বেঙ্গল শিল্পালয়ে এস এম সুলতানের একক প্রদর্শনী
সুলতানের ফিরে আসা
প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০১৩, ১৮:২৪
সুলতানের ‘প্রথম বৃক্ষ রোপণ’ এবং তারই প্রতিক্রিয়ায় তারেক মাসুদের ‘আদম সুরত’। আহমদ ছফার ‘বাংলার চিত্র ঐতিহ্য এবং সুলতানের সাধনা’ প্রবন্ধে সুলতানের কাজ ও তাঁর উত্থানের পরিচয় পাওয়া যায়। বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলীতে অবনীন্দ্রনাথের হাহাকার ছিল—শিল্পে ফিরে আসবে ভারতীয় চিত্র ঐতিহ্যের নান্দনিকতা। সেই ধারায় রাষ্ট্র ও জাতির গভীর চেতনার অনুরণন এবং বিশেষত বাঙালি জাতির অপ্রকাশিত শক্তি উঠে এল সুলতানের তুলিতে। বাঙালির এই যে প্রথমবারের মতো আত্মশক্তিকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখা—এই হচ্ছে সুলতানের ইতিহাস। এরপর নতুন করে কোনো গবেষণা হয়নি। সুলতানের ছবির ভিন্ন কোনো পাঠও আমাদের চোখে পড়েনি।
সুলতান চর্চার এই বন্ধ্যা সময়ে নতুন করে আবার সুলতানকেই উদ্যোগ নিতে হলো তাঁর সম্পর্কিত পাঠের। ‘আনসিন স্প্লেন্ডার’ নামে দীর্ঘদিন পর বেঙ্গল গ্যালারিতে প্রদর্শিত হলো সুলতানের অপ্রদর্শিত প্রায় ৮০টিরও বেশি ড্রইং এবং জলরং। সুলতানের এই ফিরে আসায় আমরা আনন্দিত এবং বিস্মিতও।
এবারের প্রদর্শনীর বিষয়ে কথা বলার পূর্বে আমরা তাঁর পূর্ববর্তী প্রদর্শনীগুলো নিয়ে সামান্য আলোকপাত করতে চাই। সুলতানের যে ছবিগুলো আমরা দেখি তা মূলত ১৯৭৬ সালে শিল্পকলা একাডেমী এবং ১৯৮৭ সালে জার্মান কালচারাল সেন্টারে প্রদর্শিত কাজের অংশবিশেষ। এই কাজগুলো সুলতানের পরিণত পর্যায়ের। এই কাজগুলোই তাঁর পরিচয়চিহ্ন। আদিম শক্তি, প্রাইমর্ডিয়াল সৌন্দর্য এবং বিশেষত বাঙালির চেতনা এবং তার দর্শন সম্পর্কিত একটি প্রাজ্ঞ ডিসকোর্স। কৃষকের ন্যায্য অধিকার, তাদের অবদান এবং ভূমিপুত্র হিসেবে সহমর্মিতার যে নিদর্শন তিনি তাঁর কাজের মাধ্যেমে তুলে ধরেছেন—আঙ্গিক, বিষয়বস্তু এবং উপস্থাপনার ধরনের কারণে তাতে স্বাতন্ত্র্য ফুটে উঠেছে। একই সাথে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস ও শিল্পের ইতিহাস এক হয়ে সাংস্কৃতিক চেতনাবোধের জায়গা থেকে রাজনৈতিক পুনর্গঠনের যে প্রস্তাব তিনি রেখেছেন, সেটা এখানকার সীমিত সাংস্কৃতিক চর্চার দিক থেকে সত্যিই দুর্লভ। সুলতানের উক্ত পর্যায়ের কাজগুলোকে শুধু শিল্পের নিরিখে নয়; সভ্যতার আকর দলিল হিসেবেও বিবেচনা করা যায়। ‘১৯৮৭ সালে ঢাকার গ্যোয়েটে ইনস্টিটিউটে সুলতানের চিত্রপ্রদর্শনী উপলক্ষে ইনস্টিটিউটের অধিকর্তা পিটার জেভিটস যা বলেছিলেন—‘এই উপমহাদেশের গুটিকয়েক অসামান্য শিল্পীর মধ্যে সবচাইতে জমকালো সুলতান। তিনি এশিয়ার কণ্ঠস্বর। যেসব মানবমূর্তি তিনি রচনা করেছেন সেসব জীবনযুদ্ধে মানুষের টিকে থাকার বার্তাবহ।’ সুলতান তাঁর শিল্পকলা সম্পর্কে খুব কম কথাবার্তাই বলেছেন। গুটিকয়েক সাক্ষাত্কার দিয়েছেন। অল্প কথায় প্রায় বাঙালি দর্শনের চরিত্র খুঁজে বের করাসহ বিশ্বসভ্যতার অলিগলি সম্পর্কে দিয়েছেন কয়েকটি ইশারামূলক বক্তব্য। বলছেন—‘আমি আমার বিশ্বাসের কথা বলছি। আমার সকল চিন্তা, সবটুকু মেধা, সবটুকু শ্রম দিয়ে যাকিছু নির্মাণ করি তা কেবল মানুষের জন্যে, জীবনের জন্যে, সুন্দর থেকে সুন্দরতর অবস্থায় এগিয়ে যাবার জন্যে। আমার ছবির মানুষেরা—এরা তো মাটির মানুষ, মাটির সঙ্গে স্ট্রাগল করেই এরা বেঁচে থাকে। এদের শরীর যদি শুকনো থাকে, মনটা রোগা হয়, তাহলে এই যে কোটি কোটি টন মানুষের জীবনের প্রয়োজনীয় বস্তুসকল আসে কোত্থেকে? ওদের হাতেই তো এসবের জন্ম। শুকনো, শক্তিহীন শরীর হলে মাটির নিচে লাঙলটাই দাববে না এক ইঞ্চি। আসলে মূল ব্যাপারটাই হচ্ছে এনার্জি, সেটাই তো দরকার। ওই যে কৃষক, ওদের শরীরের অ্যানাটমি আর আমাদের শরীরের অ্যানাটমি, দুটো দুই রকম। ওদের মাসল যদি অতো শক্তিশালী না হয় তাহলে দেশটা দাঁড়িয়ে আছে কার ওপর? ওই পেশির ওপরেই তো আজকের টোটাল সভ্যতা।’ বাংলাদেশের ওই দুটো প্রদর্শনীর পূর্বের দিককার ছবিগুলো সম্পর্কে আমরা খানিকটা ধারণা পেলেও সেগুলো ততটা চোখে দেখার সৌভাগ্য জাতিগতভাবেই আমাদের হয়নি। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে শিমলায়, পাকিস্তানের লাহোরে, আমেরিকায়, ব্রিটেনের নানা জায়গায় তাঁর প্রদর্শনী হয়েছে। সেখানকার পত্র-পত্রিকায় কিছু রিভিউ হয়েছে দুয়েকটি প্যালেটসহ। ওইসব রিভিউ আর দুয়েকটি প্যালেট দেখে সুলতানের মতো ‘প্রবীণ বটবৃক্ষের’ কাজের ধরন বোঝা দুষ্কর। উক্ত ছবিগুলো কোথায় কীভাবে আছে সে ব্যাপারে আমাদের শিল্পকলা কিংবা জাতিগতভাবে আমাদের কোনো অনুসন্ধান নেই। তাঁকে এখনো হেরিটেজ ঘোষণা করা হয়নি। বাংলাদেশ স্টাডিজ করে তাঁর সমস্ত কাজকে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে পরিণত পর্বের দিকে তিনি কীভাবে এগিয়ে এলেন সেটা আমরা জানতে পারলাম না। তাঁর শিল্পের কেবল যৌবন অবস্থাই আমরা দেখতে পেয়েছি, শৈশব-কৈশোর সম্পর্কে পেয়েছি শুধু গোটাকয়েক মন্তব্য। সুতরাং উক্ত পর্যায়ের কাজগুলো সম্পর্কে আমাদের আগ্রহ আকাশচুম্বী হওয়ার কথা। এবং তা-ই হয়েছে। শিল্পের শিশু থেকে শুরু করে ক্রাচে ভর করে আসা প্রাজ্ঞ বৃদ্ধের চোখেও জাগছিল খুব বিস্ময়। এই রেখাচিত্রগুলোকেই তাঁর শিল্পের শৈশব ভেবে কেবল মুগ্ধ দর্শকের ভূমিকায় আটকে থাকতে রাজি নয় কেউ কেউ, নিজ ঘরে ছবি নিয়ে যাওয়ার তত্পরতায়ও কারও কারও আনাগোনা।
