কর্মী বিচ্ছিন্ন কাউকে মনোনয়ন দেয়া হবে না :প্রধানমন্ত্রী
প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০১৩, ২৩:০০
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা দল যাকে মনোনয়ন দেবে তাকে বিজয়ী করতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জন্য দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তবে তিনি এও বলেছেন, কর্মী-বিচ্ছিন্ন কাউকে আগামী জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়া হবে না। তৃণমূল নেতাদের মতামত এবং বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত জরিপ পর্যালোচনা করেই বিজয়ী হতে পারবেন এমন নেতাদেরই মনোনয়ন দেয়া হবে।
গতকাল বুধবার গণভবনে আওয়ামী লীগের আটটি জেলার তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার মতবিনিময় বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, মহাজোটগতভাবেই আমরা নির্বাচন করবো। কিন্তু সর্বাগ্রে আমরা দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করতে চাই। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বলিয়ান হয়ে ‘নৌকা’ মার্কাকে বিজয়ী করার জন্য তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান।
এর আগে বৈঠকের সূচনা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামে হেফাজত নেতা মুফতি ইজহারুলের মাদ্রাসায় ভয়াবহ গ্রেনেড ও বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, আমাদের বিরোধী দলীয় নেত্রী (খালেদা জিয়া) এখন কী জবাব দেবেন? এই হেফাজত ও জামায়াত-শিবিরকে সঙ্গে নিয়ে তিনি (খালেদা জিয়া) গ্রেনেড-বোমা হামলা করে ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করতে চান। ক্ষমতা দখল করে উনি দেশে যুদ্ধাপরাধী ও স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজত্ব সৃষ্টি করতে চান। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির অস্তিত্ব ধ্বংস করতে চান। এদের ব্যাপারে দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। এরা যদি ক্ষমতায় আসে বাংলাদেশের অবস্থা কী হবে, কী ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে- তা একটু চিন্তা করে দেখার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আর যাতে ভবিষ্যতে এসব সন্ত্রাসী, জঙ্গিবাদ অপশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে সেজন্য দেশবাসীকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সংবিধান সংশোধন করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুন:প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ এক বছর ধরে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত করার পাশাপাশি আর যাতে বাংলাদেশে অসাংবিধানিক পন্থায় কেউ ক্ষমতা দখল করতে না পারে-সংবিধানে সেটিও নিশ্চিত করেছি। জনগণের ভোটাধিকার তাদের হাতে ফিরিয়ে দিয়েছি। সংসদীয় গণতান্ত্রিক ধারা নিশ্চিত করেছি।
প্রধানমন্ত্রী বুধবার ফরিদপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মাগুরা, শেরপুর, সুনামগঞ্জ, কুষ্টিয়া, বরগুনা ও চাঁদপুর জেলার তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। প্রধানমন্ত্রীর সূচনা বক্তব্যের পর তার সভাপতিত্বে তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের শুরুতেই সরবরাহকৃত একটি ফরম পূরণ করার মাধ্যমে তৃণমূল নেতারা আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নে স্ব স্ব এলাকার তিনজন করে প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেন। বিকাল ৫টায় এক ঘন্টার জন্য সংসদে অংশগ্রহণের জন্য বৈঠক মুলতবি করেন প্রধানমন্ত্রী। ফের গণভবনে গিয়ে তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে দীর্ঘ রাতঅবধি বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে কয়েকটি জেলার তৃণমূল নেতারা বেশ কয়েকজন মন্ত্রী-এমপির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে ধরে প্রার্থী মনোনয়নে সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানান।
বৈঠকে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, বেগম মতিয়া চৌধুরী, কাজী জাফর উল্যাহ, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, অধ্যাপক ড. আলাউদ্দিন আহমেদ, মাহবুব-উল-আলম হানিফ, ডা. দীপু মনি, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম, আবদুর রহমান, আফম বাহাউদ্দিন নাছিম, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, মৃণাল কান্তি দাস প্রমুখ অংশ নেন।
পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ঘোষণা
বাসস জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, গ্রামের মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করতে এবং তাদের ভাগ্য পরিবর্তনে দেশে ‘পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠা করা হবে। পল্লীর জনগণ যাতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের মাধ্যমে তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে পারে সে লক্ষ্যে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হবে। তবে এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং ডিভিশনের সম্মতি প্রয়োজন হবে। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে গতকাল বুধবার পল্লীর জনগণের জন্য ডিজিটাল ব্যাংকিং উদ্বোধন এবং জাতীয় পর্যায়ে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ভাষণকালে তিনি একথা বলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, একটি বাড়ি একটি খামার দারিদ্র্য বিমোচনে নতুন পথের দিশা দিয়েছে। একইভাবে পল্লীর জনগণের জন্য পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হবে, যাতে করে ব্যাংকের ভাগ্য নিয়ে কেউ ছিনিমিনি খেলতে না পারে। অধিক সুদের কারণে পল্লীর গরীব জনগণ এর আগে বিভিন্ন ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেনি। এজন্য ক্ষুদ্র ঋণের পরিবর্তে ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের কথা বলা হচ্ছে যেন পল্লীর মানুষ তাদের নিজ পায়ে দাঁড়াতে পারে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এবং এলজিআরডি ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক। পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব এম এ কাদের সরকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন ‘একটি বাড়ি, একটি খামার’ প্রকল্পের পরিচালক ড. প্রশান্ত কুমার রায়। অনুষ্ঠানে প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের পক্ষে খুলনার কনিকা মিস্ত্রি এবং শরীয়তপুরের আবদুল গনি মাতুব্বর বক্তব্য রাখেন।
‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পে অসামান্য অবদান রাখার জন্য ১২টি ক্যাটাগরিতে ১৯ জনকে জাতীয় পুরস্কার প্রদান করেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ডিজিটাল ব্যাংকিং উদ্বোধন করেন।
প্রথম বেসরকারি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু
চাঁপাইনবাবগঞ্জে দেশের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরুর মধ্য দিয়ে কৃষি শিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সুযোগের দ্বার উন্মোচিত হলো। সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ‘এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে এই নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টির উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ সাংবাদিকদের একথা জানান।
শেখ হাসিনা দেশের রফতানি বৃদ্ধিতে আরো কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, তার সরকার গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। মসলা-জাতীয় ফসল উত্পাদনে আগ্রহীদের বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দিচ্ছে এবং কৃষি শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের উত্সাহিত করতে দেশে কয়েকটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চেয়ারম্যান ও ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম মজুমদার। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান ড. এ কে আজাদ চৌধুরী, এফবিসিসিআই সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ, এক্সিম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মোহাম্মদ হায়দার আলী মিয়া, বিশ্ববিদ্যালয়টির ভাইস চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মান্নান আকন্দ ও প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।