা মনোবেদনা তৈরি হয়। এই মানসিক যন্ত্রণা ভোলার জন্য অনেকে অন্ধকার পথে পা বাড়ায়। কেউ মাদকাসক্ত হয়, আবার কেউ আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়। এই মনোবিজ্ঞানীর মতে, বেকার তরুণরা দুটি কারণে হতাশ, প্রথমত ভবিষ্যত্ গড়ার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং দ্বিতীয়ত পরিবারের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারা।
মানস এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ডা. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, চাকরি না পাবার ব্যর্থতা থেকে অনেক তরুণ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, সরকারি তথ্য অনুযায়ী দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৫০ থেকে ৬০ লাখ বলা হলেও আমার মতে এ সংখ্যা ১ কোটি। দেশের মাদকাসক্তদের মধ্যে ৫০ ভাগই তরুণ। এর মধ্যে ১০ থেকে ১৫ ভাগ চাকরি না পাওয়ায় হতাশাগ্রস্ত।
রফিকুল আলম নামে এক অভিভাবকের মতে, ঘরে যাদের বেকার ছেলে আছে, সেসব অভিভাবক হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছেন ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের সমস্যা। বেকার সন্তানদের নিয়ে আজ তারাও হতাশ। চাকরির অনিশ্চয়তা থেকে তরুণ সমাজে হতাশা বাড়ছে। হতাশাগ্রস্তদের অনেকেই মাদকাসক্তির শিকার হচ্ছেন। সমাজ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তরুণদের এই হতাশা ও ক্ষোভ প্রতিনিয়ত নানারকম ধ্বংসাত্মক ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। তারুণ্যের স্বপ্ন-সম্ভাবনা শিক্ষাঙ্গন পেরিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ পর্যন্ত কতটুকু টিকে থাকে, আর কতটা স্বপ্নভঙ্গের বেদনা ও হতাশায় বিলীন হয়, তার কোনো সঠিক তথ্য-পরিসংখ্যানও কারো জানা নেই।