মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর কবিতা
পাথরে ও শূন্যপটে স্বর্গের দীপন
প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০১৩, ১৮:২৩
মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর কবিতা
পাথরে ও শূন্যপটে স্বর্গের দীপন
সৈয়দ শামসুল হক
প্রচ্ছদ :কাইয়ুম চৌধুরী
প্রকাশক :প্রথমা প্রকাশন
মূল্য :১৫০ টাকা
ইতালীয়রা তাঁকে ডাকে ‘ইল দিভিনো (দ্য ডিভাইন/স্বর্গীয়)’ নামে। মর্মর থেকে আত্মার নির্যাস তিনি বের করেছেন উননব্বই বছর বয়স অবধি। ফ্লোরেন্সের বিখ্যাত মর্মরমূর্তি ‘দাভিদ’ বা সিস্টাইন চ্যাপেলের ছাদের সিলিংয়ের জন্য বিপুলায়তন ফ্রেস্কো নির্মাণ, রোমের মর্মর মূর্তি ‘দ্য পিয়েতা’, মেদিসি চ্যাপেল, লুভর জাদুঘরে রাখা তাঁর অন্যতম কীর্তি ‘স্লেভস’ বা কাপেল্লা পাওলিনার অমর ম্যুরাল বা দেয়ালচিত্রই শুধু নয়, ভাস্কর্য, স্থাপত্যকলা, চিত্রকলা বা ড্রইংয়ের পাশাপাশি মাইকেল অ্যাঞ্জেলো ব্যুয়োনারোত্তি যে একজন কবিও ছিলেন, সে খবর আমরা কজন রাখি? ১৪৭৫ সালের ৬ই মার্চ ইতালীর কাপ্রিসে জন্মগ্রহণকারী ও ১৫৬৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি রোমে পরলোকগত এই ভাস্কর সাতান্ন বছর বয়সে কবিতা লেখা শুরু করেন এবং প্রায় চারশ কবিতা লিখেছিলেন। এই কবিতাগুলো থেকেই কিছু বাছাই কবিতা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলায় অনুবাদ করেছেন আমাদের সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক। এই তোড়াবন্দি অনূদিত কবিতাগুলোই ‘পাথরে ও শূন্যপটে স্বর্গের দীপন’ নামে প্রকাশিত হয়েছে। মোট উনপঞ্চাশটি কবিতা অনূদিত হয়েছে দুই মলাটের ভেতরে।
কবিতা-গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ-কাব্যনাট্যের পাশাপাশি সৈয়দ শামসুল হক অনুবাদেও বিশিষ্ট। শেক্সপিয়রের ‘ম্যাকবেথ’ বাংলায় অনুবাদ করেছেন তিনি। ‘পাথরে ও শূন্যপটে স্বর্গের দীপন’ গ্রন্থে মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর মোট ৪৯টি কবিতা অনুবাদের পাশাপাশি একটি তথ্যঋদ্ধ ভূমিকা বা মুখবন্ধও জুড়ে দিয়েছেন অনুবাদক ‘সবিনয় নিবেদন’ নামে যা পাঠকের বাড়তি পাওয়া। এই মুখবন্ধ থেকেই আমরা জানতে পারছি শিল্পের প্রশ্নে চিরনিবেদিত, অবিবাহিত মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর দুই প্রিয়জনের কথা যাদের ভালোবেসে পাথরে হাতুড়ির আঘাতে লাবণ্য ও সুষমা ফোটানোর পাশাপাশি কবিতার পর কবিতাও লিখে চলেছেন তিনি। এদের একজন হলেন সমলিঙ্গের অভিজাত যুবক টমাসো দ্যু কাভালিয়েরে, বয়সে যিনি ছিলেন মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর অর্ধেক। এর পাঁচ বছর পরেই ভাস্করের জীবনে দ্বিতীয়বারের মতো তীব্র প্রেম আসে মধ্যবয়সী এক বিধবা ভিত্তোরিয়া কোলোনাকে ঘিরে। অনুবাদকের ধারাভাষ্যে : ‘মাইকেল অ্যাঞ্জেলোএদের কামনা করেন আক্ষরিক অর্থে দেহসঙ্গে নয়—এদের বিমূর্ত সৌন্দর্যই তাঁকে আকৃষ্ট করে; যদিও এই আকর্ষণ নিয়ে কিছু কুত্সা রটনাও তত্কালে হয়ে থাকে—প্রধানত সমকামের—এবং এই আমাদের কাল অবধি কে নয় এমন রটনার শিকার, এমনকি যথাপাত্রে দেহসঙ্গে ঘটনাটি ঘটলেও!’ অনুবাদকের ধারাভাষ্য থেকেই আরও জানা যাচ্ছে যে সৌন্দর্যের বিমূর্ত বিশুদ্ধতাই ছিল অমর এই শিল্পীর শিল্পেরও অভীষ্ট।
চিত্রকর ও ভাস্কর মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর এই কবিতাগুলোয় ভাস্কর হিসেবে অনিঃশেষ খাটুনির কথা আছে, পাথরে লাবণ্য ফোটানোর কথা আছে, আছে রূপমুগ্ধতা ও প্রণয়কাতরতা। তেমন দুটো কবিতা থেকে তুলে দিচ্ছি কয়েক পঙিক্ত :
ক. এই দাসবৃত্তি, এই হাড়ভাঙা শ্রম!
এমন বিপন্ন আত্মা, ভ্রান্তি এতটাই—
এরই মধ্যে প্রাণপাত দেখো কী রকম—
পাথরে স্বর্গীয় মুখ ছেনিতে ফোটাই!
খ. অপার সুখী এ সুতো! মালাখানি গাঁথা,
সোনালি চুলের ঢলে ফুল শোভা পায়;
দুরন্ত আশায় ছুঁয়ে তার ওই মাথা
কার আগে কে প্রথম চুলে চুমো খায়!
গ. কখনো মানেনি বশ, বন্য সেই নারী—
এখনো এ ইচ্ছা তারই
যেন তার জন্যে আমি পুড়ি!
যেন ছাই ফুত্কারেই উড়ে যাই—উড়ি!
অনূদিত উনপঞ্চাশটি কবিতার ভেতর স্বতঃস্ফূর্ত অনুবাদের পাশাপাশি কয়েকটি কবিতায় কিছু আড়ষ্ট ভাবও লক্ষ করা যায়। হয়তো মূল ইতালীয় থেকে ইংরেজি ও পরে ইংরেজি থেকে পুনরায় বাংলায় অনুবাদের কারণে এমনটি হতে পারে। কাইয়ুম চৌধুরীর প্রচ্ছদ ও গ্রন্থসজ্জা বইটির শোভা বাড়িয়েছে। বইটির পাতায় পাতায় মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর কিছু অমূল্য পেনসিল স্কেচের অনুকৃতি ব্যবহার করা হয়েছে।