১৯২৪ সালে নড়াইলের মাছিমদিতে তাঁর জন্ম। এই প্রদর্শনীর ড্রইংগুলো তিনি এঁকেছেন ১৯৫০-’৫১ সালের দিকে। তাঁর পরিণত পর্বের ছবির বিষয়বস্তুর সঙ্গে এই ড্রইংগুলোর বিষয়বস্তুর মিল চোখে পড়ার মতো। নারীদেহ, ঢুলি, নিসর্গ, গরু ইত্যাদির খসড়া ড্রইংগুলোর যে চরিত্র—এটাকে প্রাথমিক স্তর ধরলে ধীরে ধীরে সেটার বিকশিত পর্যায় আমরা দেখেছি। কিন্তু আঙ্গিকগত দিক থেকে বিচার বিবেচনা করলে সামান্য ব্যত্যয় ঘটে। এই রেখাচিত্রগুলোতে যেমন সর্পিল রেখার কাজ রয়েছে তেমনি স্ট্রাকচারাল ড্রইংও আছে। নারী পুরুষ প্রাণী বিশেষের ফিগারে যে পেশির উন্মোচন তিনি পরবর্তী পর্যায়ের কাজে করেছেন, এখানকার ছবিগুলোতে ঠিক ততটা প্রাধান্য পায়নি। বিষয়বস্তুর দৃশ্যায়নে কতক ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা রয়েছে। এসেছে এমন কিছু ফর্ম যা মুখ্যবস্তুর সাথে ততটা সিঙ্ক্রোনাইজ করে না। পাশ্চাত্যের আধুনিক পর্যায়ের বিন্যাসের স্টাইলকে তিনি গ্রহণ করেননি। স্পেস ব্যবাহারের যে চরিত্র সেটাকেও ততটা মানেননি তিনি। প্রথম বৃক্ষরোপণের বিন্যাসে কতক সমালোচক ইতালীয় রেনেসাঁস শিল্পীদের বিন্যাস কাঠামো খুঁজে পান। কিন্তু মানুষে ঠাসা এই ক্যানভাসের ভেতর দিয়ে আসমান দর্শনের অনুপ্রেরণা আসে না। তাকাতে হয় মানুষের ইনার স্ট্রেন্থের দিকে। আত্মশক্তি সুলতানের কাজে ধরা দিয়েছে কালেকটিভ আকারে। সেটা আনকনসাস আকারে ঘটে নাই। ঘটেছে কনসাস আকারে। পাশ্চাত্য যেখানে আত্মাকে ঢুকিয়ে দিয়েছে কালেকটিভ আনকনসাসনেসের ভেতরে। সুলতান সেখানে আত্মাকে বিলীন করেছেন সামগ্রিক কনসাসনেসের লড়াইয়ে। বলেছেন, যাঁরা সভ্যতার ফাউন্ডার তাঁদের মুক্তি ব্যতীত রাষ্ট্র তার কর্তব্যের বিষয়ে স্বাধীন নয়। অতএব আমরা দেখতে পাচ্ছি, ভারতবর্ষের কলোনিয়াল পর্বের যে আধুনিকতা এবং বাঙালির রেনেসাঁস বলে যে আত্মপ্রসাদ লাভ করেছি আমরা সেটাকে নতুনভাবে বিবেচনা করতে হলো। পরলোচন দিয়ে আপনসত্তাকে দেখার রীতি খারিজ হয়ে গেল। শুরু হলো বাঙালির চিন্তাচর্চার সত্যিকার নবজাগরণ। সুলতানের নারী আঁকার ভঙ্গিমা ও রেখায় পটুয়ার আভাস রয়েছে। তিনি নিজে পটুয়াদের সাথে মিশেছেন। কিন্তু পুরোমাত্রায় পটুয়াদের কাঠামোটি তিনি গ্রহণ করেননি। স্বতঃস্ফূর্ততা তাঁর কাজের বৈশিষ্ট্য নয়। বিষয়বস্তুর ওপরে দার্শনিকতাকে তিনি ইমপোজ করেননি। কার্ল সাগানের ভাষায়, ‘ইনসাইড টার্নস আউট’। ভেতরে যে গতি ঘুরপাক খাচ্ছিল, তিনি সেই শক্তিকে কেবল ফর্মের ভেতর ফেলেছেন। পাশ্চাত্যের রেনেসাঁস শিল্পীদের কাজের ধরনের থেকে সুলতানের সৃষ্টিতে আরও কিছুটা মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ইতালীয় রেনেসাঁস পর্বের শিল্পীদের কাজে প্লেটো দীক্ষিত আইডিয়া আর অ্যারিস্টটলের শিল্প বিষয়ক আইডিয়াল ইমিটেশনের নাড়াচাড়া তখনকার পর্বের শিল্পীদের এস্থেটিকসের একটি বড় জায়গা। প্রাচীন গ্রিক ছিল রেনেসাঁস শিল্পীদের মডেল। পেত্রাকের আহ্বানের মধ্যেও সেটা ধরা পড়েছে। গ্রিকদের জিমনেসিয়ামে কেবল শরীরচর্চাই ছিল না; প্রজ্ঞার চর্চাটাও ছিল। শরীরের সেই নিখুঁত জ্যামিতি আর প্রজ্ঞার সেই পুনঃউপস্থাপন ফিরে এল মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর ডেভিডের ভেতর। বোধের দিক থেকে এই ভাষ্কর্য ততটা বিস্ময়কর নয়, শিল্পের দিক থেকেও নয়। অই ভাষ্কর্য দেখে আমাদের দাউদ নবীর কথা মনে পড়ে না। ভাষ্কর্য বলেও ততটা ভেতরে প্রবেশ করতে মন সায় দেয় না। স্রেফ একটি আদর্শ ফিগার দেখে যেমন আমরা পুলকিত হই বা জিমনেসিয়ামে যা অহরহ টাঙানো থাকে। অর্থাত্ বলতে চাচ্ছি এই ফিগার মূলত শিল্পীর হাতে বিনির্মিত, যা কোনো এক আকারের ওপরে প্রক্ষেপিত দার্শনিক বা দৃষ্টিভঙ্গির আইকন। সুলতান আইডিয়াল ইমিটেশনকে পাত্তা দেননি। যা আইডল আকারে থাকে তাকেই কেবল আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। শুধু শিল্প নয়, তিনি আসলে সার্ভাইভিংয়ের যাবতীয় উত্সকেই এক ছাতার নিচে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন।
দুই.
সুলতানের এই ‘আনসিন স্প্লেন্ডার’ সিরিজের কাজগুলো বাংলাদেশের শিল্পকলায় ভিন্নতর একটি মাত্রার সংযোজন—এতে কোনো সন্দেহ নেই। একইসাথে সুলতান-চর্চা এবং ইতিহাস নির্মাণের ক্ষেত্রে আরও একধাপ এগিয়ে গেল এটা নিশ্চিত। কিন্তু সুলতানকে নতুন করে পাঠোদ্ধারের ক্ষেত্র হিসেবে এই ছবিগুলো কতটুকু ভূমিকা রাখবে সেটাও বিবেচ্য বিষয়। যদি আমরা পুরো মাত্রায় রেখাচিত্রগুলোকে অর্থবহ করে তুলতে চাই তাহলে কতিপয় প্রশ্নের মীমাংসা ব্যতীত সেটা অসম্ভব। প্রশ্নগুলোর উত্তরের ওপর এখানকার দর্শক, শিল্পকলা, শিল্পক্রেতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের শিল্পপ্রক্রিয়ার মান নির্ভর করছে। সুলতানের এই ড্রইংগুলো ১৯৫১-৫২ সালের দিকে আঁকা। এই ছবিগুলো আবিষ্কৃত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। সেই ঘটনাটি যেমন বিস্ময়ের উত্স, একই সাথে প্রশ্নবোধকও। ছবিগুলো এতদিন যাঁর কাছে ছিল তিনি হলেন মাইকেল মধুসুদন দত্ত কলেজের শিক্ষক আবুল কাসেম জোয়ারদার। সুলতানের বন্ধু। জোয়ারদার সাহেব লিখেছেন, ‘‘আমি সুলতানকে একটি ড্রইং খাতা কিনে দিয়েছিলাম ’৫১ সালের প্রথম দিকে। গত বছর অক্টোবরে আমার স্নেহভাজন সৈয়দ আমিনুল হক কায়সার আমাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘মামা, আপনার কাছে এস এম সুলতানের আঁকা কোনো ছবি নাই?’ আমি চমকিত হই। স্মৃতি হাতড়ে বলি, ‘একটা ড্রইং খাতা আছে, সেই খাতা আমি এস এম সুলতানকে কিনে দিয়েছিলাম। সেই ড্রইং খাতায় চারকোল দিয়ে এস এম সুলতান অনেকগুলো ছবি এঁকেছিলেন। দীর্ঘকাল এই খাতাটি আমার শোবারঘরে বইয়ের স্তূপের আড়ালে ধূলি-ধূসরিত জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে ছিল। সেই ড্রইং খাতাটি বের করলাম কায়সারের উত্সাহ আর আগ্রহে’। ঘটনাটা হচ্ছে এই। প্রদর্শিত ছবিগুলোর কোনোটিতেই সুলতানের সিগনেচার ছিল না।
গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে সুলতান যখন নড়াইলে ফেরেন, সেটা কেবল লাল মিয়ার প্রত্যাবর্তন ছিল না, রীতিমতো জগদ্বিখ্যাত শিল্পী এস এম সুলতানের ফেরা। সেটা বোধ করি জোয়ারদার সাহেব জানতেন। তবুও তিনি অমূল্য এই ছবিগুলোর কথা কীভাবে ৬৩ বছর ধরে বিস্মৃত ছিলেন—এটা একটা প্রশ্ন। একই সালে সুলতান নড়াইলে ছিলেন কি না, সেটাও আমরা জানতে পারি না। কারণ ’৫০-এর দিকে সুলতানের প্রদর্শনী হচ্ছিল ইউরোপ-আমেরিকায়। প্রদর্শনীর কাজে তাঁকে নিশ্চয়ই ব্যস্ত সময় কাটাতে হয়েছে দেশের বাইরে। ড্রইংগুলোর কম্পোজিশনের দিকে তাকালেও কিছুটা খটকা লাগে। ড্রইং নাম্বার-১৪-এর মতো কম্পোজিশন তাঁর অন্য কোনো কাজে দেখা যায় না। ড্রইং নাম্বার-২৪-এর রেখার যে ভেল্যু সেটা পরবর্তী কোনো কাজেই ব্যবহার করেননি। একই খাতায় ঠিক আলাদা একটা টোন। অ্যানাটমিক্যাল ক্রাকনেস তো রয়েছেই। এছাড়া জোয়ারদার সাহেব লিখেছেন, ‘ধূলি-ধূসরিত জরাজীর্ণ অবস্থায়’ এই খাতা পড়ে ছিল। চারকোল দিয়ে যাঁরা কাজ করেছেন তাঁরা জানেন, চারকোলের কাজ টিকিয়ে রাখা খুব দুরূহ। এই কিছু দিন আগে গাম স্প্রে এল। ৬৩ বছর তো দূরের কথা স্প্রে বা বিশেষ যত্ন ছাড়া চারকোলের কাজ তিন দিনও কি টিকিয়ে রাখা সম্ভব? কাগজ এবং কালি একাকার হয়ে যাওয়ার কথা। অথচ এর কোনো ছাপই নেই এ সমস্ত কাজে।
দুজন গুরুস্থানীয় শিল্পীর জাস্টিফিকেশন থাকা সত্ত্বেও এই ড্রইংগুলো যে সুলতানেরই সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শুধু রেখার চরিত্র দিয়ে এই ছবির জাস্টিফিকেশন আমাদের মারাত্মক বিপদের মধ্যে ফেলতে পারে। কারণ এটা সবাই জানেন যে, সুলতান এখন কেবল বাংলাদেশের একজন অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়ালই নন; তাঁর ছবির আন্তর্জাতিক চাহিদা রয়েছে। প্রপার জাস্টিফিকেশনের জন্যে কয়েকটি পারীক্ষা চালানো যেতে পারে। আধুনিক ল্যাবের মাধ্যমে ড্রইং কাগজের কেমিক্যাল এবং পারফিউম টেস্ট করা যেতে পারে। এতে করে কাগজের সময়কাল জানা যাবে, এবং ড্রইংগুলোর সৃষ্টির সময়কাল মিলিয়ে নেয়া সম্ভব হবে। সেসময়ের সুলতানের কাজের সাথে এই ড্রইংগুলোর রেখার ট্রেন্ড এবং বিন্যাসগত ভারসাম্য আছে কিনা সেটাও নিরীক্ষার আওতায় আসতে পারে। এই জাস্টিফিকেশনের কাজে চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিল্পের করণকৌশল বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেয়া যায়।
আমাদের সতত আকাঙ্ক্ষা—এই ফিরে আসা সুলতানেরই হোক